একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়

ছবি: পিআইডি

জাতীয়

একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়

  • কূটনৈতিক প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৭ মার্চ, ২০২১

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে সম্পর্কের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের লক্ষ্যে দুই দেশের একসঙ্গে কাজ করার ওপর জোর দিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয়দের অংশগ্রহণের ইতিহাস তুলে ধরে নরেন্দ্র মোদি বলেন, আমাদের এমন সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যা কোনোভাবেই ভাঙবে না। কোনো কূটনীতির চালের শিকার হবে না। গতকাল শুক্রবার জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে মুজিব চিরন্তন অনুষ্ঠানমালার সমাপনীতে সম্মানিত অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে এসব কথা বলেন মোদি।

অনুষ্ঠানে নরেন্দ্র মোদি বলেন, ভারত ও বাংলাদেশকে একসঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে, তাহলে আমরা সহজেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব। একাত্তরে বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়িয়ে ভারতে সত্যাগ্রহ আন্দোলন করে নিজের গ্রেপ্তার হওয়ার তথ্যটিও তুলে ধরেন মোদি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় সাজানো বক্তৃতায় মোদি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ থেকেও কিছু অংশ বাংলায় উচ্চারণ করেন। বিকেলে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে উপস্থিত হলে মোদিকে অভ্যর্থনা জানান অনুষ্ঠানের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বোন শেখ রেহানাও ছিলেন তার সঙ্গে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। ভারতের সরকার বঙ্গবন্ধুকে যে গান্ধী শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করেছে, সেই পুরস্কার মোদির হাত থেকে গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানা। তিনি আবার ‘মুজিব চিরন্তন’ স্মারক মোদির হাতে তুলে দেন। মুজিব চিরন্তন শিরোনামে ১০ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার শেষ দিনের আয়োজনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘স্বাধীনতার ৫০ বছর ও অগ্রগতির সুবর্ণরেখা’।

এর আগে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দুই দিনের সফরে গতকাল শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে ঢাকায় পৌঁছান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিমানবন্দরে মোদিকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। একইসঙ্গে তার সম্মানে ২১ বার তোপধ্বনি ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। এসময় বিমানবন্দরে দুই প্রধানমন্ত্রী কুশল বিনিময় করেন। মোদির এই সফরে দুদেশের মধ্যে কয়েকটি চুক্তিসহ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরো উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিমানবন্দর থেকে নরেন্দ্র মোদি সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে যান এবং সেখানে শহীদ বেদীতে ফুল দিয়ে একাত্তরের লাখো শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ সময় দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করে শহীদদের আত্মার শান্তি কামনা করেন মোদি। পরে স্মৃতিসৌধের পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর শেষে সৌধের আঙিনায় একটি অর্জুন গাছের চারা রোপণ করেন। মোদির শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সকাল ৮টা থেকে স্মৃতিসৌধের ভেতর ৪ ঘণ্টা জনসাধারণ প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়।

মোদির সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎ : রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে গতকাল দুপুরে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভারতকে ভূমিকা নেওয়ার জন্য নরেন্দ্র মোদিকে আহ্বান জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের এক ব্রিফিংয়ে ড. মোমেন বলেন, খুব আন্তরিকতার সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। আগামী ৫০ বছর আমরা একসঙ্গে থেকে এগিয়ে যেতে চাই। এক দেশ হঠাৎ উন্নতি হলে লাভ নেই, এই অঞ্চলের সবাইকে নিয়েই উন্নতি করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা চাই কানেক্টিভিটি বাড়ুক। করোনাকালে আমরা ভারতের ভ্যাকসিন সহযোগিতা পেয়েছি। তারা ভ্যাকসিন দিয়েছেন। আমরা আশা করছি তিন কোটি ভ্যাকসিন যথাসময়ে আসবে। তিনি বলেন, ভারত নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হয়েছে। আমরা আশাকরি রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ভালো ভূমিকা রাখবে এবং এ বিষয়ে উদ্যোগ নেবে।

মোদির সঙ্গে ১৪ দল ও জাপার বৈঠক : সফররত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে হোটেল সোনারগাঁওয়ের লবিতে বৈঠক করেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট ও সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (এরশাদ) নেতারা। প্রথমে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আমির হোসেন আমুর নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা বৈঠক করেন। এ সময় বৈঠকে আওয়ামী লীগের নেতা তোফায়েল আহমদ, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা, জাসদ একাংশের সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সাধারণ সম্পাদক শিরিন আখতার, জাসদের আরেক অংশের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া, তরিকত ফেডারেশনের সভাপতি নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। পরে জিএম কাদেরের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টিও নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করে। জাপার বৈঠকে রওশন এরশাদ, রুহুল আমীন হাওলাদার ও জিয়াউদ্দিন বাবলু অংশ নেন।

মোদির সঙ্গে তারকাদের সাক্ষাৎ : ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মুর্তজা, সাকিব আল হাসান, অভিনেত্রী জয়া আহসানসহ বাংলাদেশের ক্রীড়া, অভিনয়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের তারকারা। শুক্রবার দুপুরে হোটেল সোনারগাঁওয়ে সফররত ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তারা। এ ছাড়া অভিনেত্রী নুসরাত ফারিয়া, নির্মাতা রেদোওয়ান রনি, নারী ক্রিকেটার সালমা খাতুন ও জাহানারা আলম, চিরকুট ব্র্যান্ডের শারমিন সুলতানা সুমি, জাগো ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা কোরভি রাকশান্দ ধ্রুব, ইয়ুথ অপরচুনিটিসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন নুর ছিলেন এই তারকাদের দলে। তাদের সেই সাক্ষাতের ছবি টুইটারে শেয়ার করা হয় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অ্যাকাউন্ট থেকে। সাক্ষাৎ শেষে সাকিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পেরে সত্যি সম্মানিত। আমি মনে করি এই সফর দুদেশের জন্য ফলপ্রসূ হবে। সাকিব বলেন, ভারতকে অসাধারণভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। আমি আশাকরি ভবিষ্যতেও তিনি ভারতকে অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাবেন এবং আমাদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে। কূটনীতিকদের মতে, আজ দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে একান্ত আলোচনা ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হবে। বৈঠকে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বাইরে গিয়ে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা কী হতে পারে সেটি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে। গত ৫০ বছরে কী হয়েছে সেটির খতিয়ান এবং সামনের বছরগুলোতে সম্পর্ক কী ধরনের হবে সেটির একটি রোডম্যাপ নিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা আছে। বাংলাদেশ মনে করে নিজের সমৃদ্ধির জন্য গোটা অঞ্চলের উন্নতি প্রয়োজন এবং এজন্য কানেক্টিভিটি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি কিভাবে করা যায় সেটির ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ।

সফরের শেষদিনে আজ ভারতের প্রধানমন্ত্রী গোপালগঞ্জ ও সাতক্ষীরা যাবেন। তিনি সাতক্ষীরার শ্যামনগরে যশোরেশ্বরী মন্দিরে যাবেন। সেখানে তিনি প্রার্থনা করবেন। একই সঙ্গে হিন্দু সমপ্রদায়ের লোকদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। মোদি ঢাকা থেকে সাতক্ষীরা যাবেন হেলিকপ্টারে। সাতক্ষীরা সফর শেষে সেখান থেকে যাবেন গোপালগঞ্জ টুঙ্গিপাড়ায়৷ সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। টুঙ্গিপাড়ায় তাকে স্বাগত জানাবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখান থেকে কাশিয়ানির ওড়াকান্দিতে মতুয়া সম্প্রদায়ের মন্দির পরিদর্শন করবেন। এই মন্দির পরিদর্শন শেষে মতুয়া সমপ্রদায়ের নেতাদের সাথে মতবিনিময় করবেন। তারপর হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় ফিরবেন। এদিন সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হবে। বৈঠকের আগে তারা কিছুক্ষণ একান্ত আলোচনা করবেন। এই আলোচনায় দুই প্রধানমন্ত্রী নির্ধারণ করবেন দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে ঢাকা ও দিল্লির অবস্থান কী হবে। এরপর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে দুদেশের মধ্যে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হবে।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads