আবদুল খালেক মন্টু
মানুষের দুটি সত্তা, দৈহিক ও মানসিক। এই দুটি সত্তার বিকাশ সমান না হলে পরিপূর্ণ মানুষ হওয়া যায় না। কোনো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য বলা হয়, এটা কোনো ছেলেখেলা নয়। ছেলেমেয়ে বা যুবকযুবতীরা খেলাধুলা করে সত্য, কিন্তু তাই বলে বিষয়টিকে হালকাভাবে নেয়া উচিত নয়। ছেলেমেয়েদের মানসিক উৎকর্ষ লাভের জন্য যেমন শিক্ষার জন্য বিদ্যালয় প্রয়োজন, তেমনি দৈহিক উৎকর্ষ লাভের জন্য খেলা ও খেলার মাঠ প্রয়োজন। তাই আগের যুগে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রধান শর্ত ছিল খেলার মাঠ। লেখাপড়া ও খেলাধুলা মন ও শরীর গঠনের জন্য অপরিহার্য অনুষঙ্গ। স্বাস্থ্য শাস্ত্রের মতে, শরীরের সঙ্গে মনের গভীর সম্পর্ক। শরীর ভালো না থাকলে মন ভালো থাকে না। আবার মন ভালো থাকার অন্যতম শর্ত হলো স্বাস্থ্য ভালো থাকা। তাই খেলাকে ছেলেখেলা বলা যুক্তিযুক্ত নয়। বরং খেলার গুরুত্ব মানুষের জন্য অপরিসীম। খেলাধুলা, শরীরচর্চা বা ব্যায়াম - যোগব্যায়াম, পিটিপ্যারেড, স্পোর্টসের বিভিন্ন ইভেন্ট, সাঁতার, সার্কাস ও জিমন্যাস্টিকসের আবশ্যকতা লেখাপড়া বা জ্ঞানার্জনের মতো শিশুকাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সমানভাবে প্রয়োজনীয়।
রাজনীতি ও ধর্ম যা করতে পারছে না, সংস্কৃতি ও খেলাধুলা তা পারছে। রাজনীতি, সাহিত্য ও ধর্ম, সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। কিন্তু প্রচলিত রাজনীতি নির্মোহ বা নীতির মধ্যে সেরা বা রাজা হতে পারছে না। তাই রাজনীতির নামে মানুষে মানুষে ঐক্যের পরিবর্তে বিভেদ বিভ্রান্তির জন্ম হচ্ছে। মারামারি, খুনাখুনি, যুদ্ধবিগ্রহ ও দখল বাণিজ্য ছাড়া কল্যাণকর কিছু হচ্ছে না। তাই রাজনীতি দিয়ে বিশ্বজয় সম্ভব হচ্ছে না। ধর্মের উদ্দেশ্য মানুষের মানবতার জয়গান গাওয়া। ধর্মের সেই আসল উদ্দেশ্য আজ বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। ধর্মে ধর্মে কোনো বিরোধ না থাকলেও তথাকথিত ধার্মিকে ধার্মিকে বিরোধ হচ্ছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যেমন মসজিদ, মন্দির, গির্জা বা উপাসনালয়গুলোকে জাঁকজমকপূর্ণ, আকর্ষণীয়, সুন্দর ও আরামদায়ক করা হচ্ছে। কিন্তু মানুষের মন বা হূদয়কে তা করা সম্ভব হয়ে উঠছে না। বরং ধর্মকে কুৎসিত করার জন্য ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে উসকানো হচ্ছে। ধর্মের নামে হিংসা-বিদ্বেষ, মারামারি ও খুন হত্যা পর্যন্ত করা হচ্ছে। ধর্ম দিয়ে বিশ্ব জয় করা সম্ভব হচ্ছে না। সাহিত্য মানুষের হূদয়কে রঞ্জিত করে। মানুষের মহত্ত্বগুলোকে প্রকাশ করে। কিন্তু সেখানেও দুর্বলতা আছে। অনেক সময় সাহিত্য সাম্প্রদায়িক উসকানি ও বিভেদবিভ্রান্তির জন্ম দিচ্ছে। সাহিত্যের সৃজনশীল শক্তি তাই আশানুরূপ কাজ করতে পারছে না। তা ছাড়া সমাজের অধিকাংশ মানুষ সাহিত্যের ধারে কাছেও নেই। সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম যারা উপহার দিচ্ছেন, তাঁরা মনন চর্চা করলেও অনেকে শরীর চর্চা করছেন না। সাহিত্যের ক্ষেত্রে সবল হলেও দৈহিকভাবে দুর্বল থাকছেন। তা ছাড়া বিশ্বসাহিত্যের ক্ষেত্রে যারা অবদান রাখছেন, তারা অনেক সময় অবিচার বা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
একমাত্র খেলা দিয়েই বিশ্ব জয় করা সম্ভব হচ্ছে। মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা এনে দিচ্ছে খেলা। একজন খেলোয়াড়কে অবশ্যই শারীরিক ও মানসিকভাবে ফিট হতে হয়। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আজ খেলার অবদানই অধিক। বিশ্ববাসীকে এক কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে খেলা। দেশ-জাতি, ধর্ম-বর্ণ ও শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ আজ খেলার আসরে একাকার হয়ে যাচ্ছে। খেলার কাছে হিংসা-বিদ্বেষ ও বৈষম্যের উপাসকরা হার মানতে বাধ্য হচ্ছে। সারা পৃথিবীর মানুষের মন বা হূদয় জয় করছে খেলা। সুতরাং একমাত্র খেলাই যে বিশ্ব জয় করতে সক্ষম হচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তা ছাড়া পৃথিবীতে যেসব জাতি মানসিক ও শারীরিকভাবে উন্নত, তারাই সুন্দর ও উন্নত জাতি। খেলায় জয়-পরাজয় থাকবেই। একদলের কাছে অন্য দলের হার অবধারিত। কিন্তু অন্য বিষয়গুলোর মতো খেলায় কোনো বিরোধ বা বিতর্ক হয় না। পরস্পর হাত ধরাধরি ও কোলাকুলি করে বিদায় নেয়। অসম্ভব সুন্দর এই সৌহার্দ্য।
মানুষের বুদ্ধিমত্তা এ জগতে একমাত্র, চেতনা বা বোধে মানবজ্ঞানই এ পর্যন্ত একক ও অনন্য। একাগ্রচিত্তে মানুষ যদি কিছু পেতে চায় এবং পাওয়ার জন্য সাধনা চালায় অবশ্যই তা পায়। যেমন- মানুষ কিশোর বয়স থেকে শরীর গঠনের ব্রতী হলে সুঠাম দেহের অধিকারী হতে পারে। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রে সিদ্ধিলাভের জন্য সাধনার কোনো বিকল্প নেই। একজন বিশ্বমানের খেলোয়াড় হওয়ার জন্য নিয়মিত অনুশীলন করতে হয়, কঠোর সাধনার প্রয়োজন হয়। তারপরই কেবল ওই খেলোয়াড়ের পক্ষে শিল্পসম্মত ও নান্দনিক খেলা উপহার দেওয়া সম্ভব হয়।
বিশ্বকাপ ফুটবল খেলায় সাধারণ অংশ নিয়ে থাকে ৩২টি দেশ। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পৃথিবীসুদ্ধ মানুষ। দেখা গেছে বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে সীমাহীন আবেগ-উত্তেজনা-উন্মাদনা। যে আবেগে অনেকেই ভুলে গেছেন নিজেদের ভৌগোলিক পরিচয়। বিশ্বের কয়েকশ কোটি মানুষ লীন হয়ে যান এক আত্মায়, ফুটবল আবেগে ভাসতে থাকেন, সবাই হয়ে যান ফুটবল প্রেমিক। কী অসম্ভব ক্ষমতা ফুটবল খেলার, গোটা বিশ্বের মানুষকে একবিন্দুতে এনে দাঁড় করাতে পারে ভালোবাসা দিয়ে। আর সে ভালোবাসার নাম বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা।
ফুটবল খেলাকে ভালোবেসে কোটি কোটি মানুষ আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলকেই ভালোবেসে ফেলেছে। আর্জেন্টিনা নামের দেশটির যে জনসংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি সমর্থক রয়েছে বাংলাদেশে। আর ব্রাজিল বলে তো এদেশের সমর্থকরা অন্ধ-পাগল। আবার পাঁচবার বিশ্বকাপজয়ী দলটির নামও ব্রাজিল। গত শতাব্দীতে শুধু নয়, এই শতাব্দীতেও তারা কাপ জিতেছে। কিন্তু কাপ তো জার্মানিও জিতেছে দুই শতাব্দী মিলে চারবার। ইতালি জিতেছে চারবার। কিন্তু বাঙালির হূদয় স্পর্শ করতে পারেনি দেশ দুটি। মাত্র দুবার বিশ্বকাপ জিতেছে আর্জেন্টিনা, তাও গত শতাব্দীতে। অথচ ওই দেশটির সমর্থক এ দেশে সবচেয়ে বেশি। তারা জানেন পেলে নামের একজন ফুটবল সম্রাটের কথা, তাঁর দেশ ব্রাজিল। সেই সম্রাটের সাম্রাজ্যের অর্ধেক মালিক এখন ম্যারাডোনা নামের এক আর্জেন্টাইন। পেলের খেলা দেখার সৌভাগ্য না হলেও ম্যারাডোনার খেলা অনেকেই দেখেছেন গত শতাব্দীর শেষের দিকে, যাকে পেলে-পরবর্তী প্রজন্ম ফুটবলের রাজপুত্র বলে মনে করেন। হাজার হাজার পৃষ্ঠার গ্রন্থ লিখে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা যা করতে পারবে না অথবা কোটি টাকার বিজ্ঞাপন প্রচার করে ল্যাটিন আমেরিকার ওই দেশ দুটি যা করতে পারবে না, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি তুলে ধরতে পেরেছেন পেলে ও ম্যারাডোনা। তবে পরিবর্তনশীল বিশ্বে ফুটবল খেলায়ও যে পরিবর্তন আসবে এটাই স্বাভাবিক।
লেখক : প্রাবন্ধিক





