ভাস্কর শিল্পী আইভি জামান
হামিদুজ্জামানের উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্কুলস্মৃতি, প্রখ্যাত সাহিত্যিক নীরদচন্দ্র চৌধুরীর বাড়ির বর্ণনা ও চিত্রশিল্পী হেমেন্দ্র নাথ মজুমদার সম্বন্ধে জানতে পারা। ছবিতে হেমেন্দ্র নাথ মজুমদারের স্টুডিও বাড়ি, সাহিত্যিক নীরদচন্দ্র চৌধুরীর প্রতিকৃতি, গচিহাটা রেলওয়ে স্টেশন, বিলের দৃশ্য। সহশ্রাম প্রি প্রাইমারি স্কুল থেকে হামিদুজ্জামান পঞ্চম শ্রেণি পাশ করায় উনিশ-শ পঞ্চান্ন সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়। সহশ্রাম গ্রাম থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে নতুন স্কুল। খোলা আকাশের নিচে উন্মুক্ত মাঠ নিয়ে সাজানো স্কুল। স্কুলে বড়সড় অডিটোরিয়াম পাকা টিনের ঘর ও লম্বা বারান্দা। একুশ বিঘা জমি নিয়ে স্কুল নাম বনগ্রাম আনন্দকিশোর উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়। বনগ্রামে জমিদার আনন্দকিশোর রায় চৌধুরী একত্রিশ ডিসেম্বর, উনিশ-শ বারো ‘বনগ্রাম আনন্দকিশোর উচ্চ বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম উদ্যোক্তা ছিলেন বনগ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তি তারক নারায়ণ চৌধুরী ও রাম দেব। পরে অর্থায়ন করেন আনন্দকিশোর রায় চৌধুরীর। প্রখ্যাত লেখক নীরদচন্দ্র চৌধুরীর আত্মীয়। নীরদচন্দ্র চৌধুরীর কটিয়াদি উপজেলার বনগ্রামে পূর্বপুরুষের ভিটা। আঠারো-শ সাতানব্বই সালের তেইশে নভেম্বরে কিশোরগঞ্জ জেলার সদরে জন্ম। জমিদার, বুনিয়াদি পরিবারের ও উচ্চবংশের ছিলেন। বনগ্রামে তাদের পূর্বপুরুষের আদি নিবাস। কিশোরগঞ্জ থেকে বহুবার কিশোর বয়সে উৎসবাদি ও পূজা উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নিয়মিত আসতেন। কিশোরগঞ্জ থেকে কোনো পাকা রাস্তা ছিল না। জমির ও ক্ষেতে আল দিয়ে অথবা বর্ষায় নৌকাযোগে আসতে হতো। হামিদুজ্জামান খালি পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতেন। স্কুলে কোনো নির্দিষ্ট পোশাক ছিল না। সাদা পায়জামা ও বেপারি শার্ট ও ইচ্ছামতো কাপড় পরিধান করতে পারত। কাঁচা রাস্তা, গরু মহিষের গাড়ি প্যাঁ...পোঁ শব্দ কানে বাজত। বেশি বর্ষা হলে রাস্তা পানিতে ডুবে যেত। এমন কি রাস্তাতেও এক ফুট দুই ফুট পর্যন্ত পানি আসত। মাঝে মাঝে একটু গভীর। কিন্তু বর্ষাকালে একেবারে একধার হতে আর একধার পর্যন্ত পানিতে ভরে যেত। বর্ষাকালে নদীর দৃশ্য খুব সুন্দর লাগে। নদীর অপর পারের রাস্তা হতে এ পারের রাস্তা পর্যন্ত পানিতে টল টল করে। নানারকম নৌকায় এই জলপথ ভরে যায়। ধান ও পাট ক্ষেতের পাশ দিয়ে বিল পার হলেই বনগ্রামের স্কুল। রাস্তার পাশে সারি সারি জাম গাছ। হামিদুজ্জামান অনেক সময় গাছে উঠে জাম পেরে আনন্দ করে স্কুলে যেত।
নীরদচন্দ্র চৌধুরীর ভাইয়ের ছেলে বিপ্লব চৌধুরী হামিদুজ্জামানের সহপাঠী ছিল। হামিদুজ্জামান প্রায় বিপ্লবের বাড়ি গিয়ে সাথে নিয়ে স্কুলে যেত। বনগ্রামে স্কুলের শিক্ষকবৃন্দ সংস্কৃতিমনা ছিলেন। হামিদুজ্জামানকে ছবি আঁকার প্রতি উৎসাহ দিতেন। অষ্টম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন । তখন শিক্ষকদের নজরে পরে। ওই সময় স্কুলে ভারত থেকে বসুমতী মাসিক ম্যাগাজিন ও পূজা সংখ্যা প্রকাশিত হলেই আসত। হামিদুজ্জামান গচিহাটা গ্রামের প্রখ্যাত শিল্পী হেমেন্দ্র মজুমদার সম্বন্ধে জানতে পারেন। আঠারো-শ পঁচানব্বই সালে গচিহাটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে হেমেন্দ্র নাথ মজুমদার বনগ্রাম স্কুলের ছাত্র ছিলেন। তাঁর পিতার নাম গোলকনাথ মজুমদার। প্রখ্যাত ও ঐতিহাসিক কেদারনাথ মজুমদার তাঁর ভাই উচ্চশিক্ষিত ছিলেন। হেমেন্দ্র নাথ মজুমদার বনগ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর তিনি ময়মনসিংহ স্কুল শেষ করে কলকাতা পড়তে যান। মায়ের আগ্রহে কলকাতা সরকারি আর্ট কলেজে ভর্তি হন। তিনি যখন কলকাতা আর্ট কলেজের ছাত্র তখন তাঁকে পঞ্চম জর্জের আগমন উপলক্ষে কলেজের তোরণ সাজানোর আদেশ দেওয়া হয়। তিনি ঘৃণাভরে এ আদেশ প্রত্যাখ্যান করে কলেজ থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন। একবছর পড়ার পর জুবিলী আর্ট সেন্টার থেকে শিল্প শিক্ষা গ্রহণ করেন। তার চিত্রশিল্প ভারতবর্ষে যৌথ প্রদর্শনীতে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার অর্জন করেন। তার খ্যাতি ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী জীবনে তিনি একজন গুণী শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। পরে তিনি কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
হেমন্ত নাথ মজুমদারের বাড়ির পাশে প্রতি বছর রথের মেলা বসত। দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসত। রঙ বেরঙ-এর বেলুন, মাটির পুতুল, পানিতে চলা টিনের জাহাজ, মাটির ও রঙিন কাগজ ভাঁজ করা চলন্ত কুমির। চিনির বাতাসা, হাতি, ঘোড়া, মাছ, বিড়াল, বাঘ, আরো কত কিছু চিনির ছাঁচের তৈরি ও পোড়া মাটির হাঁড়ি পাতিল, পুতুল মা ও শিশু, চাকাওয়ালা নৌকা, আরো অনেক কিছু। হামিদুজ্জামান যেন অপেক্ষায় থাকত রথের মেলার জন্য। নিজের জমানো কয়েকটি আধুলি মিলিয়ে মায়ের কাছে এসে বায়না ধরে পয়সা নিয়ে মেলায় যেত। তখন হামিদুজ্জামান মেলায় গ্রামের আদলে টেপা পুতুলে ও মাটির জিনিস দেখার সুযোগ পায়। হাইস্কুলে পড়াশোনা করা অবস্থায় হামিদুজ্জামান বাবার সাথে থাকতেন এবং বাবার সাংসারিক জীবনের যাবতীয় কাজকর্মে সাহায্য করতেন। একসময় বাবার সাথে পাট শুকিয়ে আনার জন্য বাড়ি থেকে প্রায় কিছুটা দূরে যায়। সেখানে পাট শুকিয়ে দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে, ইতিমধ্যে মিষ্টি মিষ্টি আওয়াজের কথা শুনতে পায়। তখনই হামিদুজ্জামান বাবার কাছে মিষ্টিওয়ালা দেখিয়ে দিলেন এবং বায়না ধরলেন। বাবা পাটের বিনিময়ে মিষ্টি কিনে দিয়েছিলেন। হামিদুজ্জামান সেই স্মৃতি এখনো মনে আছে। ওই সময়ে গ্রামের লোকজনের পাটের উৎপাদনে যথেষ্ট উৎসাহিত ছিল। আমাদের পাট বিদেশে যথেষ্ট চাহিদা ছিল।
পরবর্তীতে থাকছে শিল্পীজীবনের পদার্পণের গল্প।





