কবিতায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২০ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন ড. মুহাম্মদ সামাদ। তার জন্ম তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার জামালপুরে ১৯৫৬ সালে। সরিষাবাড়ী রাণী দিনমণি মডেল হাইস্কুল ও সরিষাবাড়ী কলেজ থেকে ১৯৭৩ ও ১৯৭৫ সালে প্রথম বিভাগে যথাক্রমে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকর্ম বিষয়ে ১৯৭৮ সালে দ্বিতীয় শ্রেণিতে অনার্স এবং ১৯৭৯ সালে প্রথম শ্রেণিতে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রিপ্রাপ্ত হন। ড. মুহাম্মদ সামাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উইনোনাস্টেট ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং অধ্যাপক হিসেবে পর পর দুবার পাঠদান করে প্রভূত সম্মান অর্জন করেছেন। ২০০৯ সালে সমাজকর্ম শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ওয়াশিংটনস্থ সিএসডব্লিউই পরিচালিত ‘ক্যাথেরিন ক্যান্ডাল ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যাল ওয়ার্ক এডুকেশন’-এর ফেলো হিসেবে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকর্মের উচ্চশিক্ষার তুলনামূলক অবস্থার ওপর গবেষণা করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে অধ্যাপক ও পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেসের (ইউআইটিএস) উপাচার্য ছিলেন। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ড. মুহাম্মদ সামাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সালেহীন বাবু
পুরস্কারপ্রাপ্তিতে আপনর অনুভূতি?
পুরস্কারের জন্য কেউ লেখে না। পুরস্কার একজন লেখককে আনন্দিত ও অনুপ্রাণিত করে। তেমনি আমিও আনন্দিত হয়েছি এবং ভালোও লাগছে। একজন লেখকের স্বজন থাকে, পাঠক থাকে। পুরস্কার পেলে তারাও আনন্দিত হয়। সাহিত্যের পাঠক পুরস্কারপ্রাপ্তকে সম্মান দেন, সমাজ মর্যাদা দেয়। এগুলোই প্রধান। প্রগতিশীল লেখকদের এখন সম্মানিত করা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার রয়েছে বলেই তা সম্ভব হচ্ছে। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক আমাদের অগ্রজ কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীসহ বিচারকমণ্ডলী যারা আমাকে নির্বাচন করেছেন বা মনোনীত করেছেন, সম্মানিত করেছেন তাদের আমি কৃতজ্ঞতা জানাই। পুরস্কার দেওয়া উচিত লেখার বিচার করে। যে যে ক্ষেত্রে পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য তাকে সে ক্ষেত্রে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, বয়স বিচার ইম্পরটেন্ট নয়। আমাদের এখানে পুরস্কার দেওয়ার চেয়ে পুরস্কার নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এই রীতি পুরস্কারের মূল্যবোধ ক্ষুণ্ন করে, যা পুরস্কারের অসুন্দর দিক, অনৈতিক দিক।
আর কদিন পরেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। তারপর স্বাধীনতা দিবস। আপনার অনুভূতি কী?
এই বাংলাদেশকে আজ আর নবীন বলা যায় না। একটি জাতিকে ধ্বংস করতে হলে সে জাতির মেধা ও মননের চর্চা যারা করেন; যেমন বুদ্ধিজীবী, সমাজবিজ্ঞানী, কবি, সাংবাদিক, চিকিৎসাবিজ্ঞানী, বিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা, তাদের নিশ্চিহ্ন করতে হয়। আমাদের দেশে চিকিৎসাবিজ্ঞানী আলীম চৌধুরী, ইতিহাসবিদ সৈয়দ গিয়াসউদ্দীন আহমেদ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক), আনোয়ার পাশা (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক), মুনীর চৌধুরী, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, সাংবাদিক সেলিনা বেগমের মতো মেধাবী মানুষগুলো যারা আমাদের পূজনীয় ও অনুকরণীয়, যারা আমাদের সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, পূজনীয় এসব ব্যক্তির মেধা-মনন নিশ্চিহ্ন করার জন্য তাদের বেছে বেছে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে, দেশ যেন আর দাঁড়াতে না পারে। কিন্তু সেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যার বিচার হয়েছে, এর জন্য আমার অনুভূতি অনেক আনন্দের। আনন্দ-বিষাদে ভরপুর আমাদের জীবন। পুরো জাতিই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে কৃতজ্ঞ। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচার, জেলহত্যার বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হলো বঙ্গবন্ধুকন্যার হাত ধরে। কাজেই সেদিক থেকে বাংলাদেশ কলঙ্কমুক্ত হলো। বাংলাদেশ একটা উন্নত মানবিক রাষ্ট্র গঠনের পথে এগিয়ে চলেছে।
আপনি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের কোনো বিশেষ স্মৃতি কি আছে যা আপনাকে তাড়িয়ে বেড়ায়?
আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায় মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্মৃতি। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি সরিষাবাড়ী রাণী দিনমণি মডেল হাইস্কুলের ক্লাস নাইনের ছাত্র ছিলাম। আমার স্কুলে ক্লাস টেনে পড়তেন কালাম ভাই। আমরা নাইনে উঠলাম। তিনি এসএসসি পরীক্ষা দেবেন। সে সময় পাকবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ করে এবং কালাম ভাইকে ধরে নিয়ে আসে। তার ঊরু থেকে একটা পা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তারপর তাকে গুলি করে হত্যা করে। তার চোখে-মুখে সেই গুলি লাগে। সারা মুখ রক্তে ভরে যায়। কালাম ভাইয়ের বাবা তার ছেলেকে দেখতে যান। পা-কাটা ছেলের রক্তে চটচটে মুখে হাত বুলিয়ে বাবা আদর করতে থাকেন। তখন রাজাকাররা তাকে লাথি দেয়। রাজাকাররা সে সময় উদ্ধত হয়ে বলছিল, শুয়োর কা বাচ্চা, তোমারা বেটা হ্যায়? কালাম ভাইয়ের বাবা ছেলের মুখে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলছেন, না না। কারণ ছেলের কাছে যাওয়ার আগে আমার গ্রামের চাচারা বলেছিল, আপনি ছেলের মুখ দেখতে যান। কিন্তু আপনি ওদের সামনে বলবেন না যে, আপনি কালামের বাবা। বললে আপনাকেও মেরে ফেলবে। এরকম বলে তাকে সেখানে পাঠানো হলো। তারপর ওখানে পাক হানাদার বাহিনীর সৈন্যরা, রাজাকাররা যতবার তাকে লাথি দিচ্ছিল, বলছিল শুয়োর কা বাচ্চা, তোমারা বেটা হ্যায়? তখন কালাম ভাইয়ের বাবা বার বার না না বলছিলেন। তার চোখের পানি ঝরঝর করে ছেলের মুখে পড়ছিল। আমরা পাশে দাঁড়িয়ে নির্বাক হয়ে দেখেছি। তা ছাড়া গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। দূরের গ্রামে ধোঁয়া উঠছে। নারী-পুরুষদের গরুর দড়ি দিয়ে বেঁধে সামনে রাজাকার, পেছনে পাক হানাদার বাহিনী লাইন ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ঘরের গরু-ছাগলও নিয়ে যেতে বাদ রাখেনি। এগুলো আমাদের বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে নিয়ে যেত, আমরা দেখতাম। আমাদের নদীতে রাতে অনেক মানুষ মেরে ফেলে দিত। রাতেই সেই লাশ ভেসে যেত। এমনো দেখতাম, একসঙ্গে চারজনকে হাত-পা বেঁধে গুলি করে মেরেছে। বুকে গুলির কারণে গর্ত হয়ে যেত। রক্তে ভেসে যেত সে জায়গা। ডিসেম্বর মাসে মিত্র বাহিনী যখন একত্রে বিমান দিয়ে আক্রমণ করে, তা দেখতাম। রেলের একটা মালগাড়ির ওপর মিত্রবাহিনীর বিমান হামলায় অনেক রাজাকার মারা যায়। আমরা রেডিও শুনতাম। পাটক্ষেতের মধ্যে খড় বিছিয়ে উঁচু বিছানা করে সেখানে রেডিও নিয়ে শুনতাম। ‘চরমপত্র’ অনুষ্ঠানটি মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। সংবাদ শুনতাম। শুনে উজ্জীবিত হতাম। রাজাকাররা, পাকবাহিনী যদি টের পেত, তাহলে আমাদের সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেলত। আমরা নিজের বাড়িতে থাকতাম না। নদী পার হয়ে অন্য গাঁয়ে থাকতাম। এরকম অনেক স্মৃতি আছে।
অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনে আমরা কতটুকু অগ্রগ্রামী?
আগের অখণ্ড বাংলা আয়তনে অনেক বড় ছিল। সে সময় থেকেই ধর্মীয় সংস্কৃতি সব সময় সহনশীল ছিল। এখানে তিনবার ধর্মান্তর হয়েছে। হিন্দু থেকে বৌদ্ধ, বৌদ্ধ থেকে মুসলমান হয়েছে লোকেরা। এদের সহজ ও মরমি জীবন। এদের সুফিবাদী চিন্তা, শ্রীচৈতন্যের চিন্তা, লালনের চিন্তা। গাজীর গানে আছে-‘নানা বরন গাভীরে ভাই একই বরন দুধ/জগৎ ভরমিয়া চাহিলাম একই মায়ের পুত।’ এ চেতনা বাঙালির অন্তরে। এখানে যার যার ধর্ম সে পালন করে। কিন্তু ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে এই চেতনাকে ধ্বংস করার জন্য বিএনপি-জামায়াত উঠে-পড়ে লেগেছিল। এমনকি সামরিক শাসনে যারা ছিলেন, জিয়া-এরশাদ-এরা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক করার জন্য নানা ধরনের অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছিলেন।
চলবে ...





