জাতীয়

রাক্ষুসে প্রিপেইড মিটার

  • ''
  • প্রকাশিত ২৮ জুন, ২০২৪

এম এ বাবর:

বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার যেন ভোগান্তির এক যন্ত্র। ডিজিটাল থেকে প্রিপেইড মিটার বসানোর পর থেকেই দেশজুড়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল কাটার অভিযোগ গ্রাহকদের। আপত্তি ডিমান্ড চার্জ নিয়েও।

হিসাব ছাড়াই কেটে নেওয়া হয় টাকা। বেশি টাকা রিচার্জ করলেও গ্রাহক ব্যবহার করতে পারেন কম। এদিকে ভুতুড়ে বিলের অভিযোগ অনেক পোস্টপেইড গ্রাহকের। অভিযোগ দিয়েও দিনের পর দিন বিদ্যুৎ অফিসে ঘুরে সমাধান পান না গ্রাহক। ফলে বিলের অস্বচ্ছতা বন্ধে গ্রাহকদের অভিযোগ পৌঁছেছে উচ্চ আদালত পর্যন্ত। এরই মধ্যে গ্রাহকের অভিযোগ তদন্তে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

সম্প্রতি দেশ জুড়ে আলোচনায় আসে রাঙ্গামাটিতে দিনমজুরের স্ত্রী শাবানা বেগমের রাক্ষুসে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে। রাঙ্গামাটি সদরের পুরানপাড়া এলাকার বাসিন্দা শাবানা বেগম। স্বামী দিনমজুর এবং তিনি গৃহিণী। গত কয়েক মাস আগে তার বাসায় বিদ্যুৎ অফিসের লোকজন গিয়ে প্রিপেইড মিটার লাগিয়ে দিয়ে আসে। প্রিপেইড মিটার লাগানোর পর তার বকেয়া ইউনিটের কারণে ১১০০ টাকা বিদুৎ বিল আসে এবং তার পরের মাসেই বিদ্যুৎ বিল আসে ৬৪ হাজার টাকা। এভাবেই শহরের পুরানপাড়া, জালিয়াপাড়া, ইসলামপুর এলাকার শতাধিক বিদ্যুৎ গ্রাহক শিকার হয়েছেন হাজার হাজার টাকার ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের।

প্রিপেইড মিটারে টাকা ভরতেই নেই হয়ে যাচ্ছে। দ্বিগুণ, তিন গুণ পর্যন্ত টাকা কেটে নেওয়ায় দিশেহারা গাজীপুরের টঙ্গীর ডেসকোর গ্রাহকরা। টঙ্গীর বাসিন্দা জহিুরুল ইসলাম বলেন, প্রিপেইড মিটারে আগের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বিল বেশি হচ্ছে। মিটারে টাকা ভরতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিদ্যুৎ অফিসের কেউ তার কারণ জানে না। ডেসকো অফিসে ঘুরে ঘুরেও কর্তৃপক্ষও কোনো সমাধান দিচ্ছে না। টঙ্গীর আরেক গ্রাহক সোহেব আহমেদ বলেন, ছোট একটা ফ্ল্যাটে আগে এক হাজার টাকা খরচ হতো। এখন দুই থেকে তিন হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। ডেসকোতে অভিযোগ করেও লাভ হচ্ছে না। আমরা সাধারণ মানুষ এখন যাব কোথায়?

রাজধানীর মুগদাপাড়া এলাকার প্রায় অধিকাংশ ভবনে গেল ফেব্রুয়ারিতে প্রিপেইড বৈদ্যুতিক মিটার বসিয়েছে বিতরণ কোম্পানিগুলো। এর পর থেকেই পরবর্তী তিন মাসে বিদ্যুৎ বিলের পরিমাণ দ্বিগুণ বেড়েছে বলে অভিযোগ গ্রাহকদের। মুগদা, মালিবাগ, খিলগাঁও, উত্তরা এলাকার স্থানীয়রা বলছেন, পোস্টপেইড মিটারে যেখানে এক মাসে বিল আসতো হাজার টাকার নিচে, সেখানে প্রিপেইড মিটার বসানোর পর এক হাজার টাকা রিচার্জ করলে ফুরিয়ে যাচ্ছে এক সপ্তাহেই। তারা বলেন, আগে বিল আসতো ৩০০-৫০০ টাকা। আর এখন বিল দ্বিগুণের চেয়েও বেশি আসে। ১ হাজার টাকা রিচার্জ করলে মিটার চার্জ নিয়ে যায়। ৭০০-৮০০ পাওয়া যায়। বাকি টাকা পাই না। অর্ধেক টাকার কোনো হুদিস নেই।

সম্প্রতি এমনই একটি অভিযোগ করেন জেহাদ হোসেন চৌধুরী নামের এক গ্রাহক। তিনি তার ফেসবুকে প্রিপেইড মিটারে টাকা রিচার্জের এসএমএসসহ একটি পোস্ট করেন। জেহাদ হোসেন চৌধুরী সেখানে লিখেন, ‘এইভাবে গরিবের গলা কাটা কতটা যৌক্তিক? ২২ এপ্রিল দুপুর পৌনে দুইটায় ৩ হাজার টাকার রিচার্জ করে মাত্র ৬ দিন না যেতেই ব্যালেন্স শেষ! এপ্রিল মাসে (মাত্র ২৮ দিনে) আমার ৬ হাজার টাকা সাবাড় করে দিয়েছে রাক্ষুসে প্রিপেইড মিটার।’

তার ওই পোস্টের নিচে বেশ কয়েকজন কমেন্ট করেছেন। যারা নিজেরাও এমন ভুক্তভোগী বলে উল্লেখ করেন সেখানে। এর মধ্যে জহিরুল হক সানি নামের একজন লিখেছেন, ‘আমার বাসায়ও সেইম অবস্থা। পরে বিদ্যুতের এক কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানলাম মাসের শেষ দিকে বিদ্যুতের বিল একটু বেশি কাটে। প্রথম দিকে কম কাটে। মাসের প্রথম দিকে ৩ হাজার টাকায় যদি তিন দিন যায় তাহলে শেষ দিকে যাবে মাত্র একদিন। গত পাঁচ-ছয় মাস ধরে এমনটাই হচ্ছে বলে ওই কর্মচারী জানিয়েছেন। এমএইচ রবিন নামের একজন লিখেছেন, ‘স্মার্ট চোর। কার কাছে বিচার দিব। বিচার কে করবে? একটা মিটার কিনতে হয় পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকায়। এটা অফিস থেকে সিস্টেমে অনুমোদন করে আনতে লাগে আরো আট-দশ হাজার। এরপর প্রতি মাসে বিল ঢুকানোর সময় বলে ‘মিটার রেন্ট’। আমার মিটার, আমাকেই আবার ভাড়া দিতে হয়। কি আজব! এমন অনেকেই ওই পোস্টের নিচে তাদের ক্ষোভের বিষয়টি তুলে ধরেন।

জেহাদ হোসেন চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানান, তারা সব মিলে সংসারে লোক তিন জন। সারাদিন একটি রুমে এসি চলে। আর রাত ৯টার পর দুই রুমে এসি ও ফ্যান চলে। এর বাইরে অতিরিক্ত ফ্যান লাইটের তেমন ব্যবহার নেই। এত কম বিদ্যুৎ পুড়িয়ে এতো টাকা বিল হওয়ার কথা নয়। এটি স্রেফ চুরি।

একজন গ্রাহক ৭৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে তার বিল আসবে ৩৯৪ টাকা। আর ১ হাজার ইউনিট ব্যবহার করলে ধাপে ধাপে বেড়ে তার বিল দাঁড়াবে ১২ হাজার ৬৬০ টাকা। এর মধ্যে প্রথম ৭৫ ইউনিট ৩৯৪ টাকা, পরবর্তী ১২৫ ইউনিট ৯০০ টাকা, তৃতীয় ধাপের ১০০ ইউনিট ৭৫৯ টাকা, চতুর্থ ধাপের ১০০ ইউনিট ৮০২ টাকা, পঞ্চম ধাপের ২০০ ইউনিট ২ হাজার ৫৩৪ টাকা, আর ৬০০ ইউনিট থেকে পরবর্তী প্রতি ইউনিটের জন্য গুণতে হবে ১৪ টাকা ৬১ পয়সা। অর্থাৎ, ৫ টাকা ২৬ পয়সার ইউনিট বেড়ে হবে সাড়ে ১৪ টাকা। সেই সঙ্গে ধাপে ধাপে বড় হবে বিদ্যুৎ বিলের অংক। ১১ হাজার ২৩৩ টাকার বিলের সঙ্গে যোগ হবে ২১০ টাকা ডিমান্ড চার্জ, ৪০ টাকা মিটার ভাড়া, ৫ শতাংশ ভ্যাট, বিলম্ব হলে মোট বিলের আরও ৫ শতাংশ। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো বলছে, এই হিসাবের বাইরে এক টাকাও বাড়তি নেওয়ার সুযোগ নেই তাদের। আর মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ নির্ধারণে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, ভোক্তাকে যদি সন্তুষ্ট করা না যায়, তাহলে অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে বলা যাবে না। চার্জ আগে দিয়ে রাখলে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ গ্রাহক খরচ করবে তার বিল দিবে।

গ্রাহকের টাকা কেটে নেওয়ার সমালোচনা করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী বলেন, পুরো প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তা খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ প্রিপেইড মিটারের বিলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষ।

এদিকে বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার নিয়ে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে কেন নির্দেশনা দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। গত ১০ জুন বিচারপতি মো. মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি এস এম মাসুদ হোসেন দোলনের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেন।

গত ৬ জুন জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুতের বিলিং প্র্যাকটিস পর্যালোচনা ও নিরীক্ষা, স্বচ্ছতা, অতিরিক্ত চার্জের রিফান্ড, জনসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নীতি সংস্কার করার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সচিব, পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন, বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, ডেসকো, ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি ও ডিপিডিসির কর্তৃপক্ষকে রিটে বিবাদি করা হয়েছে।

এর আগে করোনাকালে বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিলের অভিযোগ উঠেছিল। ওই ঘটনায় সবগুলো বিতরণ কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছিল বিদ্যুৎ বিভাগ। কর্তৃপক্ষ বলছে, সরকার নির্ধারিত বিলের বাইরে এক টাকাও অতিরিক্ত কেটে রাখার সুযোগ নেই।

ডেসকো নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন বলেন, মিটারের ডিমান্ড চার্জ ১ টাকাও বাড়েনি। মন্ত্রণালয় থেকে কমিটি করা আছে। উনারা প্রতি মাসে সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে যে কারো অস্বাভাবিক বিল আছে কি না। আর ভুতুড়ে বিল খুবই কম। চাইলে ওয়েবসাইটে আইডি খুলে বিস্তারিত তথ্য গ্রাহকরা জানতে পারবেন। তবে প্রিপেইডে যে টাকা কেটে রাখা হচ্ছে, পোস্টপেইড বিলের মতোই তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব চান গ্রাহকরা। আপত্তি ডিমান্ড চার্জে নিয়েও।

বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মো. হাবিবুর রহমান জানান, যে কোনো বিষয় নতুন করে বাস্তবায়ন করতে গেলে অনেক ধরনের বিভ্রান্তি থাকে। আমার মনে হয়, ভুল বোঝাবুঝির কারণে এগুলো হয়েছে। তবে অতিরিক্ত বিলের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সত্যতা পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, আমার ৪ কোটি মিটারের মধ্যে ১০টা মিটারে সমস্যা হতেই পারে। এ নিয়ে গাফিলতি হলে আগেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গ্রাহকরা সঠিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগ জানালে এখনও সে পথ খোলা আছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads