ধর্ম

‘গিবত’ আমল ধ্বংসের নীরব ঘাতক

  • প্রকাশিত ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১

মির্জানা আফরিন

 

 

গিবত আরবি শব্দ। আভিধানিক অর্থ পরনিন্দা, দোষারোপ, সমালোচনা, কুৎসা রটনা করা ইত্যাদি। গিবত অত্যন্ত গর্হিত কাজ। ইসলামের শরিয়তে গিবত হারাম এবং কবিরা গুনাহ। আল্লাহতায়ালা এ ব্যাপারে কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা করেছেন। গিবত বলতে বুঝায় কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তাঁর সম্পর্কে অন্যের কাছে এমন কিছু বলা, যা শুনলে সে কষ্ট পাবে। গিবত সম্পর্কে সবচেয়ে উত্তম সংজ্ঞা দিয়েছেন হজরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘গিবত কী, তা কি তোমরা জান? লোকেরা উত্তরে বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, গিবত হলো তোমার ভাইয়ের সম্পর্কে এমন কথা বলা যা সে অপছন্দ করে। জিজ্ঞাসা করা হলো, আমি যা বলি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে তবে এটাও কি গিবত হবে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি যা বল তা যদি তাঁর মধ্যে বিদ্যমান থাকে তাহলেই সেটা হবে গিবত, আর তুমি যা বল তা যদি তার মধ্যে না থাকে তবে সেটা হবে  মিথ্যা অপবাদ।’ (মুসলিম, মিশকাত)

 

বর্তমান সময়ে গিবত একটি জনপ্রিয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি যে হারাম তা আমাদের মাথায়ই নেই। হারামকে আমরা হালাল করে ফেলেছি। যেখানে দুই বা তিনজন ব্যক্তি থাকবে আর গিবত হবে না এটি অকল্পনীয়। বর্তমানে যে কোনো জমায়েত, আড্ডা গিবত ছাড়া অসম্পূর্ণই রয়ে যায়। এটি এখন সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। কারণ গিবতের ফলে একে অপরের প্রতি রেষারেষি শুরু হতে পারে, যা হানাহানি পর্যন্ত গড়ায়। ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। আল্লাহতায়ালা গিবতের ব্যাপারে এমন ঘৃণ্যভাবে চিত্রিত করেছেন, যে কোনো মনই তার প্রতি বিতৃষ্ণ হবে। মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘দোষ অন্বেষণ করো না৷ আর তোমাদের কেউ যেন কারো গিবত না করে৷ এমন কেউ কি তোমাদের মধ্যে আছে, যে তার নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে? দেখো, তা খেতে তোমাদের ঘৃণা হয়৷ আল্লাহকে ভয় করো৷ আল্লাহ অধিক পরিমাণে তওবা কবুলকারী এবং দয়ালু৷’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত-১২)

 

কেউ নিজের ভাইয়ের গোশত খাওয়ার কথা কল্পনাও করবে না, এমনকি অনেক হারাম কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে। অথচ প্রতিনিয়তই সে এর সমপরিমাণ কাজ করছে, তা আঁচ করতে পারে না। এটি শুধু আমাদের ইহকালকেই ধ্বংস করছে না। পরকালের পরিণতির জন্যও এটি দায়ী। গিবত শুধু মুখে দোষারোপ করার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। ইশারা-ইঙ্গিত, অঙ্গভঙ্গি ও লিখনের মাধ্যমেও গিবত রটানো যায়। যে কোনো ভাবেই হোক, গিবত করা হারাম। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, একদিন আমি হাতের ইশারায় এক স্ত্রীলোককে খর্বাকৃতি বললে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, ‘হে আয়েশা; তুমি গিবত করেছ, থুথু ফেলো। তৎক্ষণাৎ আমি থুথু ফেলে দেখলাম তা কালো বর্ণের জমাট রক্ত।

 

এরূপে কোনো খোঁড়া কিংবা টেরা চক্ষুবিশিষ্ট ব্যক্তির অবস্থা অনুকরণ করার জন্য খুঁড়িয়ে হেঁটে কিংবা চক্ষু টেরা করে চাইলে তার গিবত করা হলো। তবে কারো নাম উল্লেখ না করলে এতে গিবত হয় না। কিন্তু উপস্থিত লোকেরা যদি বুঝতে পারে যে অমুক ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে তবে তা গিবত বলে গণ্য এবং হারাম হবে। এরকম যে কোনো বিষয়ে সমালোচনা করা গিবত হবে। সেটা যদি ইবাদতের ত্রুটি-বিচ্যুতির উল্লেখপূর্বক সমালোচনাও হয় সেটিও গিবতের অন্তর্ভুক্ত। গিবত জঘন্যতম কবিরা গুনাহ। এর পরিণতি ভয়াবহ। যে গিবত করে এবং যে শুনে দুজনই সমান অপরাধী। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘গিবত শ্রবণকারীও গিবতকারীদের একজন।’ (তারাবানী) ইচ্ছাকৃতভাবে গিবত শ্রবণ করা নিজে গিবত করার মতোই অপরাধ। গিবতের ভয়াবহতা সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘গিবত করা জিনা থেকেও মারাত্মক।’ (মেশকাত, বায়হাকী) অতএব বুঝা গেল জিনা করলে যে গুনাহ হয়, এর চাইতে বেশি গুনাহ হয় গিবত করলে। জিনা করার পর তওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। কিন্তু গিবত হলো বান্দার হক। তাই যার সম্পর্কে গিবত করা হয় সে ক্ষমা না করলে আল্লাহ তাকে মাফ করেন না।

 

আবু বারযাহ আল-আসলামী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘সেসব লোক, যারা কেবল মুখেই ঈমান এনেছে; কিন্তু ঈমান অন্তরে প্রবেশ করেনি ! তোমরা মুসলিমদের গিবত করবে না ও দোষত্রুটি তালাশ করবে না। কারণ যারা তাদের  দোষত্রুটি খুঁজে বেড়াবে আল্লাহও তাদের দোষত্রুটি খুঁজবেন। আর আল্লাহ কারো দোষত্রুটি তালাশ করলে তাকে তার ঘরের মধ্যেই অপদস্থ করে ছাড়বেন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং-৪৮৮০) পরকালেও গিবতকারীর অবস্থা হবে ভয়াবহ। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘মিরাজের রাতে আমি এমন এক কওমের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম যাদের নখগুলো তামার তৈরি এবং তা দিয়ে তারা অনবরত তাদের মুখমণ্ডল ও বুকে আঁচড় মারছে। আমি বললাম, হে জিবরাইল! এরা কারা? তিনি বললেন, এরা সেসব লোক যারা মানুষের গোশত খেত (গিবত করত) এবং তাদের মানসম্মানে আঘাত হানত ।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং- ৪৮৭৮)

 

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অপর মুসলিমের গিবত করে এক লোকমা ভক্ষণ করবে, আল্লাহ তাকে এজন্য জাহান্নাম হতে সমপরিমাণ ভক্ষণ করাবেন। আর যে ব্যক্তি অপর মুসলিমের দোষত্রুটি বর্ণনার পোশাক পরবে, আল্লাহ তাকে অনুরূপ জাহান্নামের পোশাক পরাবেন। আর যে ব্যক্তি অপর ব্যক্তির কুৎসা রটিয়ে খ্যাতি ও প্রদর্শনীর স্তরে পৌঁছবে, মহান আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকে ওই খ্যাতি ও প্রদর্শনীর জায়গাতেই (জাহান্নামে) স্থান  দেবেন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং- ৪৮৮১)

 

আমাদের উচিত গিবত থেকে বিরত থাকা। গিবত আমল ধ্বংসের নীরব ঘাতক। গিবত করার ফলে আমাদের আমলের থলিটা যে শূন্য হয়ে যাচ্ছে। সেটি আমরা ঘুণাক্ষরেও টের পাই না। যার গিবত করা হয় তার আমলনামায় গিবতকারীর সওয়াব চলে যায়৷ উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালার কাছে মর্যাদার দিক দিয়ে সর্বাধিক নিকৃষ্ট সেই লোক হবে, যাকে মানুষ তার অনিষ্টের ভয়ে ত্যাগ করেছে।’ (বুখারি, মুসলিম) গিবত সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা অন্যের প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করা থেকে বেঁচে থাকবে, কেননা এরূপ ধারণা জঘন্যতম মিথ্যা। আর কারো দোষ অনুসন্ধান করবে না, কারো গোপনীয় বিষয় অন্বেষণ করবে না, একে অন্যকে ধোঁকা দেবে না, পরস্পর হিংসা করবে না, একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ মনোভাব পোষণ করবে না, পরস্পর বিরুদ্ধাচরণ করবে না, বরং তোমরা সবাই এক আল্লাহর বান্দা হিসেবে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে থাকবে।’ (বুখারি ও মুসলিম)

 

কেউ অপরাধ করলেও তার সমালোচনা করা উচিত নয়। কারণ হতে পারে সে ভুল করে তওবা করেছে। আর হাদিস শরিফে এসেছে হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি আপন (মুসলমান) ভাইকে কোনো এমন গুনাহের ওপর লজ্জা দিল, যে গুনাহ থেকে সে তওবা করেছে, তবে এই লজ্জাদাতা ততক্ষণ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সে নিজে ওই গুনাহের মধ্যে লিপ্ত না হবে।’ (তিরমিযি)

 

তাই আমাদের এই জঘন্যতম পাপাচার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। আমরা কারো আড়ালে সমালোচনা করবো না। প্রয়োজন হলে তাকে তাঁর দোষ ধরিয়ে দিব। এতে সে নিজেকে শুধরে নেওয়ার সুযোগ পাবে। আত্মত্যাগের মনোভাব গড়ে তুলব। নিজের জন্য এবং সবার জন্য দোয়া করব, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করব। নিজে গিবত করব না এবং শ্রবণও করব না। কেউ গিবত করতে আসলে তাকে সমর্থন করব না; বরং প্রয়োজনে প্রতিহত করার চেষ্টা করব। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের মান-সম্ভ্রমের বিরুদ্ধে কৃত হামলাকে প্রতিহত করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা তাঁর থেকে জাহান্নামের আগুনকে প্রতিহত করবেন।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং-২৭৫৮৩) আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে সকল প্রকার গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমীন।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামিক অনলাইন মাদরাসা

সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads