ফিচার

শ্রমে ক্লিষ্ট শিশুর ভবিষ্যৎ

  • মো. শামীম মিয়া
  • প্রকাশিত ২৩ এপ্রিল, ২০১৯

একজন মানুষকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত ও মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়তে সবচেয়ে সহজ ও মধুময় সময় শিশুকাল বা শৈশবকাল। আর বাবা-মা আকাশছোঁয়া স্বপ্ন দেখে শিশুটিকে নিয়ে শিশুকালেই। সন্তানের হাসির কাছে সবকিছু ম্লান হয়ে যায়। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত সমাজের যে কোনো পরিবার নিজের সাধ্যমতো চেষ্টা করে সন্তানকে আগলে রাখতে। এটাই বাবা-মায়ের ভালোবাসা। এমনটাই প্রত্যেক শিশুর মৌলিক অধিকার। কিন্তু এসব শিশুর একটি বিশাল অংশ যদি হয় দিগম্বর, অপুষ্টিতে কাতর, ফুটপাতে যার ঠিকানা এবং কচি দুটি  হাত কাজে মগ্ন- তাকে নিয়ে কি স্বপ্ন দেখা যায়? কারণ এরা পিতৃমাতৃহীন শিশুশ্রমিক বা পথশিশু। এসব শিশুশ্রমিক বা পথশিশু এতটাই হতভাগা যে, তাদের আদর-স্নেহ, ভালোবাসা দিয়ে মুড়িয়ে রাখার মতো কেউ নেই তাদের পাশে। বাংলাদেশে কতজন শিশুশ্রমিক আছে, তার সঠিক হিসাব আমাদের জানা নেই। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে তারা কত কাজই না করছে। কেউ ঘরের ভেতরে, কেউ রাতের আঁধারে, কেউ রোদ-বৃষ্টি মাথার নিয়ে, কেউ অহরহ নির্যাতন সহ্য করে জীবনপাত করছে। সবচেয়ে দুঃখের বিষয়, একদিকে যেমন এদের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে যতই পরিশ্রম করুক না কেন, তাদের জীবনমান উন্নয়ন হচ্ছে না। এটা দেশ ও জাতির জন্য সত্যি লজ্জাজনক ও কষ্টদায়ক ।

দেশে সরকার আসে, সরকার যায়, শিশুশ্রমিক ও পথশিশু তথা তাদের দুঃখ-কষ্টের আর শেষ হয় না। গ্রামের চেয়ে শহরের শিশুশ্রমিকদের অবস্থা আরো ভয়াবহ। কেননা যেসব শিশুশ্রমিক শহরে কাজ করে, তারা অনেক বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত। যেসব কাজ শিশুদের জন্য বিপজ্জনক ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হয়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- খনি বা মাটির নিচে কাজ, দ্রুত ঘূর্ণায়মান, যন্ত্রপাতি নির্মাণ, শিল্পক্ষেত্রে গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবহার, প্রচণ্ড আলোয় কাজ করা, ট্যানারি, ইটভাটা, বেডিং ও গার্মেন্ট শিল্প, সুইপার, স’মিল, ফোমের কারখানা, প্লাস্টিক ও রাবার কারখানা, স্টেইনলেস স্টিল মিল, লবণ কারখানা, বিড়ি কারখানা, প্রচণ্ড শব্দের মধ্যে কাজ করা বা আলোয় কাজ করা, গ্লাস ফ্যাক্টরি, প্রিন্টিং প্রেস, অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ, পরিবহন, বিনোদন, দুর সমুদ্রে মাছ ধরা, অ্যালকোহল কারখানায় কাজ করা, পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ বাতাসহীন বদ্ধ ঘরে কাজ করা ইত্যাদি। এসব কাজ করতে গিয়ে শিশুশ্রমিকরা পড়ালেখার বা বিনোদনের সুযোগ পাচ্ছে না; বরং রোগক্লিষ্ট, দুর্বল এক নাগরিক দেশের জন্য ভবিষ্যতের বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এসব কাজের মাধ্যমে শিশুশ্রমিকদের মধ্যে নানান ধরনের রোগের জন্ম দিচ্ছে। দুর্ঘটনায় অঙ্গহানি বা স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করছে। ফলে সামাজিক, মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এরা অভাবের তাড়নায় জড়িয়ে পড়ছে অপরাধ জগতে, মাদকের জগতে, এমনকি রাজনৈতিক সহিংসতায় এরাই প্রধান সেনা। গাড়িতে আগুন দেওয়া, বোমা মারা, যানবাহন ভাঙচুর করা ইত্যাদি কাজ রাজনৈতিক নেতারা পথশিশুদের দিয়েই সংঘটিত করে থাকেন।

কোনো শিশু পৃথিবীতে অপরাধী হয়ে আসে না। সমাজ তাদের অপরাধী বানায়। এটাও ঠিক, যে দেশে পরিত্যক্ত ডাস্টবিন থেকে শিশুরা খাবার তুলে নেয় বা সেখানে উপার্জনের উৎস খোঁজে, সেদেশে শিশুশ্রম রোধ করা খুব সহজ নয়। তাই শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশে জাতীয় সমৃদ্ধি নির্ভরশীল শিক্ষার ব্যপারে শুধু সরকারি কার্যক্রম নয়, আমাদের প্রত্যেককেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে।

 

লেখক : সাহিত্য সম্পাদক, মাসিক কিশলয় সাহিত্য পত্রিকা

সাঘাটা, গাইবান্ধা

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads