বিতর্কিত ঠিকাদার ও যুবলীগ নেতা এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম তার ও তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধে র্যাবকে ১০ কোটি টাকার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ছাত্রলীগের সাবেক সহসম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরী হত্যার নেপথ্যেও শামীমের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চবির নতুন কলা ভবন নির্মাণের ৭৫ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে দিয়াজকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি পরিবারের। শুধু টেন্ডারের জন্যই এ হত্যাকাণ্ড বলে মনে করেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতারাও। অভিযোগ উঠেছে, জাল কাগজপত্র দাখিল করে ওই কাজ হাতিয়ে নেন কথিত যুবলীগ নেতা জি কে শামীম। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ বিষয়ে অনুসন্ধান করে জাল কাগজপত্রের প্রমাণ পেয়েছে বলে জানিয়েছে।
শুক্রবার ভোর থেকেই যুবলীগ নেতা ও প্রভাবশালী ঠিকাদার জি কে শামীমের নিকেতনের অফিস ঘিরে রাখে র্যাব।
একপর্যায়ে র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম নিকেতনে এলে শুরু হয় অভিযান আর কার্যালয়ে তল্লাশির প্রস্তুতি। র্যাব কর্মকর্তাদের অভিযান ও তল্লাশি করতে বারণ করেন জি কে শামীম। এর বদলে এক কর্মকর্তাকে ১০ কোটি টাকা ঘুষ প্রস্তাব করেন তিনি। তবে সেই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে অভিযান চালায় র্যাব। জব্দ করা হয় নগদ টাকা, এফডিআরসহ মাদক।
র্যাবের লিগ্যাল ও মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সারওয়ার-বিন-কাশেম বলেন, ‘জি কে শামীম তার অফিস ও বাসায় অভিযান না চালাতে এবং গ্রেপ্তার এড়াতে আমাকে ১০ কোটি টাকার ঘুষ প্রস্তাব করেছিলেন। প্রস্তাব আমলে না নিয়ে আমরা জি কে শামীমের কার্যালয়ে অভিযান চালাই, তাকেসহ তার সাত দেহরক্ষীকে গ্রেপ্তার করি।’
তিনি বলেন, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, মানি লন্ডারিংয়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালত তাকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তিনি এখন ডিবি হেফাজতে। শামীমকে রিমান্ডে নেওয়ার আগে জিজ্ঞাসাবাদ করে র্যাব।
দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে শামীম গণপূর্ত অধিদপ্তরের ২০ জন সাবেক কর্মকর্তার নাম বলেছেন, যাদের মাসে ২-৫ লাখ টাকা দিতেন তিনি। এর বদলে তারা শামীমকে ঠিকাদারির কাজের টেন্ডার পেতে সাহায্য করতেন।
সূত্র জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শামীম জানান, ঢাকার বাসাবো ও নিকেতনে তার অন্তত পাঁচটি বাড়ি রয়েছে। রাজধানীতে একাধিক ফ্ল্যাট আছে। গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে তার বাড়ি রয়েছে। তার বাসাবো ও নিকেতনের বাড়ি দুটি অত্যাধুনিক। সেখানে গণপূর্তের যুগ্ম ও অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা তার সঙ্গে সব ধরনের ব্যবসায়িক আলাপ ও লেনদেন করতেন। সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থাও ছিল।
সূত্র আরো জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এ যুবলীগ নেতা সরকারি বড় বড় প্রকল্পের কাজ বাগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কোটি কোটি টাকা ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। জিজ্ঞাসাবাদে শামীম জানান, ঠিকাদারির কাজ পাইয়ে দিতে তিনি দুই কর্মকর্তাকে এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা দিয়েছেন।
জিজ্ঞাসাবাদে জি কে শামীম আরো জানান, প্রতি টেন্ডারে ৮-১০ শতাংশ কমিশন দেওয়া লাগত তার। অনেক সময় নির্দিষ্ট কমিশনের পরও ঘুষ দিতে হতো। পূর্ববর্তী ও ভবিষ্যতের কাজ পেতে এখন পর্যন্ত গণপূর্ত অধিদপ্তরের সদ্য সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে তিনি ঘুষ হিসেবে এক হাজার ১০০ কোটি টাকা দেন। গণপূর্তের ঢাকা জোনের আরেক সদ্য সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুল হাইকেও ঘুষ দিয়েছেন ৪০০ কোটি টাকা— এমন দাবি করেন তিনি।
সূত্র জানায়, গত বছরের ডিসেম্বরে গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম অবসরে যান। তিনি দায়িত্বে থাকাকালে সেখানে একচ্ছত্রভাবে ঠিকাদারি কাজ পান শামীম। তবে রফিকুল অবসরে যাওয়ার পরও গণপূর্তে শামীমের প্রভাব কমেনি। কমিশন দিয়ে নিজের প্রভাববলয় টিকিয়ে রাখেন তিনি। গণপূর্তে এমন কথা প্রচলিত আছে, ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নিতে নানা দপ্তরে তদবির করে রফিকুলকে প্রধান প্রকৌশলী বানিয়েছিলেন শামীম।
র্যাব সূত্র জানায়, সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা জি কে শামীম ক্ষমতাসীন দলের ভুয়া পরিচয় দিয়ে চলাফেরা করতেন। একসময় পরিচিত ছিলেন বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাসের ‘ডান হাত’ হিসেবে। ঢাকা মহানগর যুবদলের সহসম্পাদকও ছিলেন তিনি। তবে ক্ষমতার পালাবদলে শামীমও তার পরিচয় বদলে ফেলেন। রাতারাতি ভোল পাল্টে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগে ভিড়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা অনুষদ ভবনের দ্বিতীয় পর্যায়ের নির্মাণকাজের জন্য ২০১৬ সালে ৭৫ কোটি টাকা দরপত্র আহ্বান করা হয়। বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠানকে দরপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ করে দেয় ছাত্রলীগের একাংশ। কাজটি পায় জি কে শামীমের মালিকানাধীন মেসার্স দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স জিকেবিএল (জেভি)। অভিযোগ রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের প্রভাবে অন্য ঠিকাদাররা দরপত্র জমা দিতে পারেননি। এর জের ধরে ২০১৬ সালের ২০ নভেম্বর নিজের বাসায় খুন হন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরী।
অভিযোগ রয়েছে, জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়ার জন্য ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম খানকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়। এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ২০১৬ সালের ১৪ নভেম্বর একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়।
প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম খান তখন বলেছিলেন, ৭৫ কোটি টাকার দরপত্র উন্মুক্ত করার সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন। দুটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী সাপ্তাহিক বন্ধের দিন এ সংক্রান্ত সভা ডাকার কথা তাকে জানিয়েছিলেন। তিনি কর্মদিবসে সভা ডাকার অনুরোধ করেন। পরে অজ্ঞাত কারণে তাকে মূল্যায়ন কমিটিতে রাখা হয়নি।
একটি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দরপত্রে অনিয়ম ও কার্যাদেশ দেওয়া এবং বিভিন্ন দুর্নীতির বিষয়টি অনুসন্ধান করছে দুদক। এ জন্য প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলামের সঙ্গে কথাও বলেছে প্রতিষ্ঠানটি।
দুদকের চট্টগ্রাম জেলা সমন্বিত কার্যালয়-১-এর সহকারী পরিচালক ফখরুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের দরপত্রের কাগজপত্রে জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জাল কাগজপত্র দাখিল করেছে। এ বিষয়ে অনুসন্ধানের পর মামলা হতে পারে।
জানা গেছে, নির্ধারিত সময়ে কলা অনুষদ ভবনের নির্মাণকাজ শেষ করতে পারেনি জি কে শামীমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। চুক্তি অনুযায়ী গত বছরের নভেম্বরে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র ৫৬ শতাংশ কাজ হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মো. আবু সাঈদ হোসেন বলেন, কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময় আগেই শেষ হয়ে গেছে। সম্প্রতি ওই প্রতিষ্ঠানকে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠানের হয়ে নির্মাণকাজ তদারক করছেন ছাত্রলীগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল মনসুর জামশেদ।
জি কে শামীমের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে আবুল মনসুর জামশেদ বলেন, আগে তো তার (শামীম) সম্পর্কে কেউ কিছু বলেননি। আসলে আমরা চাঁদাবাজি করি না। ব্যবসা করে খেতে চাই। আপনারা সহযোগিতা না করলে আমরা কাজ করব কী করে?
এদিকে জি কে শামীমকে ‘মাফিয়াচক্রের হোতা’ অভিহিত করে নিহত দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর বড় বোন আইনজীবী জুবাইদা ছরওয়ার চৌধুরী বলেন, তার গ্রেপ্তারের খবরে স্বস্তি পাচ্ছি। শামীমকে অন্যায়ভাবে এবং মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রশাসন ৭৫ কোটি টাকার কাজ দেয়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার কারণে আমার ভাই দিয়াজ খুন হন।
সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ২০ নভেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ ভাড়া বাসা থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় তৎকালীন ছাত্রলীগের সহসম্পাদক দিয়াজের লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে চবির কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ ভবনের দরপত্র আহ্বানকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুটি পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। সে সময় জিকেবিএল কোম্পানির দি বিল্ডার্সের নামে একটি মাত্র ফরম কেনা হয়েছিল। এই জিকেবিএলের স্বত্বাধিকারী জি কে শামীম। আর অন্য কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন তখন ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারেনি। কিন্তু জিকেবিএল ছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও যাতে দরপত্র জমা দিতে পারে তার পক্ষে ছিলেন দিয়াজ ইরফান চৌধুরী। মূলত এ কারণেই দিয়াজকে পরিকল্পতিভাবে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি পরিবারের।
দিয়াজ ইরফানের বোন জুবাইদা বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ ৭৫ কোটি টাকার টেন্ডার। সেটা জি কে শামীমের লাইসেন্স-এ দিয়াজ হত্যা মামলার আসামিরা হাতিয়ে নেয়। দিয়াজ চেয়েছিল স্বচ্ছ টেন্ডার হোক। এখান থেকেই শুরু। এই ঘটনা থেকে তপুকে মারা হলো, দিয়াজের ঘর ভাঙা হলো, মামুনদের ঘর ভাঙা হলো, তারপর ২০ দিনের মাথায় দিয়াজকে হত্যা করা হলো।
জি কে শামীমের নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয় টেন্ডার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা জড়িত ছিল তারাই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে মনে করেন সাবেক এক ছাত্রলীগ নেতা।
মামলার তদন্তকাজ চলমান আছে জানিয়ে সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, প্রয়োজনে নতুন কোনো বিষয় সামনে এলে সে ব্যাপারেও তদন্ত করা হবে।
২০১৬ সালের ২৪ নভেম্বর দিয়াজের মা বাদী হয়ে আদালতে ১০ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন। দিয়াজের মৃত্যুর তিনদিন পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রথম ময়নাতদন্তে আত্মহত্যা বলা হয়েছিল। পরে পরিবারের আপত্তির কারণে আদালত সিআইডিকে দ্বিতীয় দফায় ময়নাতদন্ত করার আদেশ দেন। সেই ময়নাতদন্তে দিয়াজকে হত্যার আলামত পাওয়া যায়।





