জাতীয়

লোকসানের শঙ্কায় খামারিরা

  • তরিকুল ইসলাম সুমন
  • প্রকাশিত ২১ মে, ২০২৪

কোরবানি ঈদকে টার্গেট করে বছরজুড়ে গবাদিপশু পালন করেছেন প্রায় ২ লাখ খামারি। ঈদের প্রায় মাসখানেক বাকি। তাই হিসাব-নিকাশ শুরু করেছেন তারা। পশুখাদ্যের উচ্চমূল্য, তীব্র দাবদাহে বাড়তি যত্মের কারণে এবার পশুপালনে খরচ বেশি হয়েছে। অপরদিকে, এবার চাহিদার চেয়ে পশুর সংখ্যাও অনেক বেশি। সব মিলিয়ে ন্যায্য দাম পাওয়ার শঙ্কায় আছেন খামারিরা।

ইন্টিগ্রেটেড ডেইরি রিসার্চ নেটওয়ার্ক (আইডিআরএন) বলছে, এক বছরেই প্রাণীর খাবারের দাম বেড়েছে ৫৪ শতাংশ, যেখানে বিশ্ববাজারে বাড়ে ২০.৬ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাণী খাদ্যের দাম বৃদ্ধিতে কাজ করছে শক্তিশালী চক্র (সিন্ডিকেট)। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে এ চক্র প্রচলিত প্রাণী খাদ্যের উপাদানগুলোর (গমের ভুসি, ধানের কুঁড়া, সয়ামিল, ডি অয়েল রাইস পলিশ, মসুর ভুসি, সরিষার খৈল, ভুট্টা, ছোলার ভুসি, মুগ ভুসি, খড়, চালের খুদ) দাম বৃদ্ধিতে আরও সক্রিয়। খেয়ালখুশিমতো গোখাদ্য মজুত রেখে তৈরি করা হচ্ছে কৃত্রিম সংকট।

মানব খাদ্যের দাম নির্ধারণ, তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের জন্য একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠান থাকলেও প্রাণী খাদ্যের দামের সিন্ডিকেট দমাতে নেই কেউ। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এগিয়ে আসছে না প্রাণিসস্পদ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের নীরবতার কারণে। ঠিক একই কারণে সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে খামারিরা। বেশি দামে পণ্য কিনে মাসুল দিচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ। এমনটাই মনে করছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।

কুষ্টিয়ার বিভিন্ন বাজার ঘুরে আমাদের প্রতিনিধি আকরামুজ্জামান আরিফ জানান, পাঁচ বছর আগে যেখানে ৫০ কেজি ওজনের এক বস্তা সয়ামিলের দাম ছিল ১ হাজার ৭০০ টাকা; বর্তমানে তা ৩ হাজার ৪০০ টাকা, আবার কোথাও সাড়ে ৩ হাজারে বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে ৫০ কেজি গমের ভুসির দাম ছিল ৭৫০। ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মসুর ভুসির ৫০ কেজি ৫৪০ টাকা থেকে ২ হাজারে বিকাচ্ছে। ভুট্টার ৫০ কেজি ওজনের বস্তার দাম ছিল ৮০০ টাকা। বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ টাকায়। ধানের কুঁড়া ও ছোলার ভুসি কিনতে হচ্ছে ২৫০০ থেকে ২৭০০ টাকায়।

খামারিদের সঙ্গে কথাবলে জানা গেছে, তিন মাসের ব্যবধানে গমের ভুসি প্রতি বস্তা ১৬০০-১৮০০ টাকা, ও চিকন ভুসি ২০০০-২৮০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। আবার এক বাজার থেকে অন্য বাজারে বেশ ব্যবধানে বিক্রি করা হয়ে থাকে। এক বাজারের দাম অন্যবাজারে মেলে না। চালের খুদ কিনতে হচ্ছে ৩৫-৪০ টাকা, তিন মাস আগে ছিল ৩০-৩২ টাকা কেজি। ধানের কুঁড়া ২০ টাকা। খড়ও কিনতে হচ্ছে ৫ টাকা বেশিতে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংসের দাম ছিল গড়ে ৩০০ টাকা। ২০১৫ সালে তা বেড়ে হয় ৪০০ টাকা। তার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবছর দাম বেড়েছে। ২০২১ সালে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হয় প্রায় ৬০০ টাকায়। অন্যদিকে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকায়। অর্থাৎ ২০১৪ সালের তুলনায় এখন গরুর মাংস প্রতি কেজি ১৫০ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, খুচরা পর্যায়ে চলতি বছরের শুরুতেও প্রতি কেজি গমের ভুসির দাম ৪৬ থেকে ৪৭ টাকা, বুটের খোসা ৫২ থেকে ৫৩ টাকা, চালের খুদ ২৯ থেকে ৩০ টাকা ও দানাদার ফিডের দাম ৪৯ থেকে ৫০ টাকা ছিল। তবে বর্তমানে প্রতি কেজি গমের ভুসি ৫২ থেকে ৫৫ টাকা, বুটের খোসা ৬২ থেকে ৬৫ টাকা, চালের খুদ ৩৮ থেকে ৪০ টাকা ও দানাদার ফিড ৫৫ থেকে ৫৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া পানি-বিদ্যুৎ বাবদ খরচও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন খামারিরা। ফলে লালন-পালন খরচ বৃদ্ধি পেয়ে বাজারে গরুর দাম বেড়েছে।

ক্যাবের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংসের দাম ছিল গড়ে ৩০০ টাকা। ২০১৫ সালে তা বেড়ে হয় ৪০০ টাকা। তার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবছর দাম বেড়েছে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট, এস এম নাজের হোসাইন বলেন, পশু খাদ্যের দাম বাড়ছেতো বাড়ছেই। পশুখাদ্য তৈরির প্রায় সকল পণ্যই বিনা শুল্কে আমদানি করা হচ্ছে। তারপরেও খাদ্যের দাম বাড়ছে। যাদের দাম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন ছিল, তারা নীরবতা পালন করছে। তারা বলছেন, উৎপাদন বাড়তে তারা কাজ করছেন। যদি খামারিরা না বাঁচে তাহলে উৎপাদন কতটা বৃদ্ধি হবে? অন্য নিত্য পণ্যের মতোই সিন্ডিকেট করে বাড়ানো হচ্ছে দাম। দশ বছর আগে গরুর মাংস ৩০০ টাকা হলেও এখন তা প্রায় ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সকল মাসুল দিতে হচ্ছে ভোক্তাকে। এ বিষয়ে ক্যাবের পক্ষ থেকে কিছুদিন আগে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে জানানো হলে মন্ত্রণালয়কে এগিয়ে আসতে বলেন। মন্ত্রণালয় এগিয়ে আসলে তারা প্রযোজনীয় সহায়তা দেবে বলে জানানো হয়েছিল।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মো. আব্দুর রহমান জানিয়েছেন, মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য ঈদুল আজহা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি যাতে স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে এবং পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে উদযাপন করা যায় সে লক্ষ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও সরকারের অন্যান্য দপ্তর-সংস্থা কাজ করছে। দেশে কোরবানি যোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার ৩৬৭টি। যার বিপরীতে এক কোটি ৭ লাখ ২ হাজার ৩৯৪টি পশুর চাহিদা রয়েছে। ফলে কোরবানির পশু নিয়ে কোনোরকম সংশয়, সংকট বা আশঙ্কার কারণ নেই। দেশে অবৈধ উপায়ে গবাদিপশুর অনুপ্রবেশ যেন না ঘটতে পারে সে জন্য সীমান্তবর্তী জেলাসমূহে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) সভাপতি মো. ইমরান হোসেন বলেন, গবাদি পশু উৎপাদনে প্রায় ৮০ শতাংশ খরচ হয় খাদ্যে। গত বছরের তুলনায় অনেকটাই বেড়েছে পশুখাদ্যের দাম। এ কারণে পশুর প্রকৃত দাম নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। দেশের খামারিদের কাছে চাহিদার অতিরিক্ত পশু রয়েছে। এ কারণে দাম না বাড়লেও খামারিরা লোকসানে পড়তে পারেন। তবে খামারি ও প্রান্তিক পর্যায়ে গরু লালন পালনে খরচের কিছুটা ফারাক হয়ে থাকে। প্রান্তিক পর্যায়ের অর্থাৎ গৃহস্ত পর্যায়ের লালন পালনের দানাদার খাবার কম খাওয়ানো হয়। আর বাণিজ্যিক পর্যায়ে খামারিদের খরচ বেশি হয়ে থাকে।

তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশে কেজি প্রতি মাংস উৎপাদনের প্রকৃত কোনো হিসাব নেই। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি কর তথ্য ও আসছে। আমাদের দেশে বিভিন্ন জাতের গবাদি পশু লালন পালন করা হয়ে থাকে। ফলে তাদের শারীরিক গঠন ও ভিন্নতা রয়েছে।

খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় তিনি চোরাই পথে দেশে গরু আসা বন্ধে সীমান্ত এলাকায় কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করা এবং কোরবানির পশু পরিবহনে পথে চাঁদাবাজি বন্ধেরও দাবি জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা কোরবানির পশু কিনতে শুরু করেছেন। অনেকে আবার, খামারে গিয়েও গরুর কিনতে শুরু করেছেন। তবে পশুখাদ্যের দাম বেশি থাকায় এবার গরুর দাম বেশি পড়ছে। কোরবানির হাট শুরুর বেশ আগেই পশু বিক্রির আয়োজনে এবার ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি। খামারিরা এর জন্য চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে দায়ী করছেন। ঢাকার মাংসের বাজারেই এখন গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে। কোরবানির পশু আগে-ভাগে কিনতে পারলে কিছুটা কমে পাওয়া যায় বলে অনেকেই খামারে গরু বুকিং দিচ্ছেন। অনেকেই আবার হাটে গিয়ে গরু কেনার ঝামেলায় যেতে চান না বলে আগে-ভাগে কোরবানির পশু কিনে ফেলছেন। কিছু ক্রেতা আবার অনলাইনেও গরু কেনার চাহিদা জানাচ্ছেন। খামার থেকে বা অনলাইনে গরু কিনলে ক্রেতারা সাধারণত ‘লাইভ ওয়েট’ বা ওজনের মাধ্যমে জীবন্ত পশুর দাম নির্ধারণ করেন। গত বছর লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে গরুর দাম প্রতি কেজিতে ৪৮০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। এ বছর ৫০০ টাকা কেজি হিসাবে বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে। লাইভ ওয়েট পদ্ধতিতে পুরো গরুর ওজনের ভিত্তিতে এর দাম নির্ধারণ করা হয়।

কৃষ্টিয়ার গরু ব্যবসায়ী আবুল হোসেন জানান, এবার তিনি কোরবানির জন্য ২৫টি গরু লালন-পালন করেছেন। আত্মীয়দের কাছ থেকেও প্রায় ৩০টি গরু সংগ্রহ করেছেন। নিজের খামারের ২টি গরু বিক্রি করেছেন ৩ লাখ টাকায়। তার মাত্র ৫-৭ হাজার টাকা থেকেছে। এছাড়াও তারা প্রায় ১০০টি গরু নিয়ে ঢাকায় আসবেন সবগুলোই ২ লাখ টাকার মধ্যে। গত বছর তাকে ৭টি গরু ফিরিয়ে নিয়ে হয়েছিল। তবে খাদ্যের দামের কারণে দাম কিছুটা বেশি হবে। তবে তুলনামূলক দাম বাড়বে না বলেও জানান এই খামারি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads