মুক্তমত

মৌসুমে পেঁয়াজ আমদানি আর নয়

  • প্রকাশিত ৭ জানুয়ারি, ২০২১

অনিল মো. মোমিন

 

 

 

নিত্যদিনের রান্নায় একটি অতি প্রয়োজনীয় সুস্বাদু মসলার নাম পেঁয়াজ। স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এই মসলাটি রান্না ছাড়াও বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। পেঁয়াজের গুরুত্ব ও গুণাগুণ অপরিসীম। শুধু এ সময়ে নয়; আদিকাল থেকেই ব্যাপক প্রতাপ পেঁয়াজের। শোনা যায়, ব্রোঞ্জ যুগে মিসরীয়দের কাছে পেঁয়াজ ছিল পূজনীয়। প্রাচীন মিসরীয়রা সমাধিতে পেঁয়াজ রাখত। আবার মধ্যযুগে মুদ্রার বদলে বিনিময় হতো পেঁয়াজ। সামাজিক উৎসব অনুষ্ঠানে পেঁয়াজ উপহার দেওয়ার প্রচলন ছিল বলেও জানা যায়। কাটতে গিয়ে পেঁয়াজের ঝাঁজে চোখে জল এলেও সাম্প্রতিককালে ‘পেঁয়াজের ঝাঁজ’ বলতে আমরা পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিকে বুঝি। সময়ের সাথে সাথে পেঁয়াজের ঝাঁজ বাড়ে। তবুও পেঁয়াজের চাহিদা বরাবরের মতোই।

আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০-৩২ লাখ টন পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে। এর দুই-তৃতীয়াংশ দেশের কৃষকরা জোগান দিলেও বাকিটা পূরণ করতে অন্যান্য দেশে থেকে আমদানি করা লাগে। ঘাটতি মেটাতে যা আমদানি করতে হয় তার ৮০-৯০ ভাগই  আসে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে। ফলে ভারত নির্ভরতার জন্য আমাদের পেঁয়াজের বাজার মাঝে মাঝে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত। ভারতের যাচ্ছেতাই সিদ্ধান্তের ভুক্তভোগী হয় এ দেশের সাধারণ মানুষ। আলাপ-আলোচনা ছাড়া বিনা মৌসুমে ভারত প্রায়ই হুট করে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। ভারতের জন্যই ২০১৯ সালে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম ৩০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। পেঁয়াজের এই ত্রিশতক দেশে প্রথম। এর আগে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে দেশি পেঁয়াজের কেজি ১৪০ টাকায় উঠেছিল। তখন সেটাই ছিল এযাবৎকালের সর্বোচ্চ দর। দিশেহারা ভোক্তারা কেউ কেউ চাহিদা কমিয়েছেন, কেউবা  পেঁয়াজ খাওয়া ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। পেঁয়াজ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয় অফলাইন থেকে অনলাইনে, ওয়াজ মাহফিল থেকে সংসদে। সরকার বাজার সামাল দিতে ব্যর্থ হয়। এরূপ পরিস্থিতিতে সেই বছর প্রধানমন্ত্রী নয়াদিল্লি সফরে গিয়ে বলে এসেছেন ভারত যেন আমাদের জানিয়ে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে। তবুও কার্যকর কিছু হয়নি। এরপরও ভারত হঠাৎ করেই কোনো কিছু না জানিয়ে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিল। সর্বশেষ গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে।

পেঁয়াজ নিয়ে ভারতের সাথে এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে দেশে উৎপাদন বৃদ্ধিতে মনোযোগ দেওয়া হয়। উৎপাদন বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিতে সরকার কৃষকদের উৎসাহিত করে পাশাপাশি বিভিন্ন প্রণোদনা দেয়। অন্যদিকে ভারতের পেঁয়াজ বন্ধ থাকায় কৃষকরা পেঁয়াজের ন্যায্য দাম পান। ফলে কৃষকরা অন্যান বছরের তুলনায় ক্রমান্বয়ে পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়াচ্ছেন। যেমন নাটোর জেলায় ২০১৯ সালে ৬০ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। ২০২০ সালে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৭২ হাজার টনে। জেলা কৃষি বিভাগ বলছে ২০২১ সালে নাটোরের পেঁয়াজ উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ৮০ হাজার টন। ২০১৯ সালের সংকটের পর সারা দেশের পেঁয়াজ উৎপাদনের চিত্র এমনই। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে গত বছর দেশে ২৫ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। বাকি ঘাটতি পূরণের জন্য সরকারও বিকল্প বাজার খুঁজে নিয়েছে। পাকিস্তান, মিয়ানমার, চীন, মিসর ও তুরস্কসহ আটটি দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। ফলে ভারতের পেঁয়াজ ছাড়াও আমাদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। এ বছরেও দেশে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। এ ছাড়া সংকটকালীন সময়ে ২ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানির ১ লাখ টন দেশে এসে পৌঁছেছে। একদিকে ভরা মৌসুমে বাম্পার ফলন অন্যদিকে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আনা কোটি কোটি টাকার পেঁয়াজ বন্দরে খালাসের অপেক্ষায়, যা চাহিদা মিটিয়ে মজুতও বৃদ্ধি করা যাবে।

দেশের পেঁয়াজের বাজার যখন স্বাভাবিক, যখন দেশীয় পেঁয়াজে ভরা মৌসুম, যখন কৃষক তার পরিশ্রমের ন্যায্যমূল্য পাবে তখন খবর এলো ভারত ২৮ ডিসেম্বর থেকে পেঁয়াজ রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। ফলে  জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে দেশে আমদানি হচ্ছে পেঁয়াজ। স্বাভাবিকভাবে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির খবর আমাদের দেশে পেঁয়াজের বাজারে খুব প্রভাব ফেলে। পেঁয়াজ আমদানির খবরে ইতোমধ্যে দরপতন শুরু হয়েছে বাজারে। আর দরপতনে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে যাচ্ছে দেশীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। গত বছর পেঁয়াজের ভালো দাম পেয়ে অনেক কৃষকই ঋণ নিয়ে এবার পূর্বের তুলনায় অধিক জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদন করে। পেঁয়াজ উৎপাদনে যে খরচ তাতে  কৃষককে প্রতি কেজি অন্তত ৩০ টাকা বিক্রয় করতে হবে। কিন্তু চলমান পরিস্থিতিতে পাইকাররা এত দামে পেঁয়াজ কিনতে চাইবেন না। ভারতের পেঁয়াজ ঢুকলে দেশি পেঁয়াজের দাম আরো কমতে থাকবে। ফলে কৃষকের মাথায় হাত দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। আর কৃষক যদি ক্ষতির সম্মুখীন হয় তবে পেঁয়াজ উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। 

এছাড়া সংকটকালীন সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিকারকরা একযোগে বিপুলসংখ্যক পেঁয়াজ আমদানি করে; যা চাহিদার তুলনায় বেশি হওয়ায় পেঁয়াজের দাম কমতে থাকে। ফলে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ে। উপরন্তু পেঁয়াজের ভরা মৌসুমে দাম আরো কমতে থাকায় তাদের ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে। এরপর যদি ভারতের পেঁয়াজ আসতে থাকে তবে তারা বিপুল ক্ষতির মুখে পড়বে। এক কথায় চলমান অবস্থায় ভারতের পেঁয়াজ এলে দেশের সংকটে এগিয়ে আসা আমদানিকারক ও কৃষকরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অতীতেও আমরা দেখেছি প্রয়োজনের সময় ভারত রপ্তানি বন্ধ রেখে মৌসুমে পেঁয়াজ রপ্তানি করে দেশের চাষিদের মাথায় বাড়ি দিতে। মূলত ভারত বাংলাদেশের পেঁয়াজের বাজার নিয়ে খেলছে। শীতকালীন দেশি পেঁয়াজে বাজার এখন সয়লাব। জানুয়ারি থেকে আবারো পেঁয়াজ বপনের সময়। বিপুল উৎপাদন সম্ভাবনা নিয়ে যখন কৃষক প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন আমাদের কৃষকদের পেঁয়াজ চাষে নিরৎসাহিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে ভারত। মৌসুমে পেঁয়াজ দিয়ে দেশের কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করাই যেন তাদের প্রধান লক্ষ্য। লোকসান মেনে নিতে না পেরে স্বাভাবিকভাবে কৃষকরা উৎপাদনে আসবে না। ফলে ভারত মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে আমাদের। এটাই তারা চায়। সরকারের উচিত হবে মৌসুমে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। আমদানি নিরুৎসাহিত করতে আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে দিতে হবে। ভবিষ্যতেও আমাদের ভারত নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। এখন ভারত ছাড়া বিকল্প বাজার থাকায়  ভোক্তাদের কাছেও এই বার্তা পৌঁছাতে হবে  ভারতের পেঁয়াজ যেন তাদের প্রভাবিত না করে। বিকল্প বাজার থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে তাদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করলে সেটা ভবিষ্যতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। অপরদিকে এতে করে ভারতও আমাদের কোণঠাসা করতে পারবে না। ভবিষ্যতে সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে বৃহৎ স্বার্থে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের কথা ভেবেই এমন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads