লাগেজ বিড়ম্বনায় যাত্রীরা

সংগৃহীত ছবি

জাতীয়

লাগেজ বিড়ম্বনায় যাত্রীরা

  • ইমরান আলী
  • প্রকাশিত ৯ মে, ২০২২

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ বিড়ম্বনা দীর্ঘদিনের। এ সমস্যা কাটাতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ  বেবিচক) কয়েকবার উদ্যোগ নিলেও বার বার ব্যর্থ হয়েছে। কিছুদিন ভালো থাকে কিছুদিন পর আবার সেই আগের সমস্যা।

সম্প্রতি বিমানবন্দরে লাগেজ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। যাত্রী নামার পর ইমিগ্রেশন শেষ করে ১৮ মিনিটে লাগেজ পাওয়ার কথা। কিন্তু কিসের ১৮ মিনিট। অনেক সময় ৪৮ ঘণ্টাও লেগেছে যাত্রীর লাগেজ পেতে। বিমানবন্দর ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়।

একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন গোলাম কিবরিয়া। রোজায় মাকে নিয়ে ওমরাহ করতে সৌদি আরব গিয়েছিলেন তিনি। কয়েকদিন আগে রাত ১০টায় সৌদি এয়ারলাইনসে করে দেশে ফেরেন কিবরিয়া। কিন্তু শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসার পর লাগেজ পেতে বিড়ম্বনায় পড়েন। কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেয়, সৌদি এয়ালাইনসে যারা এসেছেন তারা ৭ নম্বর বেল্টে চলে যান। সেখানে সবার লাগেজ সংগ্রহ করতে পারবেন। কিবরিয়াসহ সৌদি আরব থেকে আসা অন্য যাত্রীরা অপেক্ষা করতে থাকেন বেল্টের সামনে। সময় যায় কিন্তু কারোর লাগেজই আসে না। আড়াই ঘণ্টা পর কর্তৃপক্ষ আবারো ঘোষণা দেয়, বেল্টে লাগেজ এখন আর আসবে না। আপনারা ৭২ ঘণ্টা পর বিমানবন্দরে যোগাযোগ করলে যার যার লাগেজ পেয়ে যাবেন।

একই ঘটনা ঘটেছে গত ২০ এপ্রিল রাতে। ইতালি থেকে দেশে আসেন কুমিল্লার গোলাম মোস্তফা। তার লাগেজ আসার কথা ছিল ৪ নম্বর বেল্টে। কিন্তু তিনিও প্রায় ৭২ ঘণ্টা পর লাগেজ পেয়েছেন।

এ দুজনের মতোই শত শত যাত্রী লাগেজ পেতে নানা বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন। বেল্টে লাগেজ পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অথচ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৮ মিনিটেই লাগেজ পাওয়ার কথা।

শাহজালালসহ দেশের সবকটি বিমানবন্দরে যাত্রী সেবার মান বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে বেবিচক। বিশেষ করে যাত্রীরা যাতে সহজেই তাদের লাগেজসহ সব ধরনের জিনিসপত্র দ্রুত সময়ে পেয়ে যান সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। সমপ্রতি বেবিচক কার্যালয়ে সংস্থাটির চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতনরা বৈঠক করে বেশ কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে।

সম্প্রতি দুপুর দুইটার দিকে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে সৌদি আরব থেকে দেশে আসেন মো. হুমায়ুন। বিমানবন্দরের টার্মিনালে-১ এ (ক্যানপি-১) তিনি স্বজনদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। যাবেন কুমিল্লা। হুমায়ুন বলেন, চার মাস আগে গিয়েছিলাম সৌদি আরব। অসুস্থতার কারণে দেশে ফিরে এসেছি। প্লেন থেকে নেমেছি দুপুর দুইটায়। কাস্টমস হয়ে বিভিন্ন জায়গা ঘুরে এয়ারপোর্ট থেকে বের হতে আমার সময় লেগেছে প্রায় ৪ ঘণ্টা। বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের কথা কী বলবো? বাঙালি আসলে খুব খারাপ। এই দেশের কেউ পদ পেলে মানুষকে আর মানুষ মনে করে না। 

রিয়াদ থেকে আসা আলাউদ্দিন গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। যাবেন ফেনী। তিনি বলেন, নির্দিষ্ট সময়ের দেড় ঘণ্টা আগেই বিমান ঢাকায় ল্যান্ড করেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে লাগেজ পেতে। অভিযোগ করে তিনি বলেন, বেল্ট থেকে সবার মালামাল অগোছালোভাবে নিচে ফেলে দিয়েছে। লাগেজ খুঁজে বের করতে অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। ৩৫ থেকে ৪০ জন্য লাগেজ খুঁজে পাচ্ছিল না। ওই ফ্লাইটের অন্য যাত্রীরা পেরেশানিতে রয়েছেন।

বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে রিয়াদ থেকে এসেছেন মো. শাফিকুল হক। যাবেন সাভার। শাফিকুল বলেন, আমার অনেক দেরি হয়ে গেছে লাগেজ খুঁজে পেতে। যাত্রীদের ভুল থাকতে পারে। অনেকেই বিমানবন্দরের নিয়ম-কানুন জানে না। কিন্তু এসব বিষয়ে তো সহায়তা পাওয়ার কথা।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান জানান, শাহজালালসহ সবকটি বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি প্রতিরোধ করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশ থেকে আসা যাত্রীরা যাতে দ্রুত সময়ের মধ্যে লাগেজ পেয়ে যান সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তারা নিয়মিত মনিটরিং করছেন। কিন্তু অবস্থার যে উন্নতি হয়নি গোলাম কিবরিয়া ও গোলাম মোস্তফার ঘটনা থেকেই বোঝা যায়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে দেশি-বিদেশি ৩৫টি বিমান সংস্থা বাংলাদেশে তাদের ফ্লাইট পরিচালনা করে আসছে এবং ৪৭টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বিমান চলাচল চুক্তি রয়েছে। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ হাজার যাত্রী আসা-যাওয়া করছেন শাহজালাল বিমানবন্দরে। কিন্তু একসঙ্গে পাঁচ-ছয়টি ফ্লাইট বিদেশ থেকে আসার পর হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। বিশেষ করে যাত্রীরা লাগেজ পেতে বেশি বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন। বর্তমানে শাহজালালে আটটি লাগেজ বেল্ট রয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে কেউ তাদের লাগেজ পাচ্ছেন না।

ভুক্তভোগী যাত্রীরা জানিয়েছেন, বিমানে যাত্রীর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু বাড়েনি বিমানবন্দরের লাগেজ বেল্টের সংখ্যা। আর যেগুলো আছে সেগুলোও ঠিকভাবে কাজ করে না। কর্তৃপক্ষ লাগেজ বেল্টে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েও নির্দিষ্ট সময়ে তারা লাগেজ বেল্ট দিতে পারে না।

যাত্রীরা আরো জানান, অন্য দেশে ফ্লাইট অবতরণ করার পর প্রায়ই দেখা যায় লাগেজ সরবরাহের কাজ শুরু হয় ৩০ থেকে ৪০ মিনিট পর। লাগেজ পাওয়া থেকে শুরু করে সবকিছু নিয়মের মধ্যে হচ্ছে। কোনো হয়রানি হতে হয় না কাউকে। অথচ দেশেই ব্যতিক্রম।

ওমরাহ করে আসা ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া বলেন, দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে শাহজালালে নেমে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে আমাদের। আমাদের টিমে ছিল ৪৬ জন যাত্রী। ফ্লাইট থেকে নেমে বিমানবন্দরের ভেতরে আসার পর থেকেই নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। ইমিগ্রেশনেও অনেক সময় লেগেছে। ইমিগ্রেশন শেষ করে লাগেজের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। মনিটর স্ক্রিনে ঘোষণা দেওয়া হয়, সৌদি এয়ারলাইনস থেকে আসা যাত্রীরা ৭ নম্বর বেল্টে চলে যান। আপনাদের লাগেজ সেখানে পেয়ে যাবেন। ওই বেল্টের সামনে দাঁড়িয়ে আধা ঘণ্টা অপেক্ষার পর আবারো ঘোষণা দেওয়া হয় ৮ নম্বর বেল্টে চলে যান। সেখানে আবার গেলাম আমরা। কিন্তু ওই বেল্টে ছয়জনের লাগেজ আসার পর আর আসছিল না। আড়াই ঘণ্টা পর জানানো হলো আপনাদের লাগেজ পাবেন ৭২ ঘণ্টা পর। আপনারা পরে বিমানবন্দরে যোগাযোগ করুন। তিনি আরো বলেন, এভাবে হয়রানি করার মানে হয় না। অনেকেই গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দা। এত দেরি করে যদি কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেয় তাহলে তারা কীভাবে বাড়িতে যাবেন আবার কীভাবে এসে তাদের লাগেজ নিয়ে যাবেন?’ এসব সমস্যা দ্রুত সমাধান না করলে দেশের বদনাম হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

গোলাম মোস্তফা বলছিলেন, লাগেজ পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেন অপেক্ষা করতে হবে? ইতালিতে লাগেজ পেতে বেশি হলে ১৫ মিনিট লাগে। আর নিজের দেশে ৭২ ঘণ্টা পর আমার লাগেজ হাতে পেয়েছি। এটি খুবই দুঃখজনক।

বিমানবন্দরে কর্মরত ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, লাগেজ বেল্টে জট লাগে তা সত্য। এখানে তাদের সীমাবদ্ধতা আছে। শাহজালালে বেল্ট আছে আটটি। প্রায়ই একসঙ্গে সাত-আটটি ফ্লাইট অবতরণ করে। এ সময়টাতেই বেশি ঝামেলা হয়। তিনি আরো বলেন, মাঝে মধ্যে আটটি বেল্টের মধ্যে দুই-তিনটি বেল্ট নষ্ট বা বন্ধ থাকে। এগুলো মেরামত করতেও অনেক সময় লেগে যায়। গত মাসে বেবিচক বলে দিয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যাত্রীদের লাগেজ হাতে পেতে হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads