বাংলাদেশের কবিতা ও কথাসাহিত্যে আবুবকর সিদ্দিক সমান দেদীপ্যমান; শুধু তা-ই নন, বরং দুই ক্ষেত্রেই নিজস্ব ভাষারীতি গঠনের মাধ্যমে নিজেকে স্বতন্ত্র চিহ্নিত করেছেন। উপরন্তু তাঁর গণসংগীত আমাদের বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা এবং অবশ্যই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জন্য তা ছিল প্রেরণাদায়ক। আবুবকর সিদ্দিকের মতো একনিষ্ঠ পাঠকও আমার চোখে পড়েনি। তিরিশের অন্যতম প্রধান কবি বিষ্ণু দে-র সঙ্গে তার সখ্য, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বন্ধুতা, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোজ বসু, বুদ্ধদেব বসু ও প্রতিভা বসু; এদেশে সিকানদার আবু জাফর, হাসান হাফিজুর রহমান— এঁদের সঙ্গে তার কথোপকথনের বিষয় ও আড্ডা তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।
বাম-ঘরানার এই লেখক নিজে কখনো প্রশ্রয় দেননি কোনো শঠতাকে, ধূর্ততাকে। পশ্চিমবঙ্গের হুগলী-বর্ধমানের জনপদ তাঁর কৈশোরের মনোভূমিকে ভিত্তি দিয়েছিল বলেই আবুবকর সিদ্দিকের পক্ষেও এটা সম্ভব হয়েছিল। আগেই বলেছি, ’৪৭-এর দেশভাগের সেই স্বাধিকার আন্দোলনে তিনি বালক বয়সেই অংশ নিয়েছেন, স্লোগান দিয়েছেন। আবুবকর সিদ্দিক বিভিন্ন সময়ে নিজেও স্বীকার করেছেন যে, এ সমস্ত কিছুর বাতাবরণই তাঁর লেখক হয়ে ওঠার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। আর এসব কিছুকে সাক্ষী করে তিনি ’৪৭-উত্তর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে এলেন; বসত গাড়লেন তাঁর জন্মশহর, তখনকার এক নিভৃত পল্লী-শহর বাগেরহাটে।
’৪৭-উত্তর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণ-নিপীড়নের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে ষাটের দশকে আবুবকর সিদ্দিক প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। কবি বিষ্ণু দে-র সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ, তাঁর রাজনৈতিক দর্শন এবং পরবর্তীতে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে সখ্যের ফলে তাঁর অনেক কবিতা, গল্পে রাজনীতি পরোক্ষভাবে ছায়া ফেলে। তবে খুলনা শহরে ষাটের দশকে সৃষ্টি হওয়া সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সন্দীপন’-এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণে সে-সময়ের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক শোষণের বিরুদ্ধে মেহনতি মানুষের পক্ষে কলম ধরলেন আবুবকর সিদ্দিক। এরও আগে কবি কলকাতার আন্ডার গ্রাউন্ড বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, ফলে তখন তা আরো তীব্র হয় এবং গণসঙ্গীত লেখা শুরু করেন। একসময় চরমপন্থী নকশাল রাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন তিনি। বলা যায় এ-সময় থেকে আবুবকর সিদ্দিকের লেখায় গণমানুষ প্রধান হয়ে ওঠে, ব্রাত্যজন ঠাঁই নেয় তাঁর সাহিত্যে। আর ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তাঁর লেখা গণসঙ্গীত— ‘ব্যারিকেড বেয়নেট বেড়াজাল’-এর কারণে ওই যুদ্ধসময়ে রাজাকার-আলবদরদের দোসরদের হাতে তিনি নির্যাতিত হন।
আবুবকর সিদ্দিকের কবিতা কিংবা কথাসাহিত্য— ব্যতিক্রমী শব্দনির্মাণ, ভাষাশৈলী ও বিষয়-বৈচিত্র্যের স্বাতন্ত্রিকতায় বিশিষ্ট। তবে কবি কিংবা কথাকার হিশেবে তিনি বহুপ্রজ নন, বিরলপ্রজ। যা লিখেছেন, তাই এপিক। তা না হলে, যখন আবুবকর সিদ্দিকের কোনো বই-ই প্রকাশ হয়নি, সেই তখন ষাটের দশকে তিরিশের পঞ্চপাণ্ডব হিশেবে খ্যাত কবি বিষ্ণু দে তাঁকে কেন বই উৎসর্গ করবেন? বাংলা সাহিত্যের অনন্য শীর্ষ কবি বিষ্ণু দে তাঁর সংবাদ মূলত কাব্য কবিতাগ্রন্থটি আবুবকর সিদ্দিককে উৎসর্গ করলেন, সঙ্গে শামসুর রাহমান। আমাদের কাব্যযাত্রার এ এক দুর্লভ ইতিহাস। বাংলাদেশের অন্যতম যশস্বী কবি নির্মলেন্দু গুণ আবুবকর সিদ্দিকের ৭২তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘কবি আবুবকর সিদ্দিক সম্পর্কে এখানে আমি কিইবা বলতে পারি। যাঁকে বিষ্ণু দে বই উৎসর্গ করেন, তাঁকে নিয়ে বলার কিছু নেই।’ অথচ আমাদের দুর্ভাগ্য জাতি হিশেবে আমরা আমাদের প্রকৃত গুণিদের মূল্যায়ন করতে জানি না। এ কথা সত্য যে, জাতি হিশেবে আমরা বিস্মৃতিপ্রবণ, অকৃতজ্ঞ এবং আত্মঘাতী। সেই মানুষই কেবল অন্যের গুণপনাকে মুক্ত মনে স্বীকার করতে পারেন, যিনি নিজে একাধিক বিষয়ে গুণময়। দুঃখদায়ক সত্য এই, আমাদের চারপাশে এমন মানুষের বড় আকাল। এই চাটুকারতাড়িত সমাজে এটুকুই আশার কথা যে, মিডিয়া কবি আবুবকর সিদ্দিককে নিয়ে ব্যবসা করতে চায়নি কিংবা পারেনি।
কবিতা ও গদ্য— এই দু’ধারী কলমের শক্তিকে ভয় মেনে আবুবকর সিদ্দিককে দূরে রেখেছেন আমাদের পাঠক-সমালোচক-লেখক, সবাই। এমনকি ঘনিষ্ঠ ছাত্ররাও তাঁর কাছ থেকে মধু আহরণ শেষে নিঃশব্দে কেটে পড়েছেন আড়ালে। তারা জেনে গেছেন, এই প্রত্যয়দীপ্ত ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে অমূলক, অনির্ণিত, অশোভন কিছু পাওয়া যাবে না, যা তাদের ওপরে ওঠার সিঁড়ি তৈরি করে দিতে পারে। অতএব তারা চাটুকারতাড়িত সমাজের মাথায় ঘি ঢালতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। কবিরা তাঁকে এড়িয়ে গেছেন তাঁর কবিত্বশক্তির কারণে, গদ্যকাররা কাছে টেনে নেননি তাঁর কথাসাহিত্যের ভাষারীতি ও অমিয় তেজের কারণে। কবিতার ক্ষেত্রে যেমন ধবল দুধের স্বরগ্রাম, হে লোকসভ্যতা, মানুষ তোমার বিক্ষত দিন, হেমন্তের সোনালতা, মানবহাড়ের হিম ও বিদ্যুৎ, কংকালে অলঙ্কার দিয়ো, রাভী’র কথা বলা যায়, তেমনি কথাসাহিত্যে চরবিনাশকাল, মরে বাঁচার স্বাধীনতা, কুয়ো থেকে বেরিয়ে, কালোকুম্ভীর, খরাদাহ, জলরাক্ষস কিংবা একাত্তরের হূদয়ভস্ম ইত্যাদির নাম করতে হয়।
সেই ষাটের দশকে যেমন বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি বিষ্ণু দে তাঁকে কাব্য উৎসর্গ করেছেন; আবার শক্তিমান কথাকার সরোজ বন্দোপাধ্যায় চিঠিতে আবুবকর সিদ্দিককে তাঁর খরাদাহ উপন্যাস পড়ে ‘...আপনার লোহার দ’ত কলম অটুট থাকুক’ বলে যে আশীর্বাদ চিঠি পাঠান, একজন লেখকের জন্য এর থেকে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে!
তবে এদেশে আবুবকর সিদ্দিকের উইটকে ঠিকই ধরেছিলেন সিকানদার আবু জাফর, হাসান হাফিজুর রহমান, শওকত ওসমান, শওকত আলী প্রমুখজন। সিকান্দার আবু জাফর সেই পাঁচের দশকে সম্পাদনা করতেন সাহিত্য পত্রিকা ‘সমকাল’। পরবর্তীতে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। এই ‘সমকাল’ নামে সিকান্দার আবু জাফরের একটি প্রকাশনাও ছিল। তিনি বহুবার আবুবকর সিদ্দিককে কবিতার পাণ্ডুলিপি দেয়ার কথা বলেছিলেন, তাঁর ‘সমকাল’ প্রকাশনী থেকে বের করবেন। কিন্তু পালিয়ে গেছেন আবুবকর সিদ্দিক। কবিতার বই, দুঃসাহস! ১৯৫৭ সনে দুরু দুরু বক্ষে আবুবকর সিদ্দিক দুখানি কবিতা ‘সমকাল’ দপ্তরে হাসান হাফিজুর রহমানের হাতে দিয়ে আসেন। রাশভারী হাসান ফিরেও তাকাননি কবির দিকে। অথচ পরের সপ্তাহে প্রকাশ পেল সমকালে তাঁর দুটি কবিতাই। এই হাসান হাফিজুর রহমানই গদ্য লিখতে উৎসাহ দিয়েছেন আবুবকর সিদ্দিককে। হয়তো তাই, কবিতার পাশাপাশি আমরা পেয়েছি একজন অদ্বিতীয় কথাকার আবুবকর সিদ্দিককে।
আবুবকর সিদ্দিকের গদ্যসাহিত্য সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে আমাদের দেশের যশস্বী কথাশিল্পী শওকত ওসমান তাঁর ‘জলরাক্ষস’ সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন, তা পাঠক ইতোমধ্যেই জেনেছেন। আবার পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিক অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এই উপন্যাস সম্বন্ধে যে বলেছেন, ‘...উপদ্রুত, অবহেলিত, ধূসর মানুষগুলি আপনার ভালোবাসার আতপ্ত স্পর্শে পঙ্ক-শয্যা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে নতুন অস্তিত্বের সন্ধানে’, সেই নতুন ওঠা সূর্যের আলোয় বিকশিত হয়েছে বাংলাদেশের কথাসাহিত্য। তার পথপ্রদর্শক নিঃসন্দেহে অমিত তেজদীপ্ত কথাকার আবুবকর সিদ্দিক। পিক্ততে ওঠার মতো বাংলাদেশের গুটিকয়েক কথাসাহিত্যের বিচারে আবুবকর সিদ্দিক নামটি উচ্চারণে আজ আর দ্বিতীয়বার ভাবতে হয় না।
জীবনব্যাপী তিনি দেখেছেন, ঘুরেছেন। শৈশব কেটেছে তাঁর বাবার চাকরিসূত্রে পশ্চিমবাংলার হুগলী ও বর্ধমানে। তাঁর এই রাজনীতি, সমাজনীতির দিকদর্শন ও সাংস্কৃতিক ভিত তৈরি হয়ে গিয়েছিল ওখানেই। ’৪৭-এর দেশভাগের পরে ১৩/১৪ বছরের কিশোর আবুবকর সিদ্দিক ফিরে এলেন তৎকালীন পূর্ববঙ্গ তথা আজকের বাংলাদেশে। শুরু হলো তাঁর নতুন যাত্রা। আবুবকর সিদ্দিকের ভাষায় বলি, ‘এই বিপুল বৈভব ভরা অফুরন্ত পুঁজি, অন্য আর কী সম্ভব হতে পারত আমার পক্ষে লেখক না হয়ে উঠে? ...সারা জীবন ঘুরেছি, দেখেছি, পড়েছি আর মনের মধ্যে পাহাড় জমিয়ে তুলেছি। আমার ভবিতব্য ছিল লেখক হওয়া। যে সংবেদী সাহিত্যবীজ পশ্চিমবঙ্গ থেকে ধরে এনেছিলাম, দেশে এসে তাই উদ্গত হয়ে উঠতে থাকে।’
শেষ কথা এই, আবুবকর সিদ্দিকের সঙ্গে আমার সম্পর্ক আশৈশব। বাগেরহাট সরকারি প্রফুল্লচন্দ্র মহাবিদ্যালয়ে তিনি আমার পিতার সহকর্মী ছিলেন। তারও আগে সেই গত শতকের পাঁচের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে শিক্ষার্থী হিশেবে প্রথম সাক্ষাৎ। আবুবকর সিদ্দিকের অধ্যাপনা সম্পর্কে আমার পিতা তাঁর এক লেখায় বলেছিলেন, ‘...তাঁর ভাষার সুললিত শব্দমাধুর্যের এক চিত্তাকর্ষক তরঙ্গ ছাত্রছাত্রীদের মন্ত্রমুগ্ধ ও নীরব করে রাখতো। তখন মনে হয়েছে ইংরেজ কবি সুইনবার্নের কথা। এ ইংরেজ কবির রচনার বিষয়বস্তু ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থীদের বুঝতে কষ্ট হলেও তাঁরা বুঝতে পারেন কবির গীতিময়-ছন্দময় ভাষার শিল্পনৈপুণ্য। আবুবকর সিদ্দিকের মধ্যে সুইনবার্নের ওই গুণাবলী আমরা লক্ষ করি। আর এ কারণেই ক্লাসের পাঠদানে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে আবুবকর সিদ্দিক ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয় এক শিক্ষক, আবার একই কারণে কোনো কোনো সহকর্মীদের চোখে ঈর্ষাপরায়ণ।’
ওই ঈর্ষা বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে তিনি জীবনভর বয়ে বেড়িয়েছেন। কিন্তু তা কবি ও কথাকার আবুবকর সিদ্দিকের কলমকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। বাংলা সাহিত্যের এমন একজন মহীরুহের সঙ্গে আমার সম্পর্কের এখানেই শেষ নয়, জানি না কোথায় তার পরিণতি! হয়তো এও এক অন্যরকম অনন্তযাত্রা, অনাদিকালের...।





