‘যক্ষা হলে রক্ষা নাই’-এই কথার এখন আর কোনো ভিত্তি নাই। দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসা নিলে যক্ষ্মা রোগ সম্পূর্ণভাবে নিরাময় হয়, মৃত্যুঝুঁকি থাকে না বললেই চলে। গত এক দশকে দেশে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু ৫৬ শতাংশ কমেছে। করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও গতকাল বুধবার পালন করা হয় বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস। আন্তর্জাতিকভাবে এ বছর যক্ষ্মা দিবসের প্রতিপাদ্য ‘কি ক্লক ইজ টিকিং, ইটস টাইম টু কিপ আওয়ার প্রমিসেস, ইটস টাইম টু অ্যান্ড টিবি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর মাহেন্দ্রক্ষণে বাংলাদেশে এবারের যক্ষ্মা দিবসের প্রতিপাদ্য হলো ‘মুজিববর্ষের অঙ্গীকার যক্ষ্মা মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার’। করোনার কারণে রাজধানীসহ সারা দেশে এ বছর সীমিত পরিসরে বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস পালিত হয়। ২০১০ সালে যক্ষ্মায় আক্রান্ত প্রতি এক লাখ রোগীর মধ্যে মৃত্যু হতো ৫৪ জনের। এক দশক পর ২০২০ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ২৪ জনে। শতাংশের হিসাবে এক দশকে যক্ষ্মা রোগীর মৃত্যু কমেছে ৫৬ শতাংশ। ২০২০ সালে দেশে নতুন রোগী শনাক্ত হয় দুই লাখ ৯২ হাজার ৯৪০ জন। চিকিৎসা নিরাময়ের হার গত ১০ বছর যাবৎ ৯৫ শতাংশ থাকলেও করোনার বছরে নিরাময় হার এক শতাংশ বেড়েছে।
যক্ষ্মা বাংলাদেশের জন্য একটি অন্যতম মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের উচ্চ যক্ষ্মাপ্রবণ ৩০টি দেশে ৮৭ শতাংশ রোগী রয়েছে। শীর্ষ আটটি দেশে মোট যক্ষ্মা রোগীর দুই-তৃতীয়াংশ রোগী রয়েছে। এ আটটি দেশ হলো ভারত, ইন্দোনেশিয়া, চীন, ফিলিপাইন, পাকিস্তান, নাইজেরিয়া, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ আফ্রিকা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, ২০২০ সালে যক্ষ্মার উপসর্গ আছে বা সম্ভাব্য উপসর্গ আছে এমন ২৭ লাখ রোগীকে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আগাম পরীক্ষার ফলে রোগ চিহ্নিত ও দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আসার ফলে গত দশকে প্রায় ১০ লাখ মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরিচালক অধ্যাপক ডা. সামিউল ইসলাম সাদি জানান, ১৯৯৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যক্ষ্মাকে গ্লোবাল ইমার্জেন্সি ঘোষণার পর থেকেই সরকার ও কিছু বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশে যক্ষ্মার প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বর্তমানে স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি যক্ষ্মা নির্মূলে ও যক্ষ্মার প্রকোপ নিয়ন্ত্রণ-সম্পর্কিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সরকার দেশের সব নাগরিকের জন্য বিনা মূল্যে যক্ষ্মা শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা প্রদান করছে।
যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা, মৃত্যু ও সংক্রমণের হার হ্রাস করাই এসব কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০১৫ সালের পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যক্ষ্মা মহামারীকে আলোকপাত করতে নতুন কৌশল অনুমোদন করে যাতে ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্ব থেকে যক্ষ্মায় মৃত্যুহার ৯৫ শতাংশ (বেজ লাইন ২০১৫ সালের তুলনায়) কমাবে এবং নতুনভাবে সংক্রমিত রোগীর হার ৯০ শতাংশ (বেজ লাইন ২০১৫ সালের তুলনায়) কমিয়ে আনবে।
রাজধানীর শ্যামলীতে ২৫০ শয্যার বিশেষায়িত যক্ষ্মা হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার বলেন, দ্রুত শনাক্ত হলে এ রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় হয়। জনসচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সম্প্রতি এ হাসপাতালে ওয়ান স্টপ টিবি সেন্টার উদ্বোধন হয়েছে। এ কার্যক্রমের আওতায় রোগীদের উন্নত চিকিৎসাসেবা, বায়োসেফটি লেবেল-২ ল্যাবরেটরি স্থাপন, ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা রোগীদের ভর্তির ব্যবস্থা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে দক্ষ জনবল গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকার বিনা মূল্যে যক্ষ্মা রোগীদের চিকিৎসা প্রদান করছে। উল্লেখ্য, ১৮৮২ সালে ২৪ মার্চ ডা. রবার্ট কক যক্ষ্মা রোগের জীবাণু মাইক্রোব্যাটেরিয়াম টিউবারকিউলসিস আবিষ্কার করেন। যক্ষ্মা রোগের জীবাণু আবিষ্কারের ১০০ বছর পর ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ জীবাণু আবিষ্কারের দিনটিকে স্মরণীয় করা ও যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর ২৪ মার্চ বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস পালিত হচ্ছে।





