শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সারা দেশে উদযাপিত হয়েছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতীয় দিবস। বিউগলের করুণ সুরে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয় স্বাধীনতাযুদ্ধের বীর শহীদ ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে অবমুক্ত করা হয় স্মারক ডাকটিকিট ও খাম। আলোক সজ্জায় সজ্জিত করা হয় সরকারি বেসরকারি ভবন ও স্থাপনা।
রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজন ছিল ফায়ার ওয়ার্কস ও লেজার শোর। তবে মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সীমিত আকারে রাষ্ট্রীয় এই অনুষ্ঠান পালিত হয়েছে। দিবসটি পালন উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার সকালে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতিসহ রাজনৈতিক দলের নেতারা। ধানমন্ডি ৩২ নন্বরে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতেও পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন তারা। দিবসটি পালন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী একটি স্মারক ডাকটিকিট এবং উদ্বোধনী খাম অবমুক্ত করেন।
সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি প্রথমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ প্রথমে স্মৃতিসৌধের বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন এবং পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তারা কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় তিন বাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন করে। এ সময় বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে। পরে তারা সেখানে রক্ষিত পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন।
এ সময় সেখানে বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা, আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা, পদস্থ বেসারিক ও সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এরপর স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলের পক্ষে সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে সিনিয়র নেতাদের একটি দল শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে স্মৃতিসৌধের বেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধ থেকে ফিরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানীর ৩২ নন্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ সেখানে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর একটি চৌকস দল এ সময় অভিবাদন জানায়। এ সময় বিউগলে করুণ সুর বাজানো হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে প্রবেশ করেন এবং ১৫ আগস্ট ঘাতকের গুলিতে নিহত মহান নেতা রক্তাক্ত অবস্থায় সিঁড়িতে যেখানে পড়ে ছিলেন, সেখানে ফুলের তোড়া অর্পণ করেন।
এদিকে স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে একটি স্মারক ডাকটিকিট এবং উদ্বোধনী খাম অবমুক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল সকালে তিনি তার সরকারি বাসভবন গণভবনে ১০ টাকার স্মারক ডাকটিকিটি এবং উদ্বোধনী খাম অবমুক্ত করেন। ডাকটিকিট ও উদ্বোধনী খামটি গতকাল থেকে ঢাকা জিপিও ডাকটিকিট সংগ্রহশালা থেকে এবং পরে দেশের অন্যান্য জিপিওতে পাওয়া যাবে।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যদের ফলমূল ও মিষ্টি পাঠান প্রধানমন্ত্রী। মোহাম্মদপুরের গজনবী সড়কে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন কেন্দ্রে এসব উপহার সমগ্রী পাঠানো হয়।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে শুক্রবার দুপুরে শেরেবাংলা নগরে জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রশাসনের বিধিনিষেধের কারণে দলীয় নেতা-কর্মীদের ছাড়াই শুধু শীর্ষ নেতারা আসেন সমাধি প্রাঙ্গণে। বিএনপি মহাসচিবের সঙ্গে এ সময় ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম খান ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তারা সমাধিতে শ্রদ্ধা জানিয়ে দোয়া ও মোনাজাত করেন।
২৫ মার্চ কালরাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে শহীদ হওয়া পুলিশ সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। গতকাল সকালে শহীদ পুলিশ সদস্যদের সম্মানে রাজারবাগে নির্মিত শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করেন তিনি। এরপর বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ এবং ডিএমপির পক্ষ থেকে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
এ সময় ডিএমপির একদল পুলিশ সদস্য মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে সশস্ত্র সালাম প্রদান করেন। সেই সঙ্গে বেজে ওঠে বিউগলের করুণ সুর।
এদিকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন উপলক্ষে ‘মুজিব চিরন্তন’ শীর্ষক মূল প্রতিপাদ্যের ১০ দিনের অনুষ্ঠানমালার দশম ও শেষ দিনের আয়োজন ছিল গতকাল।
‘স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর ও অগ্রগতির সুবর্ণরেখা’ থিমের শেষ দিনের এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাকে স্বাগত জানান অনুষ্ঠানের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
৫০ জন শিল্পীর সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলে। এরপর ৩০ মিনিটের বিরতি দিয়ে দ্বিতীয় পর্বে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলে রাত ৮টা পর্যন্ত।
আলোচনা পর্বে সম্মানিত অতিথি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও প্রধান অতিথি রাষ্ট্রপতি বক্তব্য রাখেন। এরপর অতিথিদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ‘মুজিব চিরন্তন’ শ্রদ্ধাস্মারক। অনুষ্ঠানের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তব্যের পর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর লোগো উন্মোচন করেন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানপর্বে ভারতের প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীতজ্ঞ পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর পরিবেশনায় বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করে নবনির্মিত রাগ ‘মৈত্রী’ পরিবেশনা, ‘পিতা দিয়েছে স্বাধীন স্বদেশ, কন্যা দিয়েছে আলো’ শীর্ষক থিমেটিক কোরিওগ্রাফি, ‘বিন্দু থেকে সিন্ধু’ শীর্ষক তিনটি কালজয়ী গান, ঢাক-ঢোলের সমবেত বাদ্য ও কোরিওগ্রাফি সহযোগে ‘বাংলাদেশের গর্জন: আজ শুনুক পুরো বিশ্ব’ পরিবেশন করা হয়। সবশেষে ফায়ার ওয়ার্কস ও লেজার শোর মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়।





