নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ মসজিদ কমিটিকে ঘিরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চরমে উঠেছে। থানা আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি কমিটি ঘোষণা করলেও তা মানছেন না মসজিদের মোতাওয়াল্লি ও সেক্রেটারিসহ অন্য মুসল্লিরা। তারা বলছেন, একাধিক মামলার আসামি ও অসৎ ব্যক্তিকে সভাপতি করে কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। আর আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি বলছেন, দুই পক্ষের মতামত নিয়েই কমিটি করেছেন। তবে স্থানীয় কমিশনার জানিয়েছেন, দ্বন্দ্বের নেপথ্যে রয়েছে আয়-ব্যয়ের হিসাব। সমাধানে আসতে এবং হিসাবে গরমিল আছে কি না তা খতিয়ে দেখতে আজ (শুক্রবার) দুই পক্ষের একত্রে বসার কথা।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার নিমাই কাশারী বাজার বাইতুস শরিফ জামে মসজিদের মোতাওয়াল্লি হাজি মোহাম্মদ আলী জানান, আমার বাবা মসজিদের জন্য জমি দিয়েছেন। তিনি ২০ বছর আগে মারা গেছেন। এরপর মুসল্লিরা মোহাম্মদ আলীকে মসজিদের মোতাওয়াল্লির দায়িত্বে বসান। নিয়ম অনুযায়ী মোতাওয়াল্লিই হবেন মসজিদের নির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক। তিনি আয়-ব্যয়ের তদারকি এবং কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে মসজিদ উন্নয়নে তা ব্যয় করবেন। কাগজে দায়িত্বে থাকলেও বাস্তবে কোনো কাজেই তাকে রাখা হয় না। তার মতামতেরও কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয় না। একটি চক্র টাকা আত্মসাৎ করেই চলেছে।
কী পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেছে জানতে চাইলে বলেন, গত ১৮ বছরের যদি হিসাব করি তাহলে চক্রটি তিন কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। আমি ২০১৩ সাল থেকে প্রতিবাদ করে আসছি। ২০১৬ সালে থানা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি এসে তিন বছর মেয়াদি একটি কমিটি ঘোষণা করেন। কিন্তু কমিটি ঘোষণার কোনো ইখতিয়ার তার নেই। মোতাওয়াল্লি হিসেবে আমারও কথা থাকতে পারে। কিন্তু তারা আমার কথা শোনেননি। তাই ওই কমিটির কাগজে স্বাক্ষর করিনি। আজ পর্যন্ত আমাকে ওই কমিটি কোনো হিসাব দেয়নি। মোতাওয়াল্লি হিসেবে আমি ওই অবৈধ কমিটি বিলুপ্ত করে চলতি বছরের ৭ অক্টোবর সাত সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করি। কোষাধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম আগের কমিটিতেও ছিলেন। অন্য সদস্যরা হলেন- সুন্দর আলী, শহীদুল আলম, ডাডা. আব্দুল মান্নান, সাইফুল ইসলাম ও আব্দুল আজিজ।
গত এক মাস ধরে এলাকার অনেক মানুষ সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি হাজি ইয়াসিন মিয়ার বাসায় গেছেন। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। সেক্রেটারি সম্পর্কে আমার মামা হন। আমি, আমার মা এবং আমার ছোট ভাই তার বাসায় গিয়ে সব বিষয় তাকে খুলে বলেছি। তিনি তাদের বাড়িতে আসবেন বলে জানান। কিন্তু হঠাৎ তিনি আগের কমিটির সভাপতি শাহাবুদ্দিন মিয়াকে আবার সভাপতি করে কমিটি ঘোষণা দেন। শাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে একাধিক চাঁদাবাজি ও ভূমিদস্যুর মামলা আছে। তাই উনার কথা আমরা মানিনি। আমাদের সমাজ আছে। মুসল্লিরা আছেন। আমরা প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত যাব। মোহাম্মদ আলী আরো বলেন, আমি প্রয়োজনে আরো দুই শতক জায়গা মসজিদের জন্য দেব। আমি চাই মসজিদটা সুন্দরভাবে চলুক, দুষ্কৃতকারীদের হাত থেকে রক্ষা পাক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে থানা আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি হাজি ইয়াসিন মিয়া জানান, মসজিদের মোতাওয়াল্লি, তার মা, ভাই কাউন্সিলরসহ গণ্যমান্যরা একমত পোষণ করায় তিনি কমিটি ঘোষণা করেন। সভাপতির নামে মামলা প্রসঙ্গে বলেন, মামলা তো আমার-আপনার বিরুদ্ধে থাকতে পারে। ওই লোক কালপ্রিট কি না, বেনামাজি কি না, অসামাজিক কি না- এগুলো দেখতে হবে, তাহলে তাকে মসজিদ কমিটিতে বেমানান বলা যায়। লোকটা নামাজ পড়েন, লোকজনও ভালো বলছে। তারপরও যদি কেউ নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করতে অন্যদিকে প্রভাবিত করতে চায় আমাদের কি করণীয় আছে।
জানতে চাইলে স্থানীয় ৩ নং ওয়ার্ড কমিশনার শাহজালাল বাদল বলেন, এর আগেও আমাদের সেক্রেটারি সাহেব মসজিদ কমিটি করে দিয়ে গেছিলেন। এবারো তিনি দায়িত্ব নিয়ে এলাকার ১০ জনের সঙ্গে বসে একটা কমিটি করে দিয়েছেন। আমি এতটুকুই জানি। গত শুক্রবার সবার বসার কথা ছিল। সেখানে থানা আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি হাজি ইয়াসিন মিয়ারও আসার কথা ছিল। কিন্তু তিনি আসতে পারেননি। তাই পরদিন শনিবার এসে কমিটি করে দিয়ে গেছেন।
কাউন্সিলর বলেন, মূল সমস্যা হচ্ছে মসজিদের হিসাব নিয়ে। গত সোমবার দুই পক্ষই আমার অফিসে এসেছিল। আজ দুই গ্রুপকে নিয়ে একসঙ্গে বসে মসজিদের আয়-ব্যয়ের হিসাব দেখে এ ঝামেলা শেষ করব। একটা অডিট টিম করছি। সবার জানা দরকার মসজিদটা কোনদিকে চলছে।
উল্লেখ্য, গত কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর ২২ লাখ টাকায় ১৮টি এসি কেনা দিয়ে এলাকায় বেশ আলোচনার সৃষ্টি হয়। ২০১৬ সালে কমিটি হলেও ১৮ সালে দায়িত্ব বুঝে নেন কোষাধ্যক্ষ মো. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি জানান, রাগ করে দুই বছর দায়িত্ব নেননি। সেসময়ের কথা তিনি বলতে পারবেন না।
সভাপতি শাহাবুদ্দিন মিয়াকে ফোন করে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমাদের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি একটি অডিট টিম করে দেবেন বলে জানিয়েছেন। এরপর একটু পরেই টিঅ্যান্ডটি নাম্বার থেকে একজন ফোন করে নিজেকে একটি পত্রিকার সম্পাদক পরিচয় দিয়ে এ প্রতিবেদকে বলেন, আপনি শাহাবুদ্দিনকে কি বলেছেন, তিনি আমার ভাই।





