জাতীয়

শৃঙ্খলার অভাবে সড়কে যানজট

  • ''
  • প্রকাশিত ২০ মার্চ, ২০২৪

কবির হোসেন:

রাজধানীর সড়কগুলোর সঙ্গে যানজট আপসহীন এক শব্দ। যানজটে মোড়ানো শহরটাকে শান্তিময় করতে ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, সড়কের লেন বৃদ্ধিসহ নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে সরকার। তবে ফলাফল যেন সেই যানজটেই আটকে আছে। এখনও রাজধানীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাওয়ার চিন্তা করলে সারাদিন হাতে নিয়ে ঘর থেকে বের হতে হয়।

সড়কে যানজটের দৃশ্যমান বিষয় স্বীকার করে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সড়ক-যানবাহনে শৃঙ্খলা ফেরানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন। তবে আমি মনে করি কোনো চ্যালেঞ্জই অনতিক্রম্য নয়। সব চ্যালেঞ্জ আমরা অতিক্রম করতে পারি।

মন্ত্রী বলেন, আমাদের অনেক কাজ আছে, চ্যালেঞ্জ অনেক আছে। আমি এখনো বলি, সড়কে শৃঙ্খলা, যানবাহনে শৃঙ্খলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এখনো তা পুরোপুরিভাবে অর্জন করতে পারিনি।

সড়কের বাস্তব চিত্র দেখলে বোঝার কমতি থাকে না যে, জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের দেয়া ১১১ সুপারিশ কাগজে-কলমেই আটকে আছে। বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগই দৃশ্যমান নয়।সড়ক-মহাসড়কের কোথাও এই সুপারিশগুলোর একটিও কার্যকর হয়নি। একইভাবে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এর বিধি প্রণীত হওয়ার পরও সড়কে এই আইনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নেই।

জানা গেছে, বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে সরকার। গত বুধবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রস্তাবিত সংশোধনীতে আইনের ১০টি ধারায় দণ্ড কমানো ও দুটি অজামিনযোগ্য ধারাকে জামিনযোগ্য করা হয়েছে।

রাজধানী ঢাকা শহরের যানবাহন চলাচলে কোনো স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থাপনা নেই। দেড় কোটিরও বেশি মানুষের এ শহরে যানজটের বিশৃঙ্খল পরিবেশ রয়ে গেছে। কিছু ক্ষেত্রে এটি আরও খারাপ হয়েছে। জানা গেছে ভুল পথে ঢাকার ইন্টারসেকশনের ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থাপনার কাজ করায় গত দুই দশকে সরকারের অপচয় হয়েছে ৩০২ কোটি টাকা। তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়নে ১৮২ কোটি টাকা এবং এক দশকে ট্রাফিক সিগন্যালের বিদ্যুৎ বিল বাবদ খরচ হয়েছে ১২০ কোটি টাকা। ট্রাফিক সিগন্যাল প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরিচালন খাতে বিপুল অর্থ খরচের পরও কোনো সুফল মেলেনি।

জানা গেছে রাজধনীতে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হচ্ছেÑ ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, অদক্ষ, অসচেতন ও অসুস্থ চালক, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, চালক ও পথচারীদের ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা, প্রচলিত আইন প্রয়োগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর শিথিলতা প্রদর্শন, প্রচলিত আইন ও বিধি লঙ্ঘন করে ওভারটেকিং করা, বিভিন্ন স্থানে সড়কের বেহাল দশা, জাতীয় মহাসড়ক ও আন্তঃজেলা সড়কে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক থাকা।

এছাড়া মহাসড়কে বাণিজ্যিকভাবে বিপুলসংখ্যক মোটরসাইকেল চলাচল, মহাসড়কে স্বল্পগতির তিন চাকার যানবাহন চলাচল, তরুণ ও অপ্রাপ্ত বয়স্কদের মোটরসাইকেল চালানো, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি ও সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দুর্নীতি ও উদাসীনতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং হাইওয়ে পুলিশের জনবল ও অন্যান্য সুবিধার ঘাটতি, সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ধারণা না থাকায় অনেক সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়।

সড়কে এসব অনিয়ম বন্ধ করতে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল ১১১টি সুপারিশ দেয়। এরপর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ আইন পাস হয়। পরবর্তী সময় দেরিতে হলেও আইনের বিধি প্রণীত হয়। কিন্তু বাস্তব অবস্থা হচ্ছে, সড়কে আইন প্রয়োগে সংশ্লিষ্টদের কোনো তৎপরতা নেই। ১১১ সুপারিশ বাস্তবায়নে নেই কোনো কার্যকর উদ্যোগ।

বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য মতে, চালকদের বেপরোয়া আচরণ ও অনিয়ন্ত্রিত গতির কারণে ৬২ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়ক আইনে বেপরোয়া গতির জন্য যে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, তা পুরোপুরি উপেক্ষিত। সড়ক আইন অনুযায়ী, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়ায় সড়কে শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। সড়ক-মহাসড়কে নৈরাজ্য থামছে না। আইন প্রয়োগ না থাকায় বাস চালকদের আচরণের কোনো পরিবর্তন আসছে না।

সড়ক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. শামছুল হক বলেন, এক সময় ঢাকার রাস্তায় ২৫ কিলোমিটার গতিতে যানবাহন চলাচল করত। তখনো দুর্ঘটনা এখনকার তুলনায় কম হতো। এর কারণ হচ্ছে, তখন সড়কে যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা ছিল। এখন যানবাহন বেড়ে যাওয়ায় গতি কমলেও দুর্ঘটনা ঘটেই চলছে এবং আগের চেয়ে বেড়েছে। দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে সড়কে বিশৃঙ্খলা ও চালকদের বেপরোয়া আচরণ। ঢাকায় সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে সব রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাস রুট তৈরি করতে হবে। এই পদ্ধতিতে বাস চালানো হলে চালকদের মধ্যে গতির প্রতিযোগিতা কিছুটা হলেও কমবে। সড়কে পুলিশ ও বিআরটিএ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে শৃঙ্খলা ফিরবে। মামলার ভয় দেখিয়ে সামান্য কিছু ঘুষ নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হলে চালকরা আইন অমান্য করতেই থাকবে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে সরকারকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে না। পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বড় বড় পদে রয়েছে। তারা এমপি হয়ে জাতীয় সংসদে বসছে। তারা ভেতর ও বাহির থেকে ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় হস্তক্ষেপ করছে। এ কারণে সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের দেয়া ১১১ সুপারিশ, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ পাস হওয়ার পরও বাস্তবায়ন হচ্ছে না, সড়কেও শৃঙ্খলা ফিরছে না। দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে সড়ক আইন শতভাগ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। পরিবহন খাতের নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনা দূর করতে ‘টেকসই পরিবহন কৌশল’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়ক ব্যবস্থাপনায় সরকারের পরিকল্পনায় গলদ রয়েছে। দক্ষ চালক তৈরি, ডিজিটাল পদ্ধতিতে যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা, ধীরগতির যান ও দ্রুতগতির যানের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করা হলে সড়কে কিছুটা হলেও শৃঙ্খলা ফিরবে। দুর্ঘটনা প্রতিরোধ সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads