উইঘুর ইস্যুতে বিশ্বমানবতার এক হওয়া সময়ের দাবি

সংগৃহীত ছবি

মুক্তমত

উইঘুর ইস্যুতে বিশ্বমানবতার এক হওয়া সময়ের দাবি

  • প্রকাশিত ৪ এপ্রিল, ২০২১

উইঘুররা পূর্ব ও মধ্য এশিয়ায় বসবাসরত তুর্কি বংশোদ্ভূত এবং একটি সুন্নি মুসলিম সম্প্রদায়, যারা মূলত সুফিবাদে বিশ্বাসী। আর জাতি হিসেবে এরা ককেশীয় ও পশ্চিম এশীয় নৃ-গোষ্ঠীর সংমিশ্রণ। পৃথিবীর মোট উইঘুরদের বেশিরভাগেরই বসবাস চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে। এই জিনজিয়াং চীনের বৃহৎ কয়েকটি প্রদেশের অন্যতম একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, যদিও নামেমাত্র স্বায়ত্তশাসিত। কারণ বর্তমানে এটি চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। এই অঞ্চলটির আগে নাম ছিল পূর্ব তুর্কিস্তান। যার সঙ্গে ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, রাশিয়া, মঙ্গোলিয়া, কাজাখস্তান ও তাজিকিস্তান দেশগুলোর সীমান্ত রয়েছে। এই জিনজিয়াংয়ে উইঘুররা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও তারা সামগ্রিক দিক থেকে সবচেয়ে বঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া জাতি। কারণ কেন্দ্রীয় সরকার এখানে চীনা হান জাতির মানুষদের চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সার্বিক ক্ষেত্রেই সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে থাকে। তাছাড়াও সরকার উইঘুরদের সংখ্যালঘু করার উদ্দেশে চীনের অন্যান্য অঞ্চল থেকে হানদের তুলে এনে এখানে বসতি স্থাপন করার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। এরকম রাজনৈতিক বৈষম্যজনিত কারণসহ বিভিন্ন কারণেই একসময় একদল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দ্বারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও ছোট-বড় বিভিন্ন আক্রমণাত্মক কার্যক্রমের জন্য একধরনের অশান্তি বিরাজমান ছিল সেখানে। এজন্য চীন সরকার বরাবরই পুরো উইঘুর সম্প্রদায়কেই সন্দেহের চোখে দেখে আসছে।

এমন অবস্থায়, সন্ত্রাসী সাজিয়ে ও আইএসসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা দেখিয়ে সন্ত্রাস মোকাবিলার কথা বলে সরকার উইঘুরদের বিরুদ্ধে ধরপাকড় ও দমন-পীড়নের বিভিন্ন অভিযান শুরু করে। উইঘুর বসবাসরত এলাকাগুলোতে সরকার পুনঃশিক্ষণ কেন্দ্রের নামে বিভিন্ন বন্দিশিবির স্থাপন করে এবং ধরপাকড় চালিয়ে ২০১৭ সাল থেকে সেই বন্দিশিবিরগুলোতে উইঘুর ও অন্যান্য তুর্কি বংশোদ্ভূত মোট ২০ লাখের মতো নারী-পুরুষকে (জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী ১০ লাখ) বন্দি করে রাখা হয়েছে। যদিও চীন সরকার দাবি করে আসছে যে, তারা নিজ ইচ্ছায়ই প্রশিক্ষণ নিতে এখানে এসেছে।

তথাপি স্যাটেলাইটে ধারণ করা কিছু চিত্র এবং কোনোমতে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের কাছ থেকে ওইসব বন্দিশালায় তাদের প্রতি ঘৃণ্য ও বর্বর নির্যাতনের অনেক তথ্যই রীতিমতো অবাক করে দেয়। তুরসুনে জিয়াদুন নামক এক নারী উক্ত শিবির বা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে কাজাখস্তানে চলে যাওয়ার পর, বিবিসিকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার মাধ্যমে বেশকিছু তথ্য প্রকাশ করে দেন। ইলেকট্রিক লাঠি দিয়ে যৌনাঙ্গে শক দেওয়া, ধর্ষণ-গণধর্ষণ ও সারা শরীরে হায়েনার মতো কামড়ানোসহ তার ওপর চালানো নানা রকমের পাশবিক বর্বরতার কথা তিনি জানান। চেয়ার, দস্তানা, হেলমেট ও পায়ুপথে, এই চারটি উপায়ে সেখানে মূলত নারীদের ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয় বলে বিবিসিকে জানান আরেক উজবেক নারী। এভাবে জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, ধর্ষণ ও গণধর্ষণসহ অন্যান্য বিভিন্ন কাজে বাধ্য করা হয় নারীদের। এমনও জানা গেছে, সেখানকার রক্ষীরা যাকে ইচ্ছা তাকেই ধর্ষণ করে থাকে। বিশেষ করে তাদের সবকিছুই ভিডিও ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি করা হয়, এমনকি টয়লেটেও ক্যামেরা বসানো থাকে বলে এক সূত্রে জানা গেছে।

এভাবে পুরুষদেরও বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনের সম্মুখীন করা হয় প্রতিনিয়ত। দাড়ি রাখা, টুপি ব্যবহার, নামাজ পড়া ও রোজা রাখাসহ উইঘুর মুসলিমদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সব কার্য থেকে জোরপূর্বক বিরত রেখে তাদের শেখানো হয় একদলীয় ও কর্তৃত্ববাদী শাসক শি জিনপিংয়ের কমিউনিস্ট পার্টির স্লোগান, শেখানো হয় মান্দারিন ভাষা, জোর করে খাওয়ানো হয় শূকরের মাংস এবং জোর করে ধর্মান্তরিত করার ঘটনাও সেখানে নিত্য-নৈমিত্তিক।

আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানীমূলক সাংবাদিক সংস্থা ‘আইসিআইজে’র এক রিপোর্টে উইঘুরদের বন্দিশিবির পরিচালনার গোপন কৌশল বা কেন্দ্রীয় নির্দেশনাসমূহ উঠে এসেছে। নির্দেশনাবলি অনেকটা প্রায় এরকমই। যেমন- কখনোই পালানোর সুযোগ দিও না, শৃঙ্খলা ও শাস্তি বাড়াতে থাকো, কেউ আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে কঠোর শাস্তি প্রদান করো, স্বীকারোক্তি প্রদান ও অনুতপ্ত হতে উৎসাহিত করো, মান্দারিন ভাষা শেখানোতে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দাও, পুরোপুরি বদলে যেতে অনুপ্রাণিত করো এবং পুরো ভিডিও নজরদারি চালাও, কোনো জায়গাই যেন বাদ না থাকে ইত্যাদি।

তাছাড়া বিবিসির তথ্যমতে, উইঘুরদের ঘরবাড়ির দরজায় বসিয়ে দেওয়া হয়েছে বিশেষ কোড, লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে মুখ দেখে শনাক্তকারী ক্যামেরা, ফলে  কোন বাড়িতে কে কখন আসে-যায় সব খবর নিয়ন্ত্রণ করে কর্তৃপক্ষ। আবার বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের বায়োমেট্রিকস পরীক্ষাও নেওয়া হয়। এসবের মাধ্যমে কাউকে সন্দেহ হলেই নিয়ে যাওয়া হয় বন্দিশালায়।

এককথায়, চীনা সরকার উইঘুরদের ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যসহ নিজস্ব সব আচার-আচরণ পরিবর্তনের মাধ্যমে ধর্মীয় ও জাতিগত নিধন প্রক্রিয়ার সব পথই খোলা রেখেছে। ‘বিডি ভিউজ’র এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রোজার দিনে উইঘুরদের রোজা রাখতে দেওয়া হয় না, বরং বাড়িতে গিয়ে রোজা ভাঙানো হয়। তাদের প্রাচীন সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র, কাশগরের অসংখ্য প্রাচীন ভবন ও স্থাপনা ভেঙে পর্যটন কেন্দ্র বানানো হয়েছে। এমনকি দুই বছরে  ৩১টি মসজিদ ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে বলে ‘দ্যা গার্ডিয়ানে’র এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জিনজিয়াংয়ে নতুন কোনো মসজিদ নির্মাণ করতে দেওয়া হয় না। যদি অনুমতি মেলে তাও আবার বৌদ্ধ মন্দিরের আদলে নির্মাণ করতে হয়। মসজিদের ইমামও সরকারিভাবে রাখা হয়। জুমার খুতবায় ইমাম কী বলবেন সেটিও তদারক করে প্রশাসন। আর হজে যাওয়ার ব্যাপারেও আছে নিষেধাজ্ঞা। খুব অল্প সংখ্যক মুসলমানই হজ করতে পারে। জিনজিয়াংয়ের স্কুলগুলোতে শিশুরা নিজস্ব ধর্ম ও ভাষাচর্চা করতে পারে না। কারণ, শিক্ষার সব কার্যক্রমই মান্দারিন ভাষায় সাজানো। মুসলিম তরুণীদের বৌদ্ধ ছেলেদের সঙ্গে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়ার ঘটনাও সেখানে স্বাভাবিক।

এভাবে দমন-পীড়ন, অত্যাচার-নির্যাতন ও বিভিন্ন হস্তক্ষেপের মাধ্যমে শি জিনপিং সরকার দিন দিন উইঘুরদের অস্তিত্ব চিরতরে বিলীন করার যে সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে, তা সম্পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন। পৃথিবীর কোনো সরকার, দেশ ও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কারোরই এরকম জাতিগত বৈষম্যের ব্যানারে কোনো মানুষের মৌলিক অধিকার হরণের অধিকার নেই। তারপরও চীন নির্ভয়ে কোনোরকম বাধা-বিপত্তি ব্যতিরেকেই উইঘুর দমনে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করে যাচ্ছে।

চীনা সরকারের এসব ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলো অনেকটা অগ্রগামী হলেও বাকিরা যেন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক ও শক্তিশালী সংস্থার প্রতিনিধি দলকেও বন্দিশিবিরগুলোতে প্রবেশাধিকার প্রদানপূর্বক তদন্ত পর্যন্ত করার অনুমতি দিচ্ছে না চীন। উইঘুর মুসলিমদের পাশে দাঁড়ানোর বিপরীতে সৌদি আরব, ইরান, তুরস্ক ও পাকিস্তানসহ অধিকাংশ মুসলিম দেশই অনেকটা নিশ্চুপ হয়ে আছে। মুসলিম দেশগুলোর ৫৭ সদস্যের আন্তর্জাতিক সংস্থা ওআইসি’র ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সামরিক শক্তি, চীনের বিরুদ্ধে উইঘুর ইস্যুতে কেউ বিবৃতি পর্যন্ত দিতেও যেন শঙ্কা বোধ করছে। তাছাড়া বিভিন্ন দেশে চীনের বিরাট অংকের অর্থনৈতিক বিনিয়োগও এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এরকম নির্যাতিত ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত মানুষগুলো যে জাতি বা ধর্মেরই হোক না কেন, ‘তারা মানুষ’ এই প্রেক্ষিতে হলেও দল-মত, ধর্ম-বর্ণ ও জাতি নির্বিশেষে, মানবাধিকার রক্ষার্থে, সমগ্র বিশ্বের স্বাধীন দেশগুলোকে তাদের পাশে দাঁড়ানো নৈতিক দায়িত্ব। এজন্য পুরো বিশ্বকে এক হয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে চীন সরকারের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে, এমনকি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ আরোপ করে হলেও সমস্যা সমাধানের জন্য এগিয়ে আসা উচিত।

লেখক :মো. জাফর আলী

শিক্ষার্থী, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads