শেখ সায়মন পারভেজ হিমেল
করোনার বিষাক্ত ছোবলে বিশ্ববাসীর টনক নড়লেও বাংলাদেশের জনগণের তেমন কোনো সচেতনতা লক্ষণীয় নয়। তবে বাংলাদেশে করোনা যে মহামারী তা গ্রাম-শহরবাসী সবারই সর্বজনস্বীকৃত। বাংলাদেশের মতো দেশে শহরে স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে খানিকটা সচেতনতা থাকলেও গ্রামে তা শূন্যের কোটায় বলা যেতে পারে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রেক্ষিতে জানতে পারি নিঃসন্দেহে করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা গ্রামের তুলনায় শহরে বেশি। এখন প্রশ্ন বোধ করি করোনা সংক্রমণে গ্রামে ও শহরে কেন এত তফাত? শহরের মানুষগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি সচেতন, অপরদিকে গ্রামে নেই কোনো স্বাস্থ্যবিধি, নেই কোনো সচেতনতাবোধ, কিন্তু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা শহরের থেকে তুলনামূলকভাবে অতি নগণ্য। তাহলে আবারো প্রশ্ন এই সচেতনতাই কি করোনা সংক্রমণের কারণ? উত্তর, অবশ্যই না। তাহলে এই প্রশ্নের সমাধান কী? নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর জোনাথন বলের কথাটি, ‘আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত এ কারণে যেকোনো ভাইরাসে মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে।’ অতএব সাধারণ যুক্তিতে এটা বোঝা যায়, গ্রাম ও শহর করোনার কাছে বিবেচনা বিবেচ্য না, প্রকৃতির হিসাব ভাইরাস তথা করোনা ভাইরাসের বিস্তারের ক্ষেত্রে বিবেচ্য। কিছু বিষয় জানা দরকার, করোনা ভাইরাস সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ভাইরাসটির ইনকিউবেশন পিরিয়ড ১৪ দিন পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। তবে কিছু কিছু গবেষকের মতে এর স্থায়িত্ব ২৪ দিন পর্যন্ত থাকতে পারে।
মানুষের মধ্যে যখন ভাইরাসের উপসর্গ দেখা দেবে তখন বেশি মানুষকে সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকবে। এমন ধারণাও করা হচ্ছে যে, নিজেরা অসুস্থ না-থাকার সময়ও সুস্থ মানুষের দেহে ভাইরাস সংক্রমিত করতে পারে মানুষ। বিবিসি নিউজ এর তথ্য মতে, শুরুর দিকের উপসর্গ সাধারণ সর্দি-জ্বর এবং ফ্লুয়ের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে দ্বিধাগ্রস্ত হওয়া স্বাভাবিক। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব অনেককে সার্স ভাইরাসের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে যা ২০০০ সালের শুরুতে প্রধানত এশিয়ার অনেক দেশে ৭৭৪ জনের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। নতুন ভাইরাসটির জেনেটিক কোড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এটি অনেকটাই সার্স ভাইরাসের মতো। এডিনবারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মার্ক উলহাউস একটা নিন্ধনে বলেছিলেন, ‘আমরা যখন নতুন কোনো করোনাভাইরাস দেখি, তখন আমরা জানতে চাই এর লক্ষণগুলো কতটা মারাত্মক। এ ভাইরাসটি অনেকটা ফ্লুর মতো কিন্তু সার্স ভাইরাসের চেয়ে মারাত্মক নয়।’
করোনা বিস্তারের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, বিষয়টি হলো পরিবেশগত তাপমাত্রা (আলো-বাতাস, রোদ সমৃদ্ধ ফাঁকা স্থান), যা ভাইরাস তথা করোনা ভাইরাস স্থানান্তরে অতি সহজেই নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, যা করোনা ভাইরাস সংক্রমণের অন্যতম প্রতিবন্ধক হিসাবে বলা যেতে পারে। এক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে গ্রামীণ পরিবেশ শহরের পরিবেশের থেকে এগিয়ে। কেননা শহরের অট্টালিকা ভিড়ে আলো বাতাস সমৃদ্ধ ফাঁকা স্থান পাওয়া দুষ্কর। করোনার প্রতিবন্ধক হিসেবে আরেকটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যক্তির মানসিক অবস্থা তথা মানসিক মনোবল, যা যেকোনো রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সহায়ক। এমনকি মানসিক মনোবল থেকে নানা ধরনে এন্টিবডি সৃষ্টি হয়। যা দেহের প্রহরী হিসেবে কাজ করে। ‘দৈনিক প্রথম আলো’তে এক নিবন্ধে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক আহমদ হেলাল মানসিক মনোবল ও রোগ প্রতিরোধের প্রসঙ্গে বলেছেন, অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা স্ট্রেস ব্যক্তিগত রোগপ্রতিরোধের ক্ষমতা কমাবে। মানসিক চাপের সময় শরীরে হরমোন আর নিউরো-ট্রান্সসিটারের পরিবর্তনের কারণে ব্যক্তিগত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ব্যাহত হয়। পাশাপাশি মানসিক চাপের সময় যথার্থ সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হতে পারেন কেউ কেউ। এই সময় হতবিহ্বল হয়ে যাওয়া, রেগে যাওয়া, নিজের মেজাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারাসহ কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। এ কারণে সামগ্রিক সংক্রমণ প্রতিরোধের উপায়গুলো দুর্বল হতে থাকে। নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত নিতে ভুল হয়ে যেতে পারে। সংবাদমাধ্যম/সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিপ্রচার বা অপপ্রচারের ঘটনা ঘটতে পারে।
এ ছাড়া সংক্রমণ বেশি মাত্রায় ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মধ্যে হতাশা বেড়ে যাবে। ‘ফ্রাস্টেশন অ্যাগ্রেশন হাইপোথিসিস’ অনুযায়ী হতাশ মানুষ সহজে রেগে যাবে, আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবে। আন্তব্যক্তিক (ইন্টারপারসোনাল) সম্পর্ক খারাপ হতে থাকবে। সংক্রমণের ঝুঁকি আছে, এমন মানুষ বৈষম্যের শিকার হতে থাকবে। এসব কারণে মানসিক চাপ মোকাবিলা করা বৈশ্বিক মহামারী প্রতিরোধের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। এটি বিবেচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইন্টার এজেন্সি স্ট্যান্ডিং কমিটি, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট, ইউনিসেফের ওয়েবসাইটে কোভিড-১৯ প্রতিরোধে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব বিষয়ে একাধিক দিকনির্দেশনা প্রকাশ করে। অতএব আমরা সহজেই বুঝতে পারছি যে, মানসিক মনোবলের সাথে রোগ প্রতিরোধ কতটা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এই ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে গ্রামের মানুষের মনোবল তুলনামূলকভাবে বেশি, কেননা যে শিকারি কোনদিন বাঘের তাড়া খায়নি বা বাঘের তাড়া দেখেনি, তাহলে সে কি কোনোদিন বাঘের ভয় বুঝবে? অবশ্যই বাঘের ভয় থাকবে না। প্রথম আলোর এক সাক্ষাৎকারে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী গাইডলাইন মেনে চলা দরকার? কোন কোন বিষয়ে সবার সতর্ক থাকা উচিত? এ প্রশ্নের জবাবে ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চের (আইইডিসিআর) অন্যতম পরামর্শক ডাক্তার মুশতাক হোসেন বলেন, প্রথমত, কোভিড সংক্রমিতদের স্বাস্থ্য বিভাগের তরফ থেকে খোঁজখবর নেওয়া হয়। তাদের তরফে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়। সবাইকে তা মেনে চলতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তির আইসোলেশন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তিনি অন্য কাউকে সংক্রমিত করতে না পারেন। দ্বিতীয়ত, লক্ষণ আছে এমন অনেকে পরীক্ষা করাচ্ছেন না এবং স্বাভাবিকভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ফলে অজানা উৎস থেকে লোকজন সংক্রমিত হচ্ছে। তাই কোনো লক্ষণ থাকলে পরীক্ষা করাতে হবে, সংক্রমিত হলে আইসোলেশনে যেতে হবে। তৃতীয়ত, বন্ধ ঘরে একসঙ্গে জমায়েত হওয়া যাবে না। চিকিৎসাসেবা-সহ যেকোনো ধরনের সেবা গ্রহণের প্রয়োজনে বা অন্য কোনো কারণে যদি একান্তই তা করতে হয়, তবে অবশ্যই দরজা-জানালা খোলা রাখতে হবে। সবার মাস্ক পরা থাকতে হবে। সাধারণভাবে যা ধারণক্ষমতা, তার ৩ ভাগের ১ ভাগ লোক রাখতে হবে এবং ব্যবস্থাপনা এমনভাবে করতে হবে, যাতে কাউকে সেসব স্থানে ১৫ মিনিটের বেশি থাকতে না হয়। এসব স্থানের দরজার হাতল বা সাধারণভাবে স্পর্শ লাগে এমন স্থানগুলো নিয়মিত স্যানিটাইজ করতে হবে। কিন্তু শহরে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। জীবনের নব তিক্ত স্বাদ, চাকরি হারানোর ভয় ও দুশ্চিন্তা, করোনা নিয়ে মাতামাতি সবমিলিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে শহরে বসবাসরত ব্যক্তিকে। আর স্বাভাবিকভাবে মানসিক বিপর্যস্ত ব্যক্তি রোগে আক্রান্ত হওয়াই স্বাভাবিক। করোনা মানুষভেদে আক্রান্ত করে না, শহর গ্রামের কোন প্রশ্নই নয়। কিন্তু গ্রামের মানুষ যদি শহরে থাকতো আর শহরের মানুষ যদি গ্রামে থাকতো তাহলে গ্রামের মানুষের অসচেতনতা ও প্রতিকূল পরিবেশে প্রেক্ষিতে আক্রান্ত হওয়ার জগাখিচুড়ি লেগে যেত, যা ভারতকেও ছাড়িয়ে যেত। গ্রামের মানুষ যে পার পেয়ে গেছে, বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। তাদের স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে, করোনা নিয়ে গুজব নয়। পক্ষান্তরে, শহরের মানুষের মানসিক মনোবল বাড়াতে হবে, এক্ষেত্রে বোধ করি, ধর্মীয় মনোবল সহায়ক হবে। পরিবারের সাথে সময় কাটাতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। সরকারও এক্ষেত্রে আরও সক্রিয় হতে হবে। যেমন কর্মস্থলে চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, চাকরির ছাঁটাই বন্ধ করতে হবে। সেইসাথে লোকসমাগম ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে আরো কঠোর হতে হবে। গ্রামে নিয়মিত পুলিশের আনাগোনা বাড়াতে হবে, কেননা গ্রামের মানুষ করোনা ভয় পায় না, ভয় পায় পুলিশের আনাগোনা। জনগণ, সরকার ও সুশীল সমাজের সক্রিয়তা ও সচেতনতার মাধ্যমেই যক্ষ্মা কলেরার মতো করোনাভাইরাসও প্রতিরোধ করা সম্ভব।
লেখক : শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ, মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়





