প্রথমেই রূপবদল বলতে কী বুঝবো, আলোচনা করা প্রয়োজন। মানবজীবনের মতো সাহিত্যও রূপান্তরশীল। জীবন বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যও বদলে যায়। সামাজিক রূপান্তরের বিষয়টি যদি লক্ষ করি তাহলে দেখা যাবে, গুহাজীবন থেকে মানুষ পুঁজিবাদী সমাজে এসে পৌঁছেছে। একইসঙ্গে মানুষের মধ্যে সৃষ্টিশীলতার উন্মেষ এবং তার রূপ-রূপান্তরও ঘটেছে। সৃষ্টিও সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হয়েছে। গুহাগাত্রে আঁকা ছবি থেকে আধুনিক ডিজিটাল ছবি বা মুখের উচ্চারিত স্বতঃস্ফূর্ত আবেগায়িত শব্দরাজি উত্তর-আধুনিক কালে এসে পরিশীলিত রূপ পেয়ে গেছে। সাহিত্যের সামাজিক ও নন্দনতাত্ত্বিক এই রূপান্তরের ফলে সাহিত্যও বদলে গেছে। বাংলা সাহিত্যও এভাবেই বদলে গেছে, ঘটেছে এর রূপরূপান্তর।
বাংলা সাহিত্যের শুরু চর্যাপদ থেকে। এই সাহিত্য ছিল মূলত গান— সাধনসঙ্গীত। এগুলি ছিল ছোট ছোট গীতিধর্মী লিরিক। সমাজের কথা যেমন তাতে প্রতিফলিত হয়েছে, তেমনি ব্যক্তিমানুষের কথাও আভাসিত হয়েছে। তবে সেটা প্রধান হয়ে ওঠেনি। ডিহিউম্যানিজমেরই প্রাধান্য ছিল সেই সাহিত্যে। এরপর উল্লেখযোগ্য রচনা বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। এতেই প্রথম ব্যক্তিমানুষের আবেগ অনুভূতির তীব্র উৎসারণ দেখা গেছে। ধর্মাশ্রিত প্রেমানুভূতি এই সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল। সেই সঙ্গে গল্প বা কাহিনি। প্রেমকাহিনি বলে লিরিক ও আখ্যানের অনেক বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যাবে এতে।
পরবর্তী যুগের সাহিত্য হচ্ছে মঙ্গলকাব্য ও বৈষ্ণব পদাবলী। মঙ্গলকাব্যকে বলা যায় মহাকাব্যের উত্তরসূরি আর উপন্যাসের পূর্বসূরি। কিন্তু বৈষ্ণব পদাবলীতে ঘটে লিরিক কবিতার উন্মেষ। মঙ্গলকাব্যই আবার আখ্যান-সাহিত্য বা কথাসাহিত্যের প্রয়োজন মিটিয়েছে। গল্প বলা ও ব্যক্তিমানুষের নিজস্ব আবেগ অনুভূতি প্রকাশের ব্যাপারটা মানুষের সহজাত। অনুবাদ সাহিত্যেও এই বৈশিষ্ট্য দেখা গেছে— মহাভারত ও রামায়ণে। পাঁচ শো বছর ধরে এসব রচিত হয়েছে। পয়ার ছন্দে লেখা হয়েছে চর্যাপদ থেকে পুরো মধ্যযুগের সাহিত্য। এই ছন্দটা ছিল মন্থর আর এরকম : ‘মহাভারতের কথা অমৃত সমান/কাশীরাম দাস কহে শোনে পুণ্যবান।’
এরপর বাংলা সাহিত্যের প্রবেশ ঘটে আধুনিক যুগে। বাঙালি বা ভারতীয় সমাজ এইসময়ে কৃষিভিত্তিক সামন্ত সমাজ থেকে বাণিজ্যপুঁজি বা মার্কেন্টাইল সমাজে রূপান্তরিত হচ্ছিল। পুঁজিবাদের পশ্চাৎভূমি হচ্ছে এই বাণিজ্যপুঁজি, যা পরে পুঁজিবাদী সমাজে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু ভারতে শিল্পের বিকাশ না হওয়ায় (কাঁচামাল যোগান দিয়েছে) পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটেনি। কিন্তু বৈশ্বিক পরিবর্তন ঘটে চলছিল।
পুঁজিবাদী সমাজের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এতে মানুষের মধ্যে শিল্পরুচি তৈরি হয়, ক্রমশ তা পরিশীলিত হয়। বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিও তৈরি হয়। ভারতেও উনিশ শতকের শেষ আর বিশ শতকের প্রথম দিকে জ্ঞানতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে বৈশ্বিক যোগাযোগ আর ব্রিটিশদের প্রয়োজনে প্রথমে বাংলা গদ্যের সূত্রপাত হয়, পরে গীতিকবিতা ও আখ্যানের সূচনা ঘটে। সেই সঙ্গে প্রহসনের ধারায় নাটকের আবির্ভাব ঘটে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগরের গদ্য পেরিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রে এসে পেয়েছি পাশ্চাত্যরীতির আখ্যান, অর্থাৎ উপন্যাস। অন্যদিকে মধুসূদনে গীতিকবিতার উন্মেষ এবং বিহারীলালে তা কিছুটা পরিণতি অর্জন করে। পরে রবীন্দ্রনাথে পেল চূড়ান্ত পরিশীলিত রূপ। পারিবারিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক ঘটনাকেন্দ্রিক আখ্যানের বিকাশ হলো প্রথম দিকে। রবীন্দ্রনাথে পেলাম বুদ্ধিপ্রধান উপন্যাস এবং সর্বপ্রথম ছোটগল্প। সমাজনির্ভর ও ঐতিহাসিক নাটকও রচিত হলো এইসময়ে। সংবাদপত্র ভূমিকা রাখে আখ্যান নির্মাণে। চিন্তামূলক ও যুক্তিবাদী প্রবন্ধ রচনার অনুশীলনও হয়েছিল সংবাদপত্রে। পরে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত প্রাবন্ধিকদের আবির্ভাব এবং তাদের হাতে এই ধারাটি বিকশিত হয়।
এরপর এলো বিশ শতক। এই সময়ে বাংলা সাহিত্যের রূপান্তর ঘটে ইউরোপবাহিত আধুনিকতায়। রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিকতা আর নজরুলের দ্রোহ ও প্রেমানুভব বাংলা কবিতায় নতুন বাঁক বদলের সূচনা ঘটায়। কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মহাদেশীয় সাহিত্যের প্রভাবে বাংলা সাহিত্যে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে যায়। তিরিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশের দশকে কবিতা ও কথাসাহিত্যে বিশ শতকীয় আধুনিকতার সূচনা ঘটে। আধুনিকতার দুই মুখ : নেতিবাচক ও ইতিবাচক, বলেছেন শঙ্খ ঘোষ। এই প্রবণতার প্রাধান্য ঘটে বাংলা কবিতায় ও কথাসাহিত্যে।
বাংলাদেশে চেপে বসে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন। ঘটে গেল ভাষা-আন্দোলন। বাঙালি সংস্কৃতি, ভাষা, দেশ, ও কালের বিমিশ্র প্রভাব পড়লো বাংলাদেশের সাহিত্যে। কিন্তু তা কলকাতার ওই তিরিশ-পঞ্চাশ-ষাটের পথেই ঘটলো। কিন্তু দেশচেতনা প্রধান প্রবণতা হয়ে উঠলো। উপনিবেশ-বিরোধিতা ও প্রতিরোধও দেখা গেল। রাজনীতির পথ ধরেই এটা ঘটলো।
এই পর্বে বাংলাদেশে বিজয়ের উল্লাস ও ব্যর্থতার মনোবেদনা, দুই-ই উপজীব্য হলো। জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি করা হলো বাঙালি ও বাংলাদেশির। রাজনীতি বাম-ঝোঁক থেকে ক্রমশ ডানপন্থী হয়ে উঠতে থাকলো। ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহারের ফলে, সাহিত্যেও তার প্রতিফলন বৃদ্ধি পেল। এর সবই ঘটেছে ডানপন্থা রাজনীতির প্রভাবে। সাহিত্যে খোলামেলাভাবে কথা বলার প্রবণতাটা প্রধান হয়ে উঠলো। স্বাধীনতার পর আটের দশক পর্যন্ত এটা চলতে থাকলো। কিন্তু এরপর আটের দশক থেকেই বাংলাদেশের সমাজে সমষ্টির পরিবর্তে যখন ব্যক্তির প্রাধান্য বৃদ্ধি পেল, তখনই সাহিত্য ব্যক্তিমুখীনতার দিকে ঝুঁকে পড়লো। কবিতা থেকে কথা বলার প্রবণতা ঝরে পড়লো, কথাসাহিত্য বাস্তব থেকে যাদুবাস্তববাদিতার অভিমুখী হলো। কবিতায় ঘটনা নয়, ঘটনার নির্যাস, ঘন সংহত আবেগ, অভিনব ভাবচ্ছবি, উপমা-উৎপ্রেক্ষা-চিত্রকল্পের পরীক্ষা নিরীক্ষা বাংলাদেশের কবিতাকে ষাট থেকে বিযুক্ত করে ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে এখন। কথাসাহিত্যে লাতিন আমেরিকান লেখকদের প্রভাব যাদুবাস্তবময় করে তুললো, সেই সঙ্গে বাস্তববাদীও। স্থূল দেশচেতনা সরে গিয়ে সাহিত্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়লো। তবে ব্যক্তিসর্বস্বতা নয়, ব্যক্তিকে কেন্দ্রে রেখে চারপাশের রাজনীতি, সমাজ ও সামাজিক রূপান্তরের ছবি আঁঁকছেন কবি ও কথাসাহিত্যিকেরা। বাংলাদেশের সাহিত্যের এখন এটাই প্রধান প্রবণতা। এই সাহিত্য তাই এখন গহনস্পর্শী, গভীর, নিরীক্ষামূলক।
সাহিত্যচর্চার মাধ্যমেও পরিবর্তন এসেছে সাময়িকপত্র-সংবাদপত্র-সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। এই সামাজিক মাধ্যমে যার যেমন খুশি লেখা প্রকাশ করছেন। এর দুটো দিক আছে : (এক) আত্মপ্রকাশ বা লেখা প্রকাশের জন্য তাকে ভাবতে হচ্ছে না। ভাবতে হচ্ছে না নান্দনিক সৌকর্য নিয়েও; (দুই) যিনি প্রকৃত লেখক তিনিও সংবাদপত্রে লেখালেখি করার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে যেমন খুশি লেখা প্রকাশ করছেন। উভয়েই পেয়ে গেছেন বৃহত্তর পরিচিত চেনা পাঠক। বিপদটা হলো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন কেউ নেই যিনি এই লেখালেখির ব্যাপারে নির্দেশনা দেবেন। ফলে, সেলফ্ সেন্সরড না হলে লেখা প্রকাশের নান্দনিক ব্যাপারটি উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে। কিন্তু ক’জন সেলফ্ সেন্সরড হতে জানেন বা পারেন? কে তাদের পরামর্শ দেবেন। ফলে, ভালো লেখার পরিবর্তে বাজে লেখাই প্রকাশিত হচ্ছে বেশি। এটাই ভয়ের ব্যাপার। এর ফলে আরেকটা ব্যাপার ঘটছে। চটুল কৌতুককর সস্তা হাতহালি বা জনপ্রিয় পাওয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে সাহিত্য পদবাচ্য নয় এমন লেখাই ফেসবুকে দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ গভীর লেখা পড়ার পাঠক তেমন দেখা যাচ্ছে না। সাহিত্যের রূপে বা আঙ্গিকেও পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। ছোট চটুল রচনা, যেমন কবিতা গল্প ইত্যাদি লেখা হচ্ছে বেশি। সাহিত্যচর্চার বিষয়টি যে নিষ্ঠার ব্যাপার সেটা আর থাকছে না। আগামী দিনের সাহিত্যের জন্য এটাই বিপদ সংকেত।
তবে আশার কথা, এই ফেসবুকেই নতুন ভালো লেখকের সন্ধান পাচ্ছি। আমি অনলাইনে ‘তীরন্দাজ’ নামে একটা সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা সম্পাদনা করি। এখানেই এই নতুন প্রতিশ্রুতিশীল প্রতিভাবান লেখকদের অনেকেরই আবির্ভাব লক্ষ করছি। তবে তার সংখ্যা বেশি নয়। অবশ্য কোনো কালেই ভালো লেখকের সংখ্যা বেশি ছিল! ৎ