জাতীয়

অতিরিক্ত ভাড়া নিতে পারবে না ১৯৬টি বাস

রোববার থেকে বন্ধ সিটিং সার্ভিস

  • এম এ বাবর
  • প্রকাশিত ১১ নভেম্বর, ২০২১

যাত্রীদের ভোগান্তি থেকে রেহাই দিতে এবার ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় বন্ধ হচ্ছে সিটিং ও গেইটলক সার্ভিস বাস। পাশাপাশি গাড়িতে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে ভাড়ার তালিকা। ভাড়া আদায় করতে হবে এই তালিকা অনুযায়ী। আগামী রোববার থেকে এ নিয়ম কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব এনায়েত উল্যাহ।

ডিজেল ও কেরসিনের মূল্যবৃদ্ধির পর কয়েকদিন ধরে গণমাধ্যমে বাস ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্যের বিভিন্ন খবর প্রকাশ হয়। এরপর গতকাল বুধবার ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সমিতির মহাসচিব এই ঘোষণা দেন। জ্বালানি তেলে চালিত বাস ভাড়া পুনর্নির্ধারণ ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।

এদিকে সিএনজিচালিত বাসের সংখ্যা জানে না বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তাই সংস্থাটির তত্ত্বাবধায়নে সিএনজিচালিত পরিবহন চিহ্নিত করে সেগুলোতে স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া হবে বলে জানান কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির দাবি, ঢাকা শহরে চলাচল করা ছয় হাজার বাস-মিনিবাসের মধ্যে মাত্র ১৯৬টি সিএনজিচালিত। এসব বাসের জন্য নতুন ভাড়া কার্যকর হবে না বলে তারা জানান। এ ছাড়া দূরপাল্লার কোনো বাস সিএনজিতে চলে না বলেও জানান সংগঠনের মহাসচিব।

বাস মালিকরা অতিরিক্ত বাস ভাড়া বৃদ্ধি করেছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে তা ঠিক নয় উল্লেখ করে খন্দকার এনায়েতুল্লাহ বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় বাস ভাড়া বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল। তবে জনগণের যেন কষ্ট না হয় সেকথা মাথায় রেখে বিআরটিএ এবং সরকারের সঙ্গে বৈঠক করেছি। তারা যতটুকু বাড়াতে বলেছে আমরা ততটুকুই বাড়িয়েছি।

তিনি বলেন, অনেক দিন ধরে অভিযোগ রয়েছে সিটিং ও গেটলক সার্ভিসের নামে জনগণের কাছ থেকে বেশি বাড়া আদায় করা হচ্ছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি সিটিং সার্ভিস বন্ধ করে দেওয়ার। আগামী তিনদিনের মধ্যে কোনো সিটিং সার্ভিস থাকবে না। তিনদিন পর কেউ যদি সিটিং সার্ভিস চলমান রাখে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব‍্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি জানান, ঢাকা মেট্রো এলাকায় চলাচলকারী ১২০টি পরিবহন কোম্পানির মধ্যে ১৩টি কোম্পানিতে সিএনজিচালিত গাড়ি পাওয়া গেছে। সিএনজিচালিত গাড়ির মোট সংখ্যা ১৯৬টি। আমরা এখনো অনুসন্ধান করে যাচ্ছি। এই সংখ্যা আরো বাড়তে পারে তবে সেটা ২০-২৫টার বেশি হবে না। ভাড়া মনিটরিংয়ের জন‍্য আজ বৃহস্পতিবার থেকে বিআরটিএ এবং ডিএমপির ম্যাজিস্ট্রেটরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবে। তাদের সহযোগিতার জন্য মালিক সমিতির পক্ষ থেকে ১১টি ভিজিল্যান্স টিম মাঠে থাকবে।

এসময় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, বৃহস্পতিবার থেকে কোনো বাস ভাড়ার চার্ট ছাড়া রাস্তায় চলাচল করলে ভ্রাম্যমাণ আদালত যদি জরিমানা করে তাহলে ফেডারেশনের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ করা হবে না। সংবাদ সম্মেলনে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে ঢাকা মহানগরীতে কী পরিমাণ বাস ও মিনিবাস সিএনজিতে চলাচল করে আর কী পরিমাণ বাস-মিনিবাস ডিজেলে চলে তার পরিসংখ্যান নেই বিআরটিএর কাছে। এ বিষয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, সিএনজিচালিত বাস-মিনিবাসের সংখ্যার হালনাগাদ তথ্য বাস মালিকদের কাছ থেকেই পাওয়া সম্ভব। বাস মালিকদের কাছ থেকে এ সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার পর আমরা অনুসন্ধান চালাব। তারপর ডিজেল ও সিএনজিচালিত বাস চিহ্নিত করা হবে। সিএনজিচালিত বাসে স্টিকার লাগিয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করবে বিআরটিএ।

অন্যদিকে নতুন তালিকানুযায়ী অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে পারবে না ঢাকা মেট্রো এলাকায় চলাচলকারী ১২০টি পরিবহন কোম্পানির মধ্যে ১৩ কোম্পানির ১৯৬টি বাস। মালিক সমিতির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বাসগুলো হলো- গ্রেট তুরাগ ট্রান্সপোর্ট লিমিটেডের ৪০টি বাস, অনাবিল সুপার লিমিটেডের ৫টি বাস, প্রভাতী-বনশ্রী পরিবহন লিমিটেডের ১২টি বাস, শ্রাবণ ট্রান্সপোর্ট লিমিটেডের ৩০টি বাস, আসিয়ান ট্রান্সপোর্ট লিমিটেডের ২০টি বাস, মেঘালয় ট্রান্সপোর্ট লিমিটেডের ৫টি বাস, হিমালয় ট্রান্সপোর্ট লিমিটেডের ১৪টি বাস, ভিআইপি অটোমোবাইলস লিমিটেডের ২টি বাস, মেঘলা ট্রান্সপোর্ট লিমিটেডের ২৭টি বাস, শিকড় পরিবহন লিমিটেডের ৮টি বাস, বিকল্প অটো সার্ভিস লিমিটেডের ১টি বাস, গাবতলী লিংক মিনিবাস সার্ভিসের ১১টি বাস এবং ৬ নং মতিঝিল বনানী কোচ লিমিটেডের ২১টি বাস।

এদিকে সিএনজিচালিত পরিবহনে স্টিকার লাগানোর নির্দেশ দিয়েছে বিআরটিএ। এ বিষয়ে বিআরটিএর পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী বলেন, সিএনজিচালিত পরিবহনে স্টিকার লাগাতে আমরা মালিকদের চিঠি দিয়ে দিয়েছি। স্টিকার না লাগালে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনোভাবেই যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা যাবে না। বাসে ভাড়ার তালিকা না টাঙানো ও বর্ধিত ভাড়ার চেয়েও বেশি ভাড়া আদায় বন্ধে গতকাল রাজধানীতে বিআরটিএ ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আলাদা অভিযান পরিচালনা করতে দেখা যায়।

আজিমপুর-নিউমার্কেট হয়ে আসাদগেটগামী বাসগুলোকে থামানো হয় কলাবাগান সিগনালে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অন্তত ২৫টি গাড়ি থামিয়ে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে কিনা এবং গাড়িতে বর্ধিত ভাড়ার তালিকা টাঙানো আছে কিনা তা চেক করা হয়। এ সময় অধিকাংশ গাড়িতে ভাড়ার তালিকা পাওয়া যায়নি। বর্ধিত ভাড়া থেকেও বেশি ভাড়া নেওয়ার প্রমাণ পান ম্যাজিস্ট্রেট। এসব অভিযোগে আটটি গাড়ির চালকের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ডিএমপির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এসব মামলায় সাড়ে ১৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি আদায় করায় রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় বেশ কিছু বাসকে জরিমানা করে বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত। বিআরটিএর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাকিলা বিনতে মতিন বলেন, মূলত মূল্যতালিকা টানানো হয়েছে কি না, সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি নিচ্ছে কি না এবং গ্যাসে চালিত বাসে ডিজেল চালিত বাসের মতো বেশি ভাড়া নিচ্ছে কি না তা লক্ষ্য করা হচ্ছে। অভিযানে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের জন্য কয়েকটি বাসকে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।  এছাড়া কয়েকটি বাসে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ছাড়াও দুর্ব্যবহার করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কলাবাগান পুলিশ বক্স সংলগ্ন সড়কে বুধবার বেলা ১২টা থেকে ১টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ডিএমপির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রফিকুল হক। এ সময় বিভিন্ন বাসের যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কলাবাগানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আছেন তা জানার পর অনেক গাড়ি আজিমপুর থেকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তারা আর মিরপুর রোডে প্রবেশ করছে না। আর যেসব গাড়ি এ রুটে চলাচল করছে তারাও যে বাড়তি ভাড়া নিয়েছিল, ম্যাজিস্ট্রেট দেখে ধরা পড়ার আগেই তা ফিরিয়ে দিচ্ছেন যাত্রীদের।

ডিএমপির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রফিকুল হক বলেন, গণপরিবহনের নৈরাজ্য ঠেকাতে ডিএমপি, বিআরটিএ ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা রাজধানীসহ সারা দেশে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছেন। যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় বন্ধে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।

তিনি বলেন, কলাবাগানের যেসব গাড়ি থামানো হয়েছে সেগুলোর অধিকাংশই বর্ধিত ভাড়ার তালিকা পাওয়া যায় নাই। তালিকা না থাকায় যাত্রীরা বুঝতে পারছেন না কোনো জায়গা থেকে কোথায় ভাড়া কত। এই সুযোগে যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া আদায় করছেন চালক ও সুপারভাইজার। আমরা যেগুলোতে পেয়েছি তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে জরিমানা করা হয়েছে। গতকাল বেলা ২টা পর্যন্ত অভিযানে ৮ গাড়ির চালককে সাড়ে ১৮ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন তিনি।

প্রসঙ্গত, দেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বেড়েছে বাস ভাড়া। নতুন সমন্বিত ভাড়া অনুযায়ী, দূরপাল্লার বর্তমান বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১ টাকা ৮০ পয়সা করা হয়েছে। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি যাত্রীকে বাড়তি ৩৮ পয়সা গুনতে হবে। এছাড়া বড় বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা, মিনিবাসে ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এছাড়া মহানগরে বাসের বর্তমান ভাড়া কিলোমিটারে ১ টাকা ৭০ পয়সা, সেটা ২ টাকা ১৫ পয়সা করা হয়েছে। কিলোমিটারে ভাড়া বেড়েছে ৪৫ পয়সা। মহানগরে মিনিবাসের বর্তমান ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা ৬০ পয়সা। সেটি বাড়িয়ে ২ টাকা ৫ পয়সা করা হয়েছে। কিলোমিটারপ্রতি ৪৫ পয়সা ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ২৭ শতাংশ আর মহানগরে ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ ভাড়া বাড়লো।

গত ৭ নভেম্বর দুপুরে রাজধানীর বনানীতে বিআরটিএ কার্যালয়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রেক্ষাপটে গণপরিবহনে ভাড়া পুনর্নির্ধারণে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সঙ্গে পরিবহন মালিক সমিতির নেতাদের বৈঠকে প্রস্তাবের পর এ সিদ্ধান্ত হয়।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে ঊর্ধ্বগতির কারণে ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ডিজেল-কেরোসিনের দাম পুনর্নির্ধারণ করে সরকার। গত ৩ নভেম্বর রাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করে। নতুন দাম ভোক্তা পর্যায়ে ৬৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০ টাকা করা হয়েছে, যা বুধবার রাত ১২টা থেকে কার্যকর হয়।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads