সারা দেশ

সাফারি পার্কের নীলগাই যুগল, সম্ভবনার কি সংবাদ আনবে

  • রেজাউল করিম সোহাগ, শ্রীপুর
  • প্রকাশিত ১৭ অগাস্ট, ২০২১

সেই ১৯৪০ সালের পর এ দেশে নীলগাই দেখা যায়নি। এর পর বহু সময় অপেক্ষা করে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় নীলগাইকে। দেখতে গরু বা গাইয়ের মতো না হলেও শরীরের নীলচে রঙের জন্যই ঘোড়ার মতো দেখতে প্রাণিটিকে নীলগাই বলা হয়। এ দেশে এ প্রাণিটি বিলুপ্ত হওয়ার কথা না থাকলেও কি করে হলো সেটাই বিস্ময় প্রাণি গবেষকদের। তবে আট দশকের বেশি সময় পর বাংলাদেশে ফের নীলগাই চোখে পড়ে যা প্রকৃতি ও প্রাণি প্রেমিদের দারুন আন্দোলিত করেছে। দেশের উত্তরের জনপদ ঠাঁকুরগাওয়ে বহু বছর পর প্রথম দেখা মিলে বিলুপ্ত প্রাণি নীলগাই।

২০১৮ সালের শেষের দিকে রাণীশংকৈল উপজেলার কুলি নদীর ধারে নজরে পড়ে একটি নারী নীলগাই। এর পরে ২০১৯ সালের শুরু দিকে উত্তরের আরেক জনপদ নঁওগা থেকে একটি পুরুষ নীলগাই ধরা পড়ে। এগুলো মুলত পাশের দেশ ভারত থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে দলছুট হয়ে এ দেশে চলে আসে। এর পর বেশ কটি নীলগাই ধরা পড়লেও এখন এক জোড়া (নারী ও পুরুষ) নীলগাই গাজীপুরের শ্রীপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের অতিথি হিসাবে সংযুক্ত হয়ে আছে। পার্কের আফ্রিকান সাফারি বেষ্টনীতে অবাধ বিচরণে সময় পার করছে আমাদের দেশে বিলুপ্ত এক মাত্র নীলগাই দম্পত্তিটি। চাঁপাইনবাবগঞ্জে উদ্ধার হওয়া একটি নারী নীলগাই প্রথমে সাফারি পার্কে আনা হয়। পরে তার সঙ্গী করার জন্য দিনাজপুরের রামসাগর উদ্যানে থাকা অন্য একটি পুরুষ নীলগাই এনে তাদের জুটি করা হয়েছে। প্রথমে দুইজনের সম্পর্ক তিক্ত হলেও একই বেষ্টনীতে থাকতে থাকতে কিছু দিন পর দুটি নীলগাই জুটিবদ্ধ হয়। তাদের সম্পর্ক হয় মধুর। এরি মধ্যে এ জুটির মধ্যে পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সঙ্গমের চিত্রও চোখে পড়ে পার্কের কর্মকর্তাদের। যা আগামীতে বংশ বৃদ্ধির মাধ্যমে স্থায়ী ভাবে বিলুপ্ত হওয়া নীলগাই ফিরতে পারে প্রকৃতিতে। যা দেশের জন্য অত্যন্ত আনন্দের খবর হবে। যদি নীলগাই দম্পত্তির ঘর আলোকিত করে কোনো সন্তানের জন্ম হয় তাহলে তা হবে বিস্ময়কর। কেননা ক্যাপটিপে নীলগাইয়ের বাচ্চার জন্মের ঘটনা এটি এক বিরল ঘটনা হবে।

পার্ক কর্তৃপক্ষ জানান, সাফারি পার্কের আফ্রিকান সাফারি বেষ্টনীর একটি অংশে আলাদা নিরাপদ বেষ্টুনী তৈরি করে রাখা হয়েছে নীলগাই দুটিকে। প্রথমে উদ্ধার হওয়া নারীটিকে রাখা হয় সে বেষ্টনীতে। এর পর দিনাজপুর থেকে পুরুষ নীলগাইটিকে এনে একই বেষ্টনীতে রাখা হয়। প্রথমে তাদের মধ্যে বেশ তিক্ত সম্পর্ক চোখে পড়ে। কিন্তু কিছু দিন একই বেষ্টুনীতে থেকে সম্পর্কের উন্নতি হতে থাকে। একটা সময় তাদের মধ্যে নিবির পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। আরো কিছু দিন পরে তাদের মধ্যে সঙ্গম করার চিত্রও চোখে পড়ে বহুবার। আর তাতেই আগামীর এক বিস্ময়কর সুখবর অপেক্ষা করছে বলে পার্ক কর্তৃপক্ষ আশা ব্যক্ত করেন ।

গাজীপুর শেখ কামাল ওয়াইল্ড লাইফ সেন্টারের প্রাণি নিয়ে কাজ করা কর্মকর্তা সোহেল রানা সৈকত বলেন International Union for Conservation of Nature (IUCN) এর লাল বুক তালিকা (Red Data Book) অনুসারে নীলগাই ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়েই বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের কোনো প্রাকৃতিক বনে নীলগাই অবশিষ্ট নেই। ১৯৪০ সালে সর্বশেষ প্রাকৃতিক অবস্থা পঞ্চগড়ে নীল চোখে পড়ে।

নীলগাই এশিয়া মহাদেশে সর্ববৃহৎ হরিণ বিশেষ প্রাণি যার বৈজ্ঞানিক নাম Bosephalus Tragocamelus। আর ইংরেজি নাম হলো Blue bull.

ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা গুলোর মধ্যে দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, নওগাঁ ও জয়পুরহাটে নীলগাইয়ের অবাধ বিচরণ ছিল। বর্তমানে এশিয়ার ভারত, পাকিস্তান, নেপালে এখনও নীলগাই পাওয়া যায়।
এটি মূলত তৃণভোজী প্রাণী। যেসব এলাকায় খাবারের প্রাচুর্য রয়েছে এমন সব বনে বা জলাভূমিতে নীলগাই বেশি বসবাস করে। তিনি বলেন মূলত নীলগাইয়ের বসবাস উপযোগী আবাসস্থল ধ্বংস এবং শিকারের ফলে এদের সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে এবং একসময় বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

সাফারি পার্কের ওয়াইল্ড লাইফ সুপার ভাইজার সরোয়ার হোসেন খান বলেন, প্রকৃতিতে নীলগাই দশ থেকে এগার বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। এশিয়ার এন্টিলুপ প্রজাতির মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রাণি হলো নীলগাই। যা আমাদের দেশে বিলুপ্ত। এ প্রজাতির পুরুষদের শিং হয় ও কালচে রঙের হয়ে থাকে আর নারীদের শিং থাকে না আর গাঢ় বাদামি রঙের হয়ে থাকে। নীলগাই এক থেকে তিনটি পর্যন্ত বাচ্চা একত্রে জন্মের রেকর্ড রয়েছে। নয় মাস গর্ভকালিন সময় পরে বাচ্চার জন্ম হয়। নারী নীলগাই দুই বছরে আর পুরুষ পাঁচ বছরে প্রাপ্ত বয়স্ক হয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এম ফিরোজ জানান, সকল বন্য প্রানিকেই উপযুক্ত পরিবেশে রাখতে পারলে বংশবৃদ্ধি করবে। নীল গাইয়ের ক্ষেত্রেও একই সূত্র। তিনি বলেন উপযুক্ত পরিবেশ না থাকার কারনে নীলগাই আমাদের দেশ থেকে বিলুপ্তির একটি কারন। তিনি আরো জানান, সাফারি পার্কে থাকা নীলগাই পরিবারে শাবকের জন্ম হলে তা সুখবর তবে নীলগাই আর কখনোই প্রকৃতিতে অবাধে বিচরণ করতে পারবে না। নীলগাই মানুষের কাছে চলে আসলেই মারা পড়ার ঝুঁকি থাকবে। নীলগাইয়ের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় বনে আগের মত স্বাচ্ছন্দ্যে সারভাইব করতে পারবে না। তিনি আরো বলেন ক্যাপটিভেই নিরাপদে বেঁচে থাকতে পারবে বিলুপ্ত হওয়া নীলগাই। তাই ক্যাপটিভেই (আবদ্ধ) তাদের জন্য প্রাকৃতির পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. তবিবুর রহমান জানান, সাফারি পার্কে এক জোড়া নীলগাই বসবাস করছে আফ্রিকান বেষ্টনীর একটি অংশে। উপযুক্ত পরিবেশ করে দেওয়াতে তাদের চলাফেরাতে নান্দনিকতা এসেছে। তিনি বলেন, পার্কে আগেই উদ্ধার হওয়া একটি স্ত্রী নীলগাই ছিল। দিনাজপুরের রামসাগর জাতীয় উদ্যানের মিনি চিড়িয়াখানা থেকে পুুরুষ নীলগাইটি পার্কে আনা হয় তার সঙ্গী করতে । পরে তাদের একত্রে একটি বেষ্টনীতে রাখা হয়। প্রথমে সম্পর্ক তিক্ত হলেও কিছুদিন পর দারুন সম্পর্ক হয় তাদের মাঝে। আশা করি এ ভালো সম্পর্কের মাধ্যমে সুুখবর আসবে আমাদের জন্য তথা দেশের জন্যও ।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads