হুমকির মুখে দেশের নির্মাণশিল্প

সংগৃহীত ছবি

শিল্প

করোনায় রড, সিমেন্ট ও পাথরের দাম বাড়ায় মেগা প্রকল্পগুলোর ব্যয় বৃদ্ধি

হুমকির মুখে দেশের নির্মাণশিল্প

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ৩১ মার্চ, ২০২১

কোভিড-১৯-এর ভয়াবহতা সারা বিশ্বের প্রধান বৈশ্বিক সমস্যা এখন। এ অবস্থায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা-বাণিজ্যে চরম স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে মন্থরগতি দেখা দিয়েছে দেশের বৃহত্তর নির্মাণশিল্প খাতে।

ভয়াবহ কোভিড-১৯ আর গত বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে সমুদ্রে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল, রেল পরিবহন ও আকাশপথে। ফলে এসব সেক্টরে সৃষ্টি হয়েছে মারাত্মক শিডিউল বিপর্যয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রুটে বিমান পরিবহন কমে যাওয়ায় পোশাকশিল্প খাতসহ অন্যান্য সেক্টরে চরম মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। আর এতে করে বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীদের প্রতিনিয়ত গুনতে হচ্ছে লোকসানের বোঝা। বিশেষ করে বিপর্যয়কর অবস্থা তৈরি হয়েছে নির্মাণশিল্প খাতে। হঠাৎ করেই রড, সিমেন্ট ও পাথরের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে হুমকির মুখে পড়েছে বড় বড় মেগা প্রকল্প। মূল্য বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পগুলোর ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে মারাত্মকভাবে। এতে করে নির্মাণশিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা পড়েছেন চরম বেকায়দায়।

জানা যায়, সঠিক সময় পাথর, রড, সিমেন্ট ইত্যাদি নির্মাণ পণ্যের আমদানি না হওয়ায় বিঘ্নিত হচ্ছে দেশের নির্মাণকাজের অগ্রগতি। প্রায় এক বছর যাবৎ চলমান এ অবস্থার ফলে দেশের নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো পাথর এবং রড না পাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে কাজের অগ্রগতি। এই অবস্থায় দেশের সেতু, সড়ক ও ইমারত নির্মাণ অগ্রগতিতে অনেকটা ভাটা পড়েছে, পাশাপাশি বৃদ্ধি পেয়েছে নির্মাণ ব্যয়। গেল বছরগুলোতে একই সময় নির্মাণকাজের যে অগ্রগতি ছিল এখন তা পঞ্চাশ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এর প্রধান কারণ নির্মাণ সামগ্রী সঠিক সময় সরবরাহ ব্যাহত হওয়া। নির্মাণশিল্পের অন্যতম কাঁচামাল পাথরের চাহিদার অধিকাংশ আমদানি করা হয় ভারত ও ভুটান থেকে। এছাড়া দুবাই, চায়না, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকেও পাথর আমদানি করা হয়ে থাকে। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে জাহাজ ও রেল সেক্টরে দেখা দিয়েছে সিডিউল বিপর্যয়। তাই সঠিক সময় চাহিদামতো নির্মাণশিল্পের প্রধান এই কাঁচামাল কোনোভাবেই সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না।

দেশে যে পরিমাণে রড ও সিমেন্ট উৎপাদন হয়, তাতে চাহিদা না মেটায় আমদানিনির্ভর হতে হয় দেশের নির্মাণশিল্পকে। তবে রড-সিমেন্টের কিছুটা জোগান দেশের উৎপাদনে পূরণ হলেও, বিশ্ববাজারে রডের কাঁচামালের দাম বাড়ায় গত দুই মাসে টনপ্রতি রডের দাম বেড়েছে ১২-১৩ হাজার টাকা। তাতে বিপাকে পড়েছেন ব্যক্তি খাতে বাড়ি নির্মাণকারী, আবাসন ব্যবসায়ী ও সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদাররা। দেশে বছরে রডের চাহিদা ৫৫ লাখ টনের বেশি। সেই হিসাবে মাসে সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টন রড দরকার হয়, শুষ্ক মৌসুমে চাহিদা আরো বেশি। হিসাব করে দেখা যায়, টনপ্রতি গড়ে ১২-১৩ হাজার টাকা বাড়লে প্রতি মাসে গ্রাহকদের বাড়তি ব্যয় দাঁড়াবে সাড়ে পাঁচশ কোটির টাকার বেশি। একই কারণে বেড়েছে দেশে উৎপাদিত সিমেন্টের দাম। সিমেন্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, সিমেন্ট খাতের পাঁচটি কাঁচামালই আমদানির্ভর। বন্দরে জাহাজজট ও সিডিউল বিপর্যয়ের কারণে গত বছর থেকে কাঁচামালের আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে।

দেশের আবাসন ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত বছর শুরু করা তাদের নির্মাণাধীন ভবনগুলোর অধিকাংশের কাজ বন্ধ হয়ে আছে শুধু পাথর রড ও সিমেন্টের কারণে। আর ক্রেতাদের চাহিদার কারণে যাদের নির্মাণকাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে, তাদের পাথর, রড ও সিমেন্ট কিনতে হচ্ছে অনেক বেশি দাম দিয়ে। ফলে লোকসানের মুখে পড়েছেন বেশিরভাগ ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ অ্যাসোশিয়েনন্স অব কনস্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার শফিকুল হক তালুকদার বলেন, করোনা মহামারীতে  নির্মাণশিল্প স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে করে বিশাল একটি কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বেকার হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার যদি এখনই এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ না করে তাহলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে এ খাত। এজন্য সরকারকে অতি দ্রুত মূল্য সমন্বয় করে নির্মাণ খাতের গতি বৃদ্ধি করতে হবে। তার মতে, অধিকাংশ প্রকল্পই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ঠিকাদাররা  সঠিক সময়ে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে অনেকেই দেউলিয়া হয়ে যাবেন। সেইসাথে যথাসময়ে প্রকল্পগুলোর কাজ সমাপ্ত না হলে প্রকল্পগুলোর ব্যয় বৃদ্ধি পাবে মারাত্মকভাবে। এতে করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোই হুমকির মুখে পড়তে পারে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads