বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স সক্রিয় নয়। ২০১৩ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ অ্যাটর্নি জেনারেলকে আহ্বায়ক করে এটি গঠন করে। তারপর পাঁচ বছর চলে গেছে। এই সময়ে মাত্র তিনবার বৈঠক হয়েছে এই টাস্কফোর্সের। নিষ্ক্রিয়তার কারণে আগে একই ধরনের দুটি টাস্কফোর্স পুনর্গঠন করা হয়। একই পথে চলছে তৃতীয় দফায় গঠিত টাস্কফোর্স।
উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্সের বিদেশে পাচার হওয়া অর্থসম্পদ উদ্ধারে প্রয়োজনীয় সব ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা, তদারকি ও সমন্বয় করার কথা। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রথম এই টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। তবে এ যাবত বড় কোনো সাফল্য আসেনি এর মাধ্যমে। সরকারের ওই কমিটি কেবল কাগুজে কমিটি হয়ে পড়েছে।
সূত্র বলছে, চলতি সপ্তাহেই কমিটির আরেকটি বৈঠক হতে পারে। এজন্য আগামী বৃহস্পতিবার সময় নির্ধারিত হয়েছে। ওইদিন বেলা ১১টায় একটি সভা আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়েছে টাস্কফোর্সের সাচিবিক দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংক। যদিও বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট বর্তমানে আলাদা ও স্বতন্ত্রভাবে অর্থপাচার ঠেকাতে ও পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে মূল দায়িত্ব পালন করছে।
২০১৩ সালের ২৮ মে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এক প্রজ্ঞাপনে টাস্কফোর্সটি গঠন করে। অ্যাটর্নি জেনারেলকে করা হয় এর আহ্বায়ক। বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে গঠিত এ টাস্কফোর্সে রয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), অর্থ মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। দশ সদস্যের টাস্কফোর্সকে বাংলাদেশ ব্যাংক সাচিবিক সহায়তা দিচ্ছে।
২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৩০৯ কোটি ডলার বা ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। অবশ্য অর্থপাচারের এই তথ্য দেশের সরকারের কোনো সংস্থা কখনোই স্বীকার করেনি।
সম্প্রতি বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান জানান, চার হাজার কোটি টাকা পাচারের তথ্য তারা পেয়েছেন। এ নিয়ে তারা অনুসন্ধান করছেন। জিএফআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫৯০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে- যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। ২০১৪ সালে দেশ থেকে পাচার হয়েছিল ৮৯৭ কোটি ডলার। এই হিসাবে ২০১৪ সালের চেয়ে ২০১৫ সালে পাচারের পরিমাণ কমেছে।
সংস্থাটি বলছে, উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের প্রায় ২০ ভাগই পাচার হয়েছে নানা কৌশলে। আর পাচার করা টাকার বড় অংশই গেছে আমদানি-রফতানির সময়ে পণ্যের প্রকৃত দাম গোপন করার মাধ্যমে।
জানা যায়, বিগত সময়ে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ বা সম্পদ ফিরিয়ে আনতে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। তবে কোনো সংস্থাই তেমন সফল হয়নি।
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রথমবারের মতো বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এজন্য ২০০৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। সেই টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ।
পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার ২০১১ সালে সংশ্লিষ্ট টাস্কফোর্স পুনর্গঠন করে। ওই বছরের ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় দফায় পুনর্গঠিত টাস্কফোর্স গঠন করা হয় তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানের নেতৃত্বে। ৯ সদস্যের টাস্কফোর্সে সরকারের অন্য সংস্থার প্রতিনিধিরা ছিলেন।
ওই টাস্কফোর্সের দুটি কার্যপরিধি নির্ধারণ করা হয়। এর একটি হলো- বিদেশে পাচার করা সম্পদ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০০৯-এর বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে ফেরত আনার উদ্যোগ গ্রহণ। অন্যটি হলো- পাচার করা অর্থ বা সম্পদ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিদেশি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা ও তথ্য আহরণ। এর পাশাপাশি পাচার করা সম্পদ দেশে এনে অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে টাস্কফোর্সকে।
বাংলাদেশের ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, আমলাসহ বিভিন্ন শ্রেণির প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ রয়েছে। তবে বর্তমানে অর্থপাচার হয় হুন্ডির মাধ্যমে। আর সেটি হচ্ছে বাণিজ্যনির্ভর কর্মকাণ্ডে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, শক্ত ও সমসাময়িক পদক্ষেপ ছাড়া অভিনব এই অর্থপাচার কৌশল ঠেকানো যাবে না। অর্থপাচারের একটি উপায় হচ্ছে পণ্য আমদানির সময় কাগজপত্রে বেশি দাম উল্লেখ করে টাকা পাচার, আরেকটি হচ্ছে, পণ্য রফতানি করার সময় কাগজপত্রে দাম কম দেখানো।
রফতানির সময় কম দাম দেখানোর ফলে বিদেশি ক্রেতারা যে অর্থ পরিশোধ করছেন, তার একটি অংশ বিদেশেই থেকে যাচ্ছে। বাংলাদেশে আসছে শুধুমাত্র সেই পরিমাণ অর্থ, যে পরিমাণ অর্থের কথা দেখানো হচ্ছে। বাকিটা রফতানিকারকের বিদেশে কোনো ব্যাংক হিসাবে জমা হচ্ছে।
জিএফআইয়ের প্রতিবেদন অনুসারে, টাকার অঙ্কের দিক দিয়ে ২০১৫ সালে অর্থপাচারে শীর্ষ ৩০ দেশের একটি বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। টাকা পাচারের এ প্রবণতা টেকসই উন্নয়নের বড় বাধা। অর্থপাচার অব্যাহত থাকায় দেশে বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা বিরাজ করছে। ধারণা করা হচ্ছে, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে টাকা বের করে নিয়েও অসাধু একটি চক্র বিদেশে পাচার করছে।
জানতে চাইলে কমিটির এক সদস্য বলেন, কেন নিয়মিত বৈঠক ডাকা হয় না সেটা আমি জানি না। তবে এর দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে। তাছাড়া এ ব্যাপারে আহ্বায়ক উদ্যোগ নিতে পারেন।
জানা গেছে, চলতি সপ্তাহের বৈঠকে পাচার করা অর্থ ফেরতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম হাতে নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ বিভাগ, বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন ও নীতি বিভাগের প্রতিনিধিদের থাকতে বলা হয়েছে।





