সারা দেশ

কলাপাড়ায় আশ্রয় কেন্দ্রে শিশুর জন্ম

  • মিলন কর্মকার রাজু, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
  • প্রকাশিত ২৭ মে, ২০২১

ইয়াসের প্রভাবে যখন গ্রামের পর গ্রাম পানিতে প্লাবিত হচ্ছিলো, সহায়, সম্পদ হারানোর শংকায় যখন গ্রামবাসীদের দিশেহারা অবস্থা, ঠিক তখনই আশ্রয় কেন্দ্র এক নবজাতকের পৃথিবীতে আগমনের প্রথম কান্নার আওয়াজে মুহুর্তের মধ্যে মানুষ ভুলে যায় ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির কথা। শত মানুষের কষ্টের মধ্যেও ভেসে আসে সুমধুর আজানের ধ্বনি। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার লালুয়া ইউনিয়নের চান্দুপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন সেল্টারে ঝড় চলাকালীন জন্ম হয় এই শিশু। বর্তমানে চান্দুপাড়া গ্রাম বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের পানি প্লাবিত এখনো আশ্রয় কেন্দ্রেই আছে এই নবজাতক ও তার বাবা-মা। তার নাম রাখা হয়েছে মো. বেলাল। তবে নবজাতক ও মা সুস্থ্য আছে জানালেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। গত তিনদিন ধরে তারা এই আশ্রয় কেন্দ্রেই অবস্থান করছেন।

কলাপাড়ার চান্দুপাড়া গ্রামের শ্রমজীবি নুর আলম ও তানজিলা দম্পত্তির বিয়ের তিন বছর পর প্রথম সন্তান আগমন নিয়ে ছিলো অনেক ভাবনা। কিন্তু ঝড়ের কারনে রাবনাবাদ নদীর জোয়ারে গোটা চান্দুপাড়া গ্রাম ৩-৪ ফুট পানিতে প্লাবিত হয়। ডুবে যায় তাদের বসত ঘরটি। বাধ্য হয়ে গত মঙ্গলবার রাতে অসুস্থ্য স্ত্রীকে নিয়ে চান্দুপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন সেল্টারে উঠেন নুর আলম। রাতেই অসুস্থ বোধ করেন তানজিলা। কিন্তু পানিতে রাস্তাঘাট তলিয়ে থাকায় তাকে নিয়ে বের হতে পারেননি চিকিৎসার জন্য।

বুধবার সকালে ঝড়ে জলোচ্ছাসের পানি আরও বাড়ারর সাথে সাথে তানজিলার প্রসব বেদনাও শুরু হয়। এ সময় আশ্রয় কেন্দ্রে ছিলো মানুষের ভীড়। ঝড়ের বাতাসের গতিবেগ ও বানের পানি যতো বাড়তে থাকে তানজিলাও অসুস্থ হতে শুরু করে। তার প্রসব বেদনা আরও বেড়ে যায়। আশ্রয় কেন্দ্রে আসা স্থানীয় নারীরা স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।

খবর পেয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার নির্দেশে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকর্মী আফ‌রোজা বেগম ও জয়‌ন্তিকা‌র চেষ্টায় আশ্রয় কেন্দ্রেই পুত্র সন্তান প্রসব করে। এ সময় আশ্রয় কেন্দ্রে নুর আলমসহ আসা শতাধিক নারী-পুরুষের মুখে হাসি ফুটে উঠে। কিন্তু মূহুর্তেই নবজাতকের বাবা নূর আলম শরীফের কপালে ফুটে উঠে চিন্তার ছাপ। পুত্রকে নিয়ে যে বসতবাড়িতে বসে আনন্দ উদযাপের কথা, সেখানেই এখন কোমড় সমান পানি। পুত্রকে নিয়ে বুধবার রাতেও তাদের অবস্থান  করতে হয় আশ্রয়কেন্দ্রে।

লালুয়া ইউপি চেয়ারম্যান শওকত হোসেন বিশ্বাস জানান, বুধবার রাতেও ওই শিশুর পরিবারসহ বহু মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে ছিলো। তাদের শুকনো খাবার সরবরাহ করা হয়েছে। তবে শিশু ও তার মা সুস্থ আছে। শিশুসহ পরিবারের যত্নে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখা হচ্ছে।

শিশুর দাদী খাদিজা বেগম বলেন, ঘরের মধ্যে কোমড় সমান পানি। এমন কপাল নাতি হইছে আশ্রয় কেন্দ্রে। আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় এখন পর্যন্ত হাসপাতালে নিয়ে ডাক্তার দেখাতেও পারেন নি। ছেলে পেশায় রাজমিস্ত্রি।  করোনার কারনে এখন প্রায়ই কর্মহীন থাকে। এ অবস্থায় নবজাতকের চিকিৎসা ও বিধ্বস্ত ঘর মেরামত কিভাবে করবেন এ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ছেন।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহিদুল হক বলেন, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন নবজাতক ও মা সুস্থ্য আছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে শিশু খাদ্য ও পরিবারের প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী এবং নবজাতকের প্রয়োজনীয় সবকিছু কিনে দেয়া হয়েছে। এলাকায় পানির প্রবাহ না কমা পর্যন্ত তারা আশ্রয় কেন্দ্রেই নিরাপদে থাকবেন বলে জানান।

লালুয়া ইউনিয়নের স্বাস্থ্যকর্মী জয়ন্তী রানী জানান, তিনিসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের তদারকিতে নিরাপদেই সন্তান প্রসব হয়েছে। মা ও শিশু সুস্থ্য রয়েছে।

কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. চিন্ময় হালদার জানান, বিষয়টি আমরা জানার পর স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী আফ‌রোজা বেগম ও জয়‌ন্তিকা‌কে তাৎক্ষ‌ণিকভা‌বে সেখা‌নে পাঠাই এবং পু‌রো বিষয়‌টি ম‌নিট‌রিং করেন ডা. অনুপ কুমার সরকার। তা‌দের সহযোগিতায় শিশুটির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় জন্ম হয়েছে। এখন পর্যন্ত বাচ্চা ও মা দুইজনই সুস্থ আছেন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads