বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস একটি ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। আমাদের জীবনে এদিনটির গুরুত্ব অপরিসীম। এটি নব প্রত্যয় ও শপথ গ্রহণের দিন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। দেশকে স্বাধীন করার জন্য বাঙালি নিয়েছিল দৃপ্ত শপথ। পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণের নাগপাশ থেকে নিজেদের মুক্ত করার জন্য এবং আপন পরিচয় খোঁজার নিমিত্তে সেদিন বাঙালি গর্জে উঠেছিল। দীর্ঘদিনের শোষণ ও নিপীড়ন ভেঙে আবহমানকালের গৌরবময় সাহসিকতার ইতিহাস যেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেদিন এই জাতির ভেতরে। তাই সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করে সেদিন বাঙালি অর্জন করেছিল স্বাধীনতার সোনালি সূর্য। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে আমাদের জীবনে ঘটেছে অনেক উত্থান-পতন এবং প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির সমারোহ।
যে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল বাংলাদেশ, সেই পাকিস্তানই এখন আর্থসামাজিক প্রায় সব সূচকেই পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশের চেয়ে। শুধু তাই নয়, পাকিস্তান এবং প্রতিবেশী দেশ ভারত স্বাধীনতা অর্জনের ৭৪ বছরে যে সফলতা অর্জন করতে পারেনি, বাংলাদেশ তা করে দেখিয়েছে ৫০ বছরে। স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনীতির যাত্রা শুরু হয় ১৯৭২ সালে। সে সময় প্রায় প্রতিটি সূচকেই এগিয়ে ছিল ভারত-পাকিস্তান। এখন এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটিই আমাদের স্বাধীনতার বড় অর্জন। যে-কোনো দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ধরা হয় মানবসম্পদ উন্নয়নকে। এ ক্ষেত্রেও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের ‘মানব উন্নয়ন সূচক-২০২০’ প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৭৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৬ পয়েন্ট নিয়ে ৫২তম। সেখানে পাকিস্তান ৪১ পয়েন্ট নিয়ে ৩১তম স্থানে আছে। ৪৯ পয়েন্ট নিয়ে ভারত ৫৯তম স্থানে থেকে অবশ্য এ সূচকে এগিয়ে আছে। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ২০৬৪ ডলার। সেখানে পাকিস্তানের ১ হাজার ৬৪১ ডলার এবং ভারতের ১ হাজার ৮৯৫ ডলার। আরেক অর্থনীতিবিদ পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, স্বাধীনতার এই ৫০ বছরে বাংলাদেশ নামক এই দেশটির অর্জন অনেক। ক্ষুধা-দারিদ্র্যপীড়িত দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, যে বাংলাদেশে ঠিকমতো রাস্তাঘাট ছিল না, সে দেশ ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি টাকায় নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরি করে। আমাদের আরো কিছু প্রাপ্তির মধ্যে বড় একটা হচ্ছে পদ্মা সেতুু নির্মাণ। যা কি-না বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২ প্রান্তকে সংযোগ করেছে, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রসহ ১০টি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। আর্থিক ও সামাজিক সূচকে ভারত-পাকিস্তানের সঙ্গে আরো কিছু সূচকের তুলনা করলে দেখা যায় আসলেই বাংলাদেশ কতটা এগিয়েছে সমৃদ্ধি পথে। শিশু মৃত্যুহার রোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অবাক করার মতো উন্নতি করেছে। একটা সময় ছিল যখন দেশে চিকিৎসার অভাবে কিংবা জনসচেতনতার অভাবে শিশু মৃত্যুহার ছিল অত্যধিক। আর এখন তা ভারত-পাকিস্তানের থেকে এগিয়ে। ভারতে প্রতি ১০০০ জনে ৩০, পাকিস্তানে ৫৮ ও বাংলাদেশে ২২ জন শিশু মৃত্যুহার। শিক্ষার হারের ক্ষেত্রেও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে এখন শিক্ষার হার ৭৩ দশমিক ৯ শতাংশ, পাকিস্তানের ৫৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। শিক্ষার হারে অবশ্য বাংলাদেশ ভারতের থেকে পিছিয়ে। ভারতের শিক্ষার হার ৭৪ দশমিক ৪ শতাংশ। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এখন ১ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে গেছে অথচ পাকিস্তানে তা ২ দশমিক ১ শতাংশ। শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শীর্ষে।
উন্নত দেশ গঠনে কাজ চলছে ১০ মেগা প্রকল্পের : নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। এরপর মধ্য আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ। এখন বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখছে উন্নত দেশ হওয়ার। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য রয়েছে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত দেশে নিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারে উন্নীত করতে কাজ চলছে ১০টি মেগা প্রকল্পের। এ ছাড়া আরো কিছু উন্নয়নের অগ্রগতি হচ্ছে-রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল প্রকল্প, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্প, কর্ণফুলি টানেল। স্বাধীনতার ৫০ বছরের পূর্ণতায় বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে দুর্বার গতিতে।
স্বাধীনতার ৫০ বছরে যেমন আমাদের প্রাপ্তি আছে তেমনি কিছু আছে অপ্রাপ্তি, যা কি না আমরা এখনো নির্মূল করে উঠতে পারিনি। আজ যে আমরা স্বাধীন দেশে বসবাস করতে পারছি তার মূলে ছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনা। ১৯৭১ সালে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে একসাথে লড়াই করে অর্জিত হয়েছিল এই স্বাধীনতা। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছরে কি আমরা সেই ভেদাভেদ ভুলতে পেরেছি? যে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাই এক হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে সেই চেতনা কি এখনো বিরাজমান আছে? এই স্বাধীন দেশে আমরা কি নিরাপদভাবে বসবাস, চলাচল করতে পারছি? আজ সব থেকে বেশি নারী ও শিশুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। যে নারী শক্তির দ্বারা এই দেশ স্বাধীন হয়েছে আজ সেই দেশের নারীরাই সব থেকে বেশি নির্যাতিত। ধর্ষণ, খুন, অপহরণের শিকার হচ্ছেন তারা। শিশুদের ওপর হচ্ছে অমানবিক নির্যাতন। যে অসাম্প্রদায়িক উদারচিন্তার বলে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে আজ সেই দেশেই সাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারণে দেশের সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হচ্ছে। তারা স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারছে না। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় যেখান অসাম্প্রদায়িক চিন্তাধারায় বিশ্বাসী ছিল, আজ সেই দেশেই প্রতিনিয়তই সাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারণেই সংখ্যা লঘুরা নির্যাতিত হয়েই চলেছ। তাহলে এই স্বাধীন দেশে এখনো কি আইনের যাথযথ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়ে ওঠেনি?
বাংলাদেশকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে অর্থাৎ উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশে উত্তীর্ণ করতে হলে দরকার সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। তাই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমাদের শপথ হোক, দেশের সার্বিক উন্নয়নে জাতি, ধর্ম, নারী, পুরুষ ও দলমত নির্বিশেষে সকলেই এক হয়ে স্বাধীনতার পূর্ণ বাস্তবায়নে কাজ করা এবং দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সরকারের পাশাপাশি কাজ করা।
লেখক :প্রসেনজিৎ কুমার রোহিত
শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ, ঢাকা





