স্বাধীনতার মধুর ক্ষণেও প্রাণ পায়নি বইমেলা

ছবি: বাংলাদেশের খবর

জাতীয়

স্বাধীনতার মধুর ক্ষণেও প্রাণ পায়নি বইমেলা

  • রায়হান উল্লাহ
  • প্রকাশিত ২৬ মার্চ, ২০২১

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর মধুর ক্ষণে এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার অমর একুশে বইমেলায় ক্রেতা-দর্শনার্থীদের ভিড় তেমন লক্ষ করা যায়নি। বিক্রেতা ও বাংলা একাডেমি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর নিয়ে বিরোধিতা এবং ঢাকায় গণ্ডগোলের শঙ্কা থাকায় সেই পরিমাণ ক্রেতা-দর্শনার্থী আসেননি। এ ছাড়া কোভিড-১৯ পরিস্থিতি তো ছিলই। ঢাকায় গণপরিবহনের অল্প চলাচল বইমেলায় জমায়েত কম হওয়ার জন্যও দায়ী বলে মত তাদের।

অনেক স্টলের কর্মী ও সংশ্লিষ্টরা বইয়ের বিক্রি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। তাদের দাবি, মেলা নবম দিনে পা রাখলেও বিক্রি পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি হয়নি। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, এবার স্টলের খরচ তোলাই অংশগ্রহণকারীদের জন্য দুরূহ হয়ে দাঁড়াবে দাবি তাদের।

মেলার বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশ ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন স্টলের বিক্রয়কর্মীরা অলস সময় পার করছেন। একে অন্যের সঙ্গে খোশগল্প করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাতে হয় তাদের। এদিন ছিল বইমেলার দ্বিতীয় ছুটির দিন। বেলা ১১টায় খুলে দেওয়া হয় বইমেলার দ্বার। পরে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বইমেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, হাতেগোনা কয়েকজন দর্শনার্থী মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন। ফলে মেলার গেটে দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীরাও অলস সময় পার করেন। মেলায় অংশ নেওয়া স্টলগুলোতে যে পরিমাণ কর্মী দায়িত্ব পালন করেন, তার সমপরিমাণ দর্শনার্থীও মেলায় প্রবেশ করেননি বলে অনেকে টিপ্পনি কাটেন।

তবে অনেকে জানান, অন্য দিনের চেয়ে বই বিক্রি বেশি হয়েছে শুক্রবার। তারা জানান, সকালের দিকে প্রায় দর্শনার্থীশূন্য থাকলেও বিকেলের দিকে মানুষ এসেছেন, সন্ধ্যার পর পর ক্রমেই জমে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ।

বাংলা একাডেমি জানায়, শুক্রবার মেলায় নতুন বই এসেছে ২৭৬টি; যার মধ্যে গল্প ৩৭, উপন্যাস ৪৭, কবিতা ৯৫ ও প্রবন্ধের বই ১২টি।  

আলোর ভুবন স্টলের মেহেদী হাসান বলেন, ‘এবারের মেলার বিক্রি পরিস্থিতি খুবই খারাপ। দর্শনার্থীই আসছে না, তাহলে বিক্রি হবে কীভাবে!’ তিনি বলেন, ‘এবার মেলায় ক্রেতা-দর্শনার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম। কারণ হতে পারে গণপরিবহন কম চলছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি আট বছর ধরে বইমেলায় অংশগ্রহণ করছি। এর আগে কখনো বিক্রি পরিস্থিতি এত খারাপ ছিল না।’

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উত্তর-পশ্চিম দিকে বইয়ের স্টলে বসা আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ১২ বছর ধরে বইমেলায় অংশগ্রহণ করছি, এত খারাপ পরিস্থিতি আগে কখনো দেখিনি। বেলা ১১টায় মেলার গেট খুলেছি, এখন দুপুর ১টা বেজে গেছে। দুই ঘণ্টায় আমরা মাত্র ৪০ টাকার একটি বই বিক্রি করেছি।’

মেলায় পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা রমনার রুহুল আমিন বলেন, ‘মেলার দর্শনার্থী ও ক্রেতার উপস্থিতি হতাশাব্যঞ্জক। করোনার মধ্যে কম মানুষ আসবে এটিই অবশ্য স্বাভাবিক। ঢাকায় মোদির সফর নিয়ে গোলযোগ হওয়াও কারণ।’

সিদ্বেশ্বরী থেকে মেলায় আসা মৃধা রায়হান বলেন, ‘স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর মধুর ক্ষণে বইমেলায় না এলে হয় না। যদিও চারপাশের পরিস্থিতি শঙ্কা জাগাচ্ছে।’

অনুপম প্রকাশনীর বিক্রেতা আরিফুল হাসান বলেন, ‘করোনাকাল বিবেচনায় মেলায় ক্রেতা-দর্শনার্থী যা এসেছে তাই স্বাভাবিক।’ চারুলিপি প্রকাশনার কাদের খান বলেন, ‘মেলায় দর্শনার্থী কম। সার্বিকভাবেও এবারের মেলার পরিস্থিতি ভালো না। আমরা গত বছর প্রথম আট দিনে যে পরিমাণ বিক্রি করেছি, এবার তার পাঁচভাগের একভাগ হয়েছে।’

আগামী প্রকাশনীর প্রকাশক ওসমান গনি বলেন, বইমেলা শুধু একটি মেলা নয়, এখন এটি বাঙালির সর্ববৃহৎ সাংস্কৃতিক আয়োজন। সেটি যে হচ্ছে এবং তা করোনা পরিস্থিতিতেও এক সপ্তাহ ভালোভাবে পার করল, এটা অবশ্যই ভালো বিষয়।

অন্বেষা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী শাহাদাত হোসেন বলেন, করোনাকালে সৃজনশীল প্রকাশনা পুরোপুরি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তাই বইমেলাটি প্রকাশকদের কাছেও কাঙ্ক্ষিত। গত এক সপ্তাহের মেলা মন্দ নয়। আমরা আশা করছি মেলার সামনের দিনগুলো আরো ভালো হবে।

তাম্রলিপি প্রকাশনীর প্রকাশক তারিকুল ইসলাম রনি বলেন, করোনার মধ্যে বইমেলা যেমনটা হবে ভেবেছিলাম, তেমনটা হয়নি। আশা করছি মেলার সামনের দিনগুলো আরো ভালো হবে। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন, ‘এই মেলাকে ভর করে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। এই মেলার অনেক দরকার ছিল। এ তো লেখক-পাঠক-প্রকাশকদের প্রাণের মেলা। বহু লেখক, পাঠক তৈরি হয়েছে এই মেলাকে কেন্দ্র করে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লেখক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘বইমেলার কাজ বই এবং পাঠককে এক জায়গায় নিয়ে আসা।’ তিনি বলেন, মুক্তধারার প্রকাশক চিত্তরঞ্জন সাহা দুটি উদ্দেশ্য সামনে নিয়ে বইয়ের মেলা শুরু করেছিলেন। একটি হলো, বইকে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া। আর দ্বিতীয় বিষয়টি ছিল, ১৯৭৫ সালের পর পাকিস্তানপন্থি চিন্তাভাবনা, সংরক্ষণবাদী চিন্তাভাবনা যখন আবার দেখা গেল, সেই প্রেক্ষাপটে তরুণদের মনকে মুক্তিযুদ্ধের দিকে সংস্কৃতির শিকড়ের দিকে নিয়ে আসা।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, আমরা এখন একটা অস্থির সময় পার করছি। যেহেতু আমরা এক সপ্তাহ সুন্দর করে মেলা পরিচালনা করতে পেরেছি, সেহেতু আমরা আনন্দিত। আমরা চাই সামনের দিনগুলোও যেন সুন্দরভাবে কাটে। তিনি বলেন, করোনার সময়ে বইমেলা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য একাডেমির পক্ষ থেকে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিটি প্রকাশনীকে মাস্ক ব্যতীত ক্রেতাদের কাছে বই না বিক্রি করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে বাংলা একাডেমি। একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান করোনা-পরিস্থিতিতে বাংলা একাডেমি, প্রকাশকরা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ উদ্যোগে মেলায় আগতদের স্বাস্থ্য-সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে হ্যান্ডওয়াশ, হ্যান্ড স্যানিটাইজার সরবরাহ এবং মাস্ক ছাড়া বই বিক্রি নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। মহামারীর মধ্যে এবারের বইমেলায় নিরাপত্তার নজরদারির সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধির কড়াকড়িও থাকবে। তা ছাড়া মেলার সময় পিছিয়ে চৈত্রে আসায় থাকবে ঝড়বৃষ্টির ঝুঁকি। প্রবেশপথে হাত ধোয়া ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মাস্ক ছাড়া কাউকে মেলায় ঢুকতে দেওয়া হবে না বলেও সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।

ভিড় এড়াতে এবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পূর্ব প্রান্তে নতুন প্রবেশপথ করা হয়েছে। সব মিলে তিনটি প্রবেশপথ ও তিনটি বের হওয়ার পথ থাকছে। প্রত্যেক প্রবেশপথে সুরক্ষিত ছাউনি থাকবে, যাতে বৃষ্টি ও ঝড়ের মধ্যে মানুষ আশ্রয় নিতে পারেন। বিশেষ দিনগুলোতে লেখক, সাংবাদিক, প্রকাশক, বাংলা একাডেমির ফেলো এবং রাষ্ট্রীয় সম্মাননাপ্রাপ্ত নাগরিকদের জন্য প্রবেশের বিশেষ ব্যবস্থা করা হবে। এবারও শিশুচত্বর মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে থাকবে। তবে মহামারীর কারণে এবার প্রথম দিকে ‘শিশুপ্রহর’ থাকছে না।

বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রায় ১৫ লাখ বর্গফুট জায়গায় এবারের বইমেলা হচ্ছে। একাডেমি প্রাঙ্গণে ১০৭টি প্রতিষ্ঠানকে ১৫৪টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৩৩টি প্রতিষ্ঠানকে ৬৮০টি ইউনিট; মোট ৫৪০টি প্রতিষ্ঠানকে ৮৩৪টি ইউনিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মেলায় থাকছে ৩৩টি প্যাভিলিয়ন।

বইমেলা প্রতিদিন বিকেল ৩টায় শুরু হয়ে রাত ৯টা পর্যন্ত তা চলবে। ছুটির দিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে। তবে শুক্রবার দুপুর ১টা থেকে বিকাল ৩টা এবং শনিবার দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত বিরতি থাকবে। বইমেলা চলবে আগামী ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত। ১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমির গেটে চট বিছিয়ে বই বিক্রি শুরু করেন মুক্তধারা প্রকাশনীর মালিক চিত্তরঞ্জন সাহা। ১৯৭৭ সালে তার সঙ্গে আরো অনেকে যোগ দেন। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী বাংলা একাডেমিকে এ বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। পরের বছর মেলার সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি।

১৯৮৩ সালে মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকার সময় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ নামে এ মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও তা আর করা যায়নি। পরের বছর ১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ‘অমর একুশে বইমেলার সূচনা হয়।

মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের মাস ফেব্রুয়ারিজুড়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের এই বইমেলা এখন বাঙালির মননের মেলায় পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads