শীত আসতে এখনো দুই মাস বাকি। কিন্তু এখন থেকেই বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন আসন্ন শীতে করোনার প্রকোপ বাড়তে পারে বংলাদেশে। গত ৮ মার্চ দেশে করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষ মারা গেছে। আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে তিন লাখেরও বেশি। যদিও আমাদের দেশে মৃত্যু বা আক্রান্তের হার এখনো ভয়ংকর পর্যায়ে যায়নি, তারপরও বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা শীতে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়বে। এটাকে কেউ কেউ করোনার দ্বিতীয় ঢেউ হিসেবে বর্ণনা করতে চাইছে।
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ বলতে যা বোঝায় আমাদের দেশে সে ধরনের পরিস্থিতি আদৌ সৃষ্টি হয়নি। কারণ মহামারীর প্রথম ধাক্কায় ব্রিটেনে ৪০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গত জুলাই থেকে সংক্রমণ ও মৃত্যু কমে আসছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বর থেকে ফের তা বাড়তে শুরু করেছে। ব্রিটেনের মতো শীতপ্রধান অনেক দেশেই ঋতু পরিবর্তনের পর দ্বিতীয় ধাপের সংক্রমণ শুরু হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। ব্রিটেনের অ্যাকাডেমি অব মেডিকেল সায়েন্সেস এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছিল, শীতের সময় দেশটির পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ হলে সেপ্টেম্বর থেকে আগামী জুন পর্যন্ত সময়ে করোনায় দেশটিতে ১ লাখ ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
বাংলাদেশ সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এস এম আলমগীর বলেন, শীত প্রধান দেশগুলোতে শীতের দিনে ঝুঁকি বাড়লেও উষ্ণমণ্ডলের দেশ বাংলাদেশে তেমন নাও হতে পারে। শীত আসবে বলে রিল্যাক্স হয়ে যাওয়া বা অনেক ভয় পেয়ে যাওয়ার কিছু নেই। আমাদের সাবধানে থাকতে হবে। শীত কিংবা গ্রীষ্ম, ঝুঁকি যেমনই হোক, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিকল্প নেই। তাপমাত্রা যত কমবে, এসব ভাইরাসের স্থায়িত্বকাল তত বাড়ে, সেটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত সেপ্টেম্বরেই জানিয়েছিল, শীতের আগেই উত্তর গোলার্ধের বিভিন্ন অঞ্চলে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে সংক্রমণ। শীতকালে মহামারী আরো মারাত্মক রূপ নিতে পারে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি। বাংলাদেশেও যে শীত মৌসুমে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে বিশেষজ্ঞদের এমন সতর্কবার্তা আমলে নিয়ে তা মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। সরকারপ্রধানের নির্দেশনার পর রোডম্যাপ ধরে পরিস্থিতি মোকাবিলার কথা বলেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। শীতে যদি করোনা অনেক বেশি ভয়ংকর নাও হয়ে ওঠে, তারপরও মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতির কারণে ঝুঁকি বাড়ার বেশ কয়েকটি কারণের কথা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন। তাদের মতে, ঋতু পরিবর্তনের সময় পরিস্থিতি কতটা নাজুক হবে তা নির্ভর করছে মৌসুমি রোগ, মানুষের আচরণ এবং সরকারের ব্যবস্থাপনার ওপর। যেহেতু ভ্যাকসিন বা কার্যকর কোনো ওষুধ এখনো তৈরি হয়নি, গ্রীষ্মের মতো শীতেও করোনা থেকে বাঁচার উপায় ওই একটাই, কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা।
তবে এক বছরের চক্র শেষ না হলে বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের গতিপ্রকৃতির ওপর শীত-গ্রীষ্মের প্রভাব নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাবে না- এমনটাই মত আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার। এখন ইউরোপ বা আমেরিকা থেকে হাইপোথিসিস দেয় যে, শীত আসলে করোনা বেড়ে যাবে। বাংলাদেশে কিন্তু সিজনগুলো ভিন্ন। ওখানে তাপমাত্রা ৪ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেল সেটাকে শীত ধরা হয়। বাংলাদেশে খুব শীতেও তাপমাত্রা থাকে ১৪ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
পাশের দেশ ভারতের বেশিরভাগ অঞ্চলের আবহাওয়া বাংলাদেশের মতোই। শীত আসলে করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে ভারতীয় গবেষকদের মধ্যেও। আইআইটি-ভুবেনেশ্বর এবং এইমসের গবেষকরা গত জুলাইয়ে তাপমাত্রা বিবেচনায় নিয়ে এক গবেষণায় জানিয়েছিলেন, বর্ষা এবং শীত মৌসুমে ভারতে করোনার প্রকোপ বাড়তে পারে। সংক্রমণের বিচারে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভারতে ইতোমধ্যে শনাক্তের সংখ্যা ৬৭ লাখ পেরিয়ে গেছে। মৃত্যু হয়েছে এক লাখের বেশি মানুষের। আর বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ৩ লাখ ৭৩ হাজার মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ার কথা জানানো হয়েছে সরকারিভাবে। মৃতের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ হাজার।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, শীতের সময় মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতিতে যে পরিবর্তন আসে, সে কারণেও করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। শীতে যেহেতু দরজা-জানালা বন্ধ থাকে। আর বদ্ধ ঘরে করোনাভাইরাস আসলে বাড়ে। সেজন্য বলা হয়, আলো-বাতাস ঠিকমতো চললে করোনার সংক্রমণের ঝুঁকি কম। এ কারণে একটা ভয় থেকেই যায়। চীনে এই সংক্রমণ শুরু হয়েছিল গত শীতে। শীতপ্রধান দেশে এর ভয়াবহতা বেশি দেখা গেছে। অনেক শীতপ্রধান দেশে তা আবারো বাড়ছে। সব মিলিয়ে আসছে শীতে এটা বাড়তে পারে।
ভাইরাস থেকে দূরে থাকতে মহামারীর শুরু থেকেই নিয়মিত হাত ধোয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। শীতের সময় ঠান্ডার কারণে যদি মানুষ হাত ধোয়ায় অবহেলা করে, অথবা শারীরিক দূরত্বের নিয়ম মেনে না চলে তাতেও বিপদ বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন। শীতের সময় গ্রামে পালা-পার্বণ, সামাজিকতা বেশি হয়। ফলে মানুষ কাছাকাছি আসে। মানুষে মানুষে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি।
বাংলাদেশে শীত থাকে তুলনামূলক কম সময়। কিন্তু তার মধ্যেই মানুষকে ভুগিয়ে যায় নানা রকম রোগ। জ্বর, সর্দি-কাশি, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, কোল্ড ডায়রিয়া, আমাশয়, চোখের প্রদাহ ও চর্মরোগ শীতের দিনের সাধারণ ব্যাধি। গত শীত মৌসুমে ১ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে বিভিন্ন শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৫ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি মানুষ, যাদের মধ্যে মৃত্যু হয় ৬১ জনের। এর মধ্যে বেশ কিছু রোগের উপসর্গ করোনার উপসর্গের সঙ্গে মিলে যায়। আর করোনা ও ঠান্ডাজনিত রোগ একসঙ্গে বাড়লে তা ভয়ের কারণ হবে বলে মনে করছেন অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ। এমনিতেই শীতকালে সর্দি, কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ফ্লু, নিউমোনিয়ার মতো রোগগুলো বাড়ে। এর মধ্যে করোনা সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। মানুষের মধ্যে একটা ভয় তো কাজ করছেই।
দেশে মহামারী শুরুর পর লকডাউনসহ যেসব কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল, তার বেশিরভাগই তুলে নেওয়া হয়েছে। সরকারিভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সে বিষয়ে খুব একটা গা করছে না সাধারণ মানুষ। বাধ্যতামূলক হলেও মাস্ক পরছেন না সবাই। রাস্তায়, যানবাহনে, হাট-বাজারে জনসমাগম হচ্ছে আগের মতোই। স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে শৈথিল্য শীতে করোনার ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে।
শীতে ঝুঁকি মোকাবিলায় যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়েও সন্তুষ্ট নন করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। বলেন, মানুষকে সচেতন করা হয়নি, যারা মাস্ক পরে না তাদের বাধ্য করতে হবে। দেশে কয়েক হাজার আইন আছে, কিন্তু কার্যকর হয় না। মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করতে না পারলে শীতে ঝুঁকি বাড়বে মন্তব্য করে এই ভাইরোলজিস্ট বলেন, মানুষের অসচেতনতার কারণেই শীতে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শীতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে সরকারকে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতে কাজ করতে হবে।
এদিকে শীতে করোনা সংক্রমণ বাড়লে তা মোকাবিলায় প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মুহিবুর রহমান। বলেন, কয়েকটি কোভিড হাসপাতাল বন্ধ করলেও ঝুঁকি বিবেচনায় অন্য হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলো খালিই রয়েছে। যেহেতু শীতে সংক্রমণ বাড়ার একটা আশঙ্কা রয়েছে, সে কারণে এ মুহূর্তে সব বন্ধ করছি না। যদিও বন্ধ করার পরিস্থিতি হয়েছে। বসুন্ধরা ও মিরপুরের লালকুঠি হাসপাতাল আমরা বন্ধ করে দিয়েছি। তবে বাকিগুলো আছে। শীত দেখে হয়তো আমরা বন্ধ করব।
শীতে সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারের পরিকল্পনা জানতে চাইলে স্বাস্থ্য সচিব আবদুল মান্নান বলেন, সেকেন্ড ওয়েভের চেয়ে আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো শীতকালটা। নভেম্বর মাসের পর থেকেই তো শীত চলে আসে। ধরে নিচ্ছি এটা বাড়বে, তাই প্রস্তুতিটা আমরা সিরিয়াসলি নিচ্ছি। ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট যদি আমরা প্রতিকার করতে পারি, তাহলে কোভিড মোকাবিলা করা কিছুটা হলেও সহজ হবে। এজন্য সরকার রোডম্যাপ ধরে এগোচ্ছে। শীতে ঠান্ডাজনিত রোগের ওষুধ ও ভ্যাকসিনের শতভাগ প্রস্তুতি আছে। তবে শেষ পর্যন্ত মানুষের সচেতনতার ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন আবদুল মান্নান। টেস্টে আগ্রহ দেখাচ্ছে না জনসাধারণ। তবে আমরা চাইছি, এখন যে সংক্রমণ বা মৃত্যু হার, তা ধরে রাখতে। এটা যাতে না বাড়ে সে প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে।





