তথ্যপ্রযুক্তি, জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিশ্ব তীব্র বেগে এগিয়ে যাচ্ছে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাড়ছে প্রতিযোগিতা। কিন্তু বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কতটুকু সহায়তা করছে— প্রশ্নটা থেকেই যায়? উন্নতমানের শিক্ষা ও তার প্রয়োগের মধ্য দিয়েই একটি জাতি স্বনির্ভর জাতিতে পরিণত হয়। কিন্তু কাল-পরিক্রমায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে গণহারে গ্র্যাজুয়েট বের হলেও তাদের মানের কমতি রয়েই যাচ্ছে। এই কমতি ক্রমাগত বাড়ছে। এই যে অবনতি ও পচনের জয়যাত্রা, এর কারণ অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ করে উত্তরণের পথ বের করতে হবে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কয়েকটি স্তর রয়েছে। তার মধ্যে উচ্চশিক্ষা সর্বশেষ স্তর। এই স্তরে এসে শিক্ষার্থীদের কাজ হলো গবেষণা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে নতুন কিছু সৃষ্টি করা। পরে ব্যক্তি-দেশ-জাতি সর্বোপরি মানবজাতির কল্যাণে তার বিস্তার ঘটানো। কিন্তু সে কাজ এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেকাংশে ব্যর্থ হচ্ছে। এর কয়েকটি কারণ রয়েছে। যেমন— গবেষণার স্বল্পতা, গবেষণার মান কমে যাওয়া, ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়া, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অসম অনুপাত, গবেষণা ও শিক্ষা খাতে অল্প বরাদ্দ ইত্যাদি। যার ফলে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দৃশ্যমান কিছু উন্নতি হলেও অবনতির পাল্লাক্রমে নিচে নামছে। সেজন্য বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা যুগের চাহিদা মেটাতে পারছে না। গণহারে গ্র্যাজুয়েট উৎপাদন হলেও তা কাজে লাগছে না।
বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়কে বিবেচনা করা হচ্ছে। তার মধ্যে ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়া অন্যতম। মেধার বিপরীতে দলীয় বিবেচনা, ভিসিপন্থি নিয়োগ, স্বজনপ্রীতি, নিয়োগবাণিজ্যসহ কিছু উপায়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বঞ্চিত হচ্ছেন মেধাবীরা। যথার্থ পাঠগ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। ২০১৬ সালে ১৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর টিআইবি’র করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আটটি বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রভাষক নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এ পদে নিয়োগে ৩ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। ইচ্ছামতো নিয়োগ বোর্ড গঠন, সুবিধামতো যোগ্যতা পরিবর্তন বা শিথিল করা, জবাবদিহি না থাকার মাধ্যমে এই অনিয়মের শুরু। আর ১৩টির মধ্যে ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ বোর্ড গঠনে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব ঘটানোর সুযোগ বিদ্যমান ছিল। বর্তমানে এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন পত্রিকায় শিক্ষক নিয়োগবাণিজ্যের অডিও ফাঁসসহ টাকা লেনদেনের বিষয়টি উঠে আসে। কিন্তু কে করবে কার প্রতিকার? ফলে অদক্ষ আর যোগ্যতাহীন ব্যক্তিরাই জাতির মেরুদণ্ড তৈরির আসনে বসছে।
প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব পরিচালনা আইন অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে থাকে। কারণ প্রত্যেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিন্ন ভিন্ন নীতিমালা রয়েছে। যার ফলে কেউ মৌখিক পরীক্ষা আর একাডেমিক ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে থাকে। কেউবা গুণাগুণ সম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার জন্য মৌখিক পরীক্ষার পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষা নিয়ে থাকে। এই দুই উপায়ে বর্তমান সময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে। অথচ বর্তমানে দেশের প্রাথমিক স্কুল থেকে শুরু করে বেসরকারি কলেজগুলোতে শিক্ষক নিয়োগের ধারায় লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার নিয়ম চালু রয়েছে। কিন্তু সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এ নিয়ম এখনো চালু হয়নি। আমি উচ্চশিক্ষার সঙ্গে স্কুল-কলেজের নিয়োগ প্রক্রিয়ার তুলনা করছি না। কিন্তু মানের বিষয়টির কথা বলছি। দেশের নামকরা চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে একই আইনে চলছে। তারা ‘বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা আইন-১৯৭৩’ অনুসরণ করে থাকে।
বর্তমানে ৩৮ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এই পরিচালনা আইনের সিংহভাগই অনুসরণ করে। এই ‘৭৩’ অ্যাক্টের ৩৩ ধারায় বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন ও বাজেট নির্ধারণ করবে প্ল্যানিং বা পরিকল্পনা কমিটি। মূলত বিভাগের সভাপতি, জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত প্ল্যানিং কমিটির সুপারিশে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রকাশ করে। পরবর্তীকালে প্রার্থীদের আবেদন যাচাই-বাছাই করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ডিন, বিভাগীয় সভাপতি ও অধ্যাপকদের সমন্বয়ে গঠিত হয় একটি কমিটি। যাকে ৩৪ ধারার (ক) ও (খ) উপধারায় স্পষ্টত সিলেকশন বোর্ড বলা হয়ে থাকে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক নিয়োগে সুপারিশ করবেন। আর চূড়ান্ত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তা করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ হয়। তাহলে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার সরাসরি হস্তক্ষেপ থাকছে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, বিভাগের সভাপতি ও সিন্ডিকেট সভার সদস্যের হাতে। মূলত শিক্ষক নিয়োগের এই ব্যক্তিরাই কলকাঠি নেড়ে থাকেন। নিজের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে অনৈতিক পথে হাঁটতে থাকেন। যার প্রমাণ মিলে হরহামেশাই।
স্বাধীনতা-উত্তর প্রথম সরকারের সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর উপাচার্য নিয়োগের ঘটনা স্মর্তব্য। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক খান সরওয়ার মুরশিদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক আবুল ফজল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. এনামুল হক এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. রশীদকে উপাচার্য হওয়ার জন্য রাজি করিয়েছিলেন। কারণ তাঁদের মধ্যে অনেকে অবসর নিয়েছিলেন। অথচ এখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উপাচার্য থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়োগের জন্য অনুরোধ করা হয় না, বরং তেলামি-চাটুকারী-দালালি ও দলবাজি করা হয়! যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর পর্যায় থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রে দলকানা, দালাল ও চাটুকার শিক্ষকশ্রেণির দল ভারী হচ্ছে। যারা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতার জন্যে আসেননি, এসেছেন রাজনীতির জন্য। শিক্ষকতা সময়ের ফাঁকে কিছুটা করেন। আবার শিক্ষকদের মুখেই শিক্ষাব্যবস্থায় অসাম্প্রদায়িকতা, পরমতসহিষ্ণুতা, ধর্মনিরপেক্ষতা চর্চা ও লালনের বুলি প্রায়ই শুনি। যদি ভিন্নমত লালন, চর্চা ও জ্ঞানার্জন না করা যায় তাহলে এগুলো কি মিথ্যা বলা হচ্ছে না? যার ফলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে বের হচ্ছেন তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যও ঠিক নেই। এই পতন ও পচন থেকে উচ্চ শিক্ষাঙ্গনগুলোকে বাঁচাতে হবে।
তাই দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক নিয়োগ হোক একাডেমিক ফলের পাশাপাশি গবেষণাপত্র, পিএইচডি আর সাইটেনশনের ওপর। দেশের বাইরে অবস্থান করা মেধাবীদের দেশে ফিরিয়ে এনে তাদের গবেষণার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা হোক। শিক্ষক নিয়োগের সংস্কারসহ পরিকল্পিত শিক্ষার মানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থার আরো বেশি উন্নয়ন সাধিত করা হোক। এসব সমস্যার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে গ্র্যাজুয়েট বের হলেও মানসম্মত গ্র্যাজুয়েটের অভাব থেকেই যাচ্ছে। তা না হলে সময়ের পরিক্রমায় দেশে বেকারত্বের হার কেন বাড়ছে? তার কারণ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মানসম্মত ও বাজার চাহিদার আলোকে গ্র্যাজুয়েট উপহার দিতে পারছে না। উপরোক্ত বিষয়াদি সংশোধন না হলে সময়ের পরিক্রমায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান কমে যাবে। সর্বোপরি মেধায় ভর করে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা জাতিকে উন্নতির স্বর্ণশিখরে আসীন করুক। যারা আমাদের উচ্চশিক্ষার কল নাড়েন, তাদের কাছে বিষয়টির গুরুত্ব দাবি করছি।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া