স্বাধীনতা আল্লাহতায়ালার দান। মানুষ সৃষ্টিগতভাবে স্বাধীন। কোনো পরাধীন, কোণঠাসা কিংবা ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়া কারো জন্য সহনীয় হয় না। স্বাধীন একটি রাষ্ট্রের স্বাধীন নাগরিক হতে পারাই মানুষের জন্য প্রত্যাশিত। এ স্বাধীনতার অর্থই হচ্ছে দুনিয়ায় সুস্থতা ও কল্যাণমুখী জীবনযাপনে আল্লাহর দেওয়া অপরিমেয় সামর্থ্যের অধিকারী হওয়া।
১৯৭১ সাল বাংলাদেশ ভূখণ্ডের এক গৌরবগাথা ইতিহাস, যা বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। মহান প্রভুর অশেষ রহমত এবং লাখো মানুষের আত্মত্যাগ, হাজারো মা-বোনের ইজ্জত-সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। দীর্ঘ নয় মাস আপ্রাণ চেষ্টার পর পূর্ববাংলার জনগণ পৃথিবীর মানচিত্রে যোগ করেছে এক টুকরো বাংলাদেশ।
আমাদের এ ভূখণ্ডের নিকট-অতীতে স্বাধীনতার জন্য লড়াই হয়েছে প্রায় ৪৮ বছর আগে। নয় মাসব্যাপী এই যুদ্ধ শুরু হয় ওই বছরের মার্চের ২৫ তারিখ রাত থেকে। আর ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে দেশটি স্বাধীনতা অর্জন করে। জেনে রাখা উচিত, স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা হয় ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ থেকে। তখন থেকে নানা ধরনের কুসংস্কার মুসলমান সমাজকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষা-দীক্ষায় মুসলমানরা পিছিয়ে পড়তে থাকে। সেই সাথে মুসলমানদের ওপর শুরু হয় ইংরেজ ও হিন্দু জমিদারদের উৎপীড়ন ও নির্যাতন। বাংলার মুসলমানদের এ মহাদুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করা এবং সেই সাথে স্বাধীকার আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করতে যেসব ফকিহ-আলেম অবদান রেখে গেছেন তার মধ্যে আবদুল ওহাব, হাজী মুহাম্মদ শরীয়তুল্লাহ, মীর নিসার আলী ওরফে তিতুমীর ও ফকির মজনু শাহের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বালাকোট ঘটনার আগে ও পরে সর্ব ভারতীয় জিহাদ আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত অনালোচিত ও অচর্চিত বহু বীর-শহীদ এই বাংলাদেশ থেকে যুক্ত ছিলেন বলে জানা যায়। এ তালিকার সংগঠক ও নেতৃস্থানীয় কিছু সংগ্রামীর নাম এখানে উল্লেখ করা যায়। এদের প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন পণ্ডিত আলেম ও উঁচুপর্যায়ের বুজুর্গ ব্যক্তিত্ব। অতুলনীয় আধ্যাত্মিক রাহবার হিসেবেও স্থানীয়ভাবে তাদের খ্যাতি ছিল। এদের অন্যতম প্রধান ছিলেন নোয়াখালীর মাওলানা গাজী ইমামুদ্দীন বাঙ্গালী (রহ.)। আরও রয়েছেন চট্টগ্রাম মিরসরাইয়ের শায়খ সুফি নূর মুহাম্মাদ নিযামপুরী (রহ.), সাতকানিয়ার মাওলানা আবদুল হাকীম (রহ.), কুষ্টিয়া-কুমারখালীর মাওলানা কাজী মিয়াজান (রহ.)। এছাড়া বালাকোট শহীদ মৌলভী আলীমুদ্দীন (রহ.), ময়মনসিংহ-ত্রিশালের মাওলানা গাজী আশেকুল্লাহ (রহ.), মাওলানা লুৎফুল্লাহ শহীদ, মৌলভী আলাউদ্দীন বাঙ্গালী (রহ.), মাওলানা আশরাফ আলী মজুমদার (রহ.), মাওলানা মুহাম্মাদ মনীরুদ্দীন (রহ.), মাওলানা আমীনুদ্দীন (রহ.), শায়খ হাসান আলী (রহ.), মুন্সি ইবরাহীম শহীদ, সাইয়েদ মুযাফফর শহীদ, মৌলভী করীম বখশ শহীদ, হাজী বদরুদ্দীন (রহ.), মাওলানা আজীমুদ্দীন (রহ.) ও মাওলানা আশরাফ আলী (রহ.) প্রমুখ। (মাসিক আল কাউসার : মার্চ ২০১৩)
ব্রিটিশ ১৯০ বছর শাসন করার পর আমরা বাঙালি জাতি আবারো তৎকালীন বর্বর পাকিস্তানিদের শাসনে শোষিত হতে হয় প্রায় ২৫ বছর। তাই মজলুম বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে কাজ করেছেন অসংখ্য উলামায়ে কেরাম ও পীর-মাশায়েখরা। তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন আল্লামা হাফেজ্জি হুজুর (রহ.), আল্লামা আসআদ মাদানী (রহ.), আল্লামা লুৎফুর রহমান বরুণী (রহ.), চরমোনাই পীর মাওলানা ইসহাক (রহ.), আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ, আল্লামা মুফতি নুরুল্লাহ (রহ.), আল্লামা এমদাদুল হক আড়াইহাজারী (রহ), আল্লামা শামসুদ্দিন কাসেমী (রহ.) প্রমুখ। (দৈনিক ইত্তেফাক : ২৬ মার্চ ২০১৬)
১৯৭১ সালে শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক, মুফতি মাহমুদ, হাফেজ্জি হুজুরসহ প্রমুখ আলেম জনসাধারণকে স্বাধীনতা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও আলেম সমাজ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। ভারতের দেওবন্দ মাদরাসাকেন্দ্রিক আলেমদের সংগঠন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে ফতোয়া দিয়েছিলেন। এ আন্দোলনে অংশগ্রহণের তাগিদ প্রদান করে আল্লামা মোহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জি হুজুর (রহ.) বলেন, এ যুদ্ধ ইসলাম আর কুফরের যুদ্ধ নয়, এটা হলো জালেম আর মজলুমের যুদ্ধ। পাকিস্তানিরা জালেম, এদেশের বাঙালিরা মজলুম। তাই সামর্থ্যের আলোকে সবাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হবে এবং এটাকে প্রধান কর্তব্য বলে মনে করতে হবে।’ (মাসিক ইসলামি বার্তা : প্রথম প্রকাশ ২৬ মার্চ ২০১৮)
এসএম আরিফুল কাদের