ধর্ম

রাসুল (সা)-এর প্রতি দরুদ পড়ার গুরুত্ব ও ফজিলত

  • প্রকাশিত ১৫ নভেম্বর, ২০২০

মুফতি নাঈম কাসেমী

 

মহান রাব্বুল আলামীন নিজের সাথে বান্দার সম্পর্ক স্থায়ী করার জন্য দুনিয়াতে নবী ও রাসুলগণের বরকতময় জামাত পাঠিয়েছেন। হযরত আদম (আ.) থেকে নিয়ে হযরত ঈসা (আ.) পর্যন্ত লক্ষাধিক নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। সবাইকে নির্ধারিত এলাকায় পাঠিয়েছেন। কোনো দেশ কিংবা নির্দিষ্ট কোনো জাতির জন্য পাঠিয়েছেন। প্রত্যেক নবী-রাসুলের সীমারেখা নির্ধারিত ছিল। আল্লাহতায়ালা যখন যাঁকে যেখানে প্রয়োজন মনে করেছেন, তখন তাঁকে সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের নবী হযরত  মোহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহতায়ালা সামগ্রিক নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তিনি সবার নবী।  গোটা মানবজাতির নবী। সারাবিশ্বের নবী। তিনি সব নবীদেরও নবী। ফেরেস্তাদেরও নবী। জ্বীন জাতিরও নবী। তিনি গোটা সৃষ্টিজীবের নবী। তিনি সর্বোত্তম ও সর্বশেষ নবী। যাকে সৃষ্টি না করলে আল্লাহতায়ালা কিছুই সৃষ্টি করতেন না। যার উসিলায় এ ধরা সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহতায়ালা আমাদের নবী হযরত  মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উভয় জগতের জন্য রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছেন।  কোরআনপাকে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি আপনাকে উভয় জগতের জন্য রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছি।’

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশ্ববাসীকে হেদায়েত ও শান্তির পথ দেখানোর জন্য নিজের সারাটা জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছেন। অনেক কষ্ট, ত্যাগ, ও কুরবানি দিয়েছেন। আর দুনিয়ার মানুষের দেওয়া অসহ্য, নির্মম নির্যাতন হাসিমুখে ধৈর্যের সাথে বরণ করে নিয়েছেন। দিন প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবচেয়ে বেশি কষ্ট করেছেন। তাই আল্লাহরাব্বুল আলামীন তাঁকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করে সবচেয়ে উঁচু মর্যাদায় সমাসীন করেছেন। সব নবীদের সরদার বানিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা নিজের পরে তাঁকে সবচেয়ে বেশি সম্মানের পাত্র বানিয়েছেন। কোরআনুল কারীমে আল্লাহতায়ালা সরাসরি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম বলে সম্বোধন করেননি। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মানার্থে কোথাও ‘ইয়াসিন’ কোথাও  ‘মুদ্দাসসির’ কোথাও ‘মুযযাম্মিল’ কোথাও ‘ত্বাহা’ বলেছেন। আজান ও নামাজের মাঝেও আল্লাহতায়ালার পর হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম মোবারক রয়েছে। আল্লাহরাব্বুল আলামীন সব মুসলমানের জন্য হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরুদ পাঠ ও সালাম পেশ করাকে আবশ্যকীয় করে দিয়েছেন। কোরআনে কারীমে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ এবং ফেরেস্তাগণ নবীর ওপর দরুদ পাঠ করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও নবীর ওপর দরুদ ও যথাযথ সালাম পেশ করো।’ তাই  মুসলমানের জন্য উচিৎ হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দুরূদ পাঠ করার অনেক ফজিলত রয়েছে। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করবে, আল্লাহতায়ালা সেই বান্দার ওপর দশবার রহমত বর্ষিত করবেন।’ (মেশকাত শরিফ)। অন্য এক হাদিসে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘সবচেয়ে বড় কৃপণ ঐ ব্যক্তি যার কাছে আমার নাম নেওয়া হয় অথচ সে আমার ওপর দরুদ পাঠ করে না।’ (মুসনাদে আহমাদ)। এই জন্য হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মোবারক নাম উচ্চারণ করলে কিংবা অপরের থেকে শুনলে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরুদ পড়া প্রত্যেক মুসলমানের জন্য আবশ্যক। আর যদি কেউ কোনো মজলিসে থাকে, তবে ওই মজলিসে থাকা অবস্থায় প্রথমবার হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম আসলে দরুদ পড়া ওয়াজিব। দ্বিতীয়বার আসলে দরুদ পড়া সুন্নত। তৃতীয়বার এই মোবারক নাম আসলে দরুদ পড়া মুস্তাহাব। এরপর প্রতিবার দরুদ পড়া নফল।

দরুদের ফজিলত অপরিসীম। হাদিসের মাঝে এসেছে যে কোনো দোয়ার পূর্বে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরুদ পাঠ করলে সে দোয়া আল্লাহতায়ালা কবুল করেন। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরুদ পাঠ করার মাধ্যমে একজন মানুষ জাহান্নাম ও নেফাক থেকে মুক্ত হতে পারে । হাদিসে পাকে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি দৈনিক আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করবে আল্লাহপাক ঐ বান্দার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করবেন। আর যে ব্যক্তি দশবার আমার ওপর দরুদ পাঠ করবে আল্লাহতায়ালা তার ওপর একশবার রহমত বর্ষণ করবেন। আর যে ব্যক্তি আমার ওপর একশবার দরুদ পাঠ করবে আল্লাহপাক ঐ বান্দাকে দুইটা পুরস্কার দেবেন-একটা হলো জাহান্নাম থেকে মুক্তি, আরেকটা হলো নেফাক থেকে মুক্তি।’ (মুসনাদে আহমাদ)। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর একশবার দরুদ পাঠকারী ব্যক্তি বেঈমান-মুনাফিক হয়ে দুনিয়া থেকে যাবে না; বরং সে দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পর চিরস্থায়ী জান্নাত লাভ করবে। অন্য এক হাদিসে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পড়ার কারণে আল্লাহর কাছে দোয়া করার সময় পায় না তাহলে আল্লাহতায়ালা তার সব হাজত পুরা করে দিবেন।’ আমাদের সব হাজত পুরা করার ক্ষেত্রে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর বেশি বেশি দরুদ পড়ার কোনো বিকল্প নেই।

হযরত উবাই ইবনে কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, একদা আমি আরয করলাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমি আপনার নামে অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করি; অতএব দরুদ পাঠের জন্য আমি কতটুকু সময় নির্দিষ্ট করব? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘যতটুকু তুমি চাও’। আমি বললাম, ‘এক চতুর্থাংশ সময়’। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  বললেন, ‘যতটুকু তুমি চাও’। আর যদি আরো বেশি কর, তবে তোমার জন্য ভালো হবে। আমি বললাম, অর্ধেক সময়? নবীজি বললেন, ‘যতটুকু তুমি চাও’। আর যদি আরো বেশি কর, তবে তা তোমার জন্য ভালো হবে। আমি বললাম,‘তবে দুই তৃতীয়াংশ সময়’। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘যতটুকু তুমি চাও’। আর যদি আরো বেশি কর, তবে তা তোমার জন্য ভালো হবে। আমি বললাম, আমি আপনার ওপর দরুদ পাঠের জন্য আমার সমুদয় সময় নির্দিষ্ট করব। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তবে তোমার যাবতীয় সমস্যা সমাধানের জন্য যথেষ্ট হবে এবং তোমার দিন ও দুনিয়ার সব উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে। আর তোমার সব গোনাহ মাফ হবে। (তিরমিযী)। অন্যত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমার সুপারিশের পূর্বে কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। কিন্তু যারা আমার ওপর সব সময় দরুদ শরিফ পাঠ করেছে, তারা আমার সুপারিশের পূর্বেই জান্নাতে চলে যাবে। তাদের জন্য আমার কিছুমাত্র সুপারিশের প্রয়োজন হবে না। (সহিহ মুসলিম)।

শুধু তাই নয়, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরুদ পড়া, কেয়ামতের ভয়াবহ আযাব থেকে মুক্তির ওসিলা হবে। হাদিসে পাকে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  ইরশাদ করেন, ‘কেয়ামতের ময়দানে ওই সব বান্দা আমার অতি নিকটে থাকবে যারা আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করবে।’(তিরমিযী শরিফ)। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর যে যত বেশি দরুদ পাঠ করবে, হাশরের ময়দানে ওই ব্যক্তি তত বেশি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকটে থাকবে। সুহবানাল্লাহ।

এর চেয়ে পরম সৌভাগ্য আর কী হতে পারে যে আমাদের হাশর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হবে। হাশরের ময়দানের সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে যখন সব নবীরা পর্যন্ত ‘ইয়া নাফসি’ ‘ইয়া নাফসি’ করতে থাকবে। সেই বিভীষিকাময় অবস্থায় যদি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হাশর হয়, তাহলে এর চেয়ে বড় নেয়ামত আর কী হতে পারে? তাই আসুন আমরা সবাই বেশি বেশি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরুদ পাঠ করি। চলতে-ফিরতে, উঠতে-বসতে, নিজের কাজকর্ম করা অবস্থায়, সব ক্ষেত্রেই দুরুদের আমল করি। অহেতুক, অযথা কথা না বলে দুরুদের অভ্যাস গড়ে তুলি। এর দ্বারা আল্লাহতায়ালা আমাদের দুনিয়া-আখেরাত সুন্দর ও আরামদায়ক করে দেবেন। এই দুরুদের বরকতে আমাদের সব পেরেশানি আল্লাহতায়ালা দূর করে দেবেন। সব হাজত পুরা করে দেবেন। আল্লাহরাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : পরিচালক, জামিয়া শায়খ আরশাদ মাদানী, বাংলাদেশ

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads