সংক্রমণের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে দেশ

ছবি: বাংলাদেশের খবর

জাতীয়

সংক্রমণের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে দেশ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ৯ এপ্রিল, ২০২১

বিশ্বব্যাপী বছরেরও বেশি সময় ধরে ছড়িয়ে পড়া করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হেনেছে বাংলাদেশে। সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার প্রতিদিনই পূর্ববর্তী দিনকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকে পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে আরো ৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট মৃত্যু হয়েছে ৯ হাজার ৫২১ জনের। নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৮৫৪ জন। সব মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬৬ হাজার ১৩২ জনে।

গত বছর করোনা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার পর বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন এই ভাইরাসে বয়স্কদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। তাই তারা বয়স্কদের অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে চলার পরামর্শ দেন। কিন্তু বছর ঘুরতেই করোনা এখন সব বয়সি মানুষকে আক্রান্ত করছে। এটা বিশেষজ্ঞদের জন্য নতুন চিস্তর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) দেশটির নাগরিকদের কোনো দেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সংক্রমণ বিবেচনায় চারটি স্তর নির্ধারণ করেছে। এই স্তরের চতুর্থ স্থানটি হচ্ছে সংক্রমণ খুবই উচ্চতর, যে স্তরে আছে বাংলাদেশও। দুই লাখের বেশি জনসংখ্যা রয়েছে এমন অঞ্চল বা দেশে ২৮ দিনের মোট আক্রান্তের হার যদি প্রতি লাখে ১০০ জনের বেশি হয়, তবে সেটি চতুর্থ স্তরে পড়ে। এই পরিপ্রেক্ষিতে গত ২ এপ্রিল বাংলাদেশ ভ্রমণে সতর্কতা জারি করে সিডিসি। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন গত কয়েকদিনে ধরে যে হারে রোগী শনাক্ত হচ্ছে তাতে গতবারের পিকের (জুন-জুলাই) চেয়েও পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। করোনার লাগাম টানতে গত সোমবার থেকে  দেওয়া লকডাউনেও গণপরিবহন, অফিস ও দোকান খোলা দেখা গেছে। লকডাউনের আগের দুদিনে ঢাকা ছেড়েছে লাখ লাখ মানুষ। ২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়েছে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষাও। এভাবে জনসমগমের ফল দেখা যাবে দুই-তিন সপ্তাহ পর। তখন সংক্রমণের পাশাপাশি বাড়বে মৃত্যুও।

সিডিসি তাদের ওয়েবসাইটে দেওয়া সতর্কবার্তায় বলেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে যে পরিস্থিতি তাতে টিকা নেওয়া কোনো ব্যক্তি যদি সেখানে ভ্রমণ করে তাহলে তিনি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবেন। যদি বাংলাদেশে ভ্রমণ করতেই হয়, ভ্রমণের আগে টিকার সব ডোজ নিতে হবে। অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে এবং অন্যদের কাছ থেকে অন্তত ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।

গত ৬ এপ্রিল মহাখালীর ঢাকা নর্থ সিটি করপোরেশন মার্কেট হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, করোনা মোকাবিলায় সরকারি নির্দেশনা না মানলে সংক্রমণ ও মৃত্যু নিয়ন্ত্রণহীন হতে পারে। হাসপাতালগুলোতে বেড সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। তবে বেড সংখ্যা যতোই বাড়ানো হোক না কেন, মানুষ স্বাস্থ্যবিধি না মানলে কিছুতেই করোনা নিয়ন্ত্রণে আসবে না।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. নুসরাত সুলতানা বলেন, ৬ এপ্রিল এবং ৭ এপ্রিল তাদের ল্যাবে করোনার নমুনা শনাক্তের হার ছিল ২৭ এবং ২৬ শতাংশ। মার্চের শেষ দিকে একদিনে শনাক্তের সর্বোচ্চ হার ছিল ৩৯ শতাংশ। মার্চের শেষ এবং এপ্রিলের শুরু থেকে কয়েকদিন ধরে দিনে শনাক্তের হার ৩১ থেকে ৩২ শতাংশ। ২ এপ্রিল মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা হলো। সেটার ফল আমরা এখনো দেখতে পাইনি। কয়েকদিনের মধ্যেই পাবো। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর সংক্রমণের নতুন মাত্রা দেখা যাবে। এই দুই সপ্তাহ বেশ সংকটময়।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ল্যাবে করোনার মোট নমুনা পরীক্ষা হয়েছে এক হাজার ১২১টি। পজিটিভ শনাক্ত হয়েছেন ৫৬০ জন। সংক্রমণের হার প্রায় ৫০ ভাগ। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, ২ এপ্রিল মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার দায়িত্বে ছিলেন করোনা ইউনিটেরই দায়িত্বরত চিকিৎসক, ল্যাবে দায়িত্বরত এবং টেকনোলজিস্টরা। আমরা যারা পরীক্ষা নিয়েছি, তারা এমনিতেই বেশি এক্সপোজারের শিকার হয়েছি। কারণ আমরা ভাইরাসের সবচেয়ে কাছাকাছি ছিলাম। পরীক্ষার্থীদের থেকে আমরা সংক্রমিত হবো কি না, তার চেয়ে বেশি চিন্তা আমাদের কাছ থেকে ওরা সংক্রমিত হলো কি না তা নিয়ে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও মহামারী বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, করোনার লক্ষণ দেখা দিতেও ১৪-২১ দিন লাগে। এখন যাদের মৃত্যু হচ্ছে তাদের বেশিরভাগই সংক্রমিত হয়েছিলেন তিন সপ্তাহ আগে। লকডাউনকে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা, যদিও এতে প্রান্তিক মানুষের খুব সমস্যা হচ্ছে। তাই সবদিক সমন্বয় করে ব্যবস্থা নিতে হবে। রোগীদের কন্টাক্ট ট্রেসিং করে তাদের আইসোলেশনে নিতে হবে। তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইন করতে হবে। চলমান টিকাদান কর্মসূচিতেও আরো জোর দিতে হবে।

এদিকে দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে আরো ৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট মৃত্যু হয়েছে ৯ হাজার ৫২১ জনের। নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৮৫৪ জন। সব মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬৬ হাজার ১৩২ জনে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

এতে বলা হয়, ঢাকা সিটিসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও বাড়িতে উপসর্গবিহীন রোগীসহ গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন ৩ হাজার ৩৯১ জন। এ পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়েছেন ৫ লাখ ৬৫ হাজার ৩০ জন। সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ২৪৩টি ল্যাবে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে আরটি-পিসিআর ল্যাব ১২১টি, জিন এক্সপার্ট ৩৪টি, র‍্যাপিড অ্যান্টিজেন ৮৮টি। এসব ল্যাবে গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ৩৩ হাজার ৩২৮টি। নমুনা প৪রীক্ষা করা হয়েছে ৩৩ হাজার ১৯৩টি। এ পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৪৯ লাখ ১৫ হাজার ৭৫৮টি।

গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষায় শনাক্তের হার ২০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এ পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৮৪ দশমিক ৮২ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। নতুন মারা যাওয়াদের মধ্যে ৪৮ জন পুরুষ ও ২৬ জন নারী। এদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৪৩ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৫ জন, খুলনা বিভাগে সাতজন, বরিশাল বিভাগে চারজন, রাজশাহী বিভাগে তিনজন ও সিলেট বিভাগে দুজন রয়েছেন।  হাসপাতালে মারা গেছেন ৭০ জন ও বাড়িতে চারজন।

মৃতদের বয়স বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৬০ বছরে ঊর্ধ্বে ৪৬ জন, ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে ১৬ জন, ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ছয়জন, ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে পাঁচজন, ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে একজন রয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় আইসোলেশনে এসেছেন ৮১৪ জন ও আইসোলেশন থেকে ছাড় পেয়েছেন ২৫১ জন। এ পর্যন্ত আইসোলেশ৬নে এসেছেন ১ লাখ ৯ হাজার ২০১ জন। আইসোলেশন থেকে ছাড়পত্র নিয়েছেন ৯৪ হাজার ৭৩৫ জন। বর্তমানে আইসোলেশনে আছেন ১৪ হাজার ৪৬৬ জন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads