মো. আফসারুল আলম মামুন
আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন প্রত্যেক প্রাণীকেই মরণের স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আমার আপনাকেও একদিন মরতে হবে। এই মায়াভরা পৃথিবীতে আমি আপনি চিরদিন থাকতে পারব না। কোনো একদিন আমি সবকিছু ছেড়ে চলে যাব। আমার আশপাশের সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলবে শুধু আমি থাকব না। ঘুমের মধ্যে বা সড়ক দুর্ঘটনায় কিংবা হূদযন্ত্রের ক্রিয়াবন্ধ হওয়ার উসিলায় প্রাণটা দেহ থেকে বেরিয়ে যাবে। সেদিনও সকাল বেলা মোরগ ডাকবে। সকল আন্তঃগামী ট্রেনগুলো স্টেশন ছেড়ে গন্তব্যে পথ ধরবে। দেশের বাজারগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাক শোনা যাবে সেদিনও। সবকিছুই চলবে স্বাভাবিক নিয়মে; শুধু আমিই থাকব না।
মৃত্যুর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার প্রাক্তন বাড়ির পাশের মসজিদে এলান হবে- ‘অমুকের সন্তান অমুক কিছুক্ষণ আগে মৃত্যুবরণ করেছে। ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন। বাদ আছর স্থানীয় স্কুল মাঠে মরহুমের জানাযা অনুষ্ঠিত হবে। উক্ত জানাযায় শরিক হয়ে মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করুন।’ মুহূর্তেই এলাকার মানুষ বাড়ির সামনে ভিড় জমাবে। আর দুনিয়ায় তাদের সাথে কাটানো সময় নিয়ে স্মৃতিচারণ করবে। একসময় আমার সেই প্রিয় ঘর থেকে আমাকে বের করা হবে। যেই ঘরে আমার বেড়ে উঠা আজীবনের জন্য। সেই ঘরটা থেকে আমাকে বিচ্যুত করা হবে। তুলতুলে বালিশ ছাড়া যেখানে আমি কখনো ঘুমাতাম না; সেই আমাকে তারা আজ একখানা শক্ত বালিশও দেবে না। হঠাৎ দেখব কিছু মানুষ আমাকে গোসল করার জন্য বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরি করছে। এদিকে একদল চলে গেছে কবরস্থানে। সেখানেও চলছে পরিপূর্ণ মাপে কবর তৈরির তোড়জোড়। মসজিদে ডুকতে এবং বের হওয়ার সময় যে খাটিয়া আমার চোখে বাঁধত সেই খাটিয়ায় গোসলের পর আমাকে শোয়ানো হবে। রংবেরঙের কাপড় ছাড়া যেখানে আমার তৃপ্তি হতো না; সেখানে আজ আমাকে সাদা ধবধবে কাপড় পরিধান করানো হবে। কিছু মানুষ আমার জন্য কোরআন শরীফ তেলাওয়াতসহ দোয়া দরুদ পাঠ করতে থাকবে। হঠাৎই দূরে থাকা কোনো পরম আত্মীয় আমার লাশের কাছে এসে হাউমাউ কান্না শুরু করে দেবে । আমি তাকে কতবার বুঝালাম এভাবে কান্না কর না, এভাবে কাঁদলে আমার কষ্ট হয়। কিন্তু আমার কথা তার কানে পৌঁছাল না। এক সময় আছরের নামাজের সময় চলে আসল। আমাকে রেখে সবাই আজ নামাজে গেল। কেউ আমাকে একবার ডাকলও না। আজ মসজিদে অনেক মানুষ হলো। সবাইতো আমার পরিচিত। কিন্তু কারো সাথে কোনো কথা বলার শক্তি আমার নাই। নামাজ শেষে সবাই স্কুল মাঠে উপস্থিত। শেষবারের মতো বাড়ির উঠান থেকে আমার লাশটা বের করা হচ্ছে আর কখনো এই বাড়িতে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। আমার অর্থ-সম্পদ সবকিছু রেখে আমাকে চলতে হচ্ছে ছয়জনের কাঁধের উপর ভর করে। কালেমা শাহাদাতের ধ্বনিতে আস্তে আস্তে আমাকে স্কুল মাঠে উপস্থিত করা হলো। আশপাশ থেকে কয়েকটি মসজিদের ইমাম সাহেব ও মুসুল্লিরাও আমার জানাযায় উপস্থিত হয়েছে। একে একে কিছু মানুষ আমার পক্ষে সবার কাছে দোয়া চাচ্ছে। আমার একজন নিকট আত্মীয় সবার উদ্দেশ্য করে বলছে, ‘উনার কথায় কেউ যদি কখনো দুঃখ পেয়ে থাকেন, তাহলে আল্লাহর জন্য মাফ করে দেবেন। আর কারো যদি কোনো আর্থিক লেনদেন থাকে আমাদেরকে জানাবেন।’
এরপর আমার জানাযা অনুষ্ঠিত হবে। জানাযা শেষ হওয়ার পরপরই কবরস্থানে। জানাযার কিছু মানুষ আমার সাথে কবরস্থানেও আসবে। এখানে আমাকে সরাসরি মাটির ওপর শোয়ানো হবে। দুই জাজিম আর দামি ফোম ছাড়া যেখানে আমার ঘুম হত না; সেখানে আজ শুধু মাটিতে রাখা হবে। আমার কবরের ওপর মোটা বাঁশ দিয়ে চালা দেওয়া হবে। বাঁশের চাটাই দিয়ে এখন মাটিচাপা দেওয়ার পালা। একসময় মাটি দিয়ে পরিপূর্ণভাবে তৈরি হবে আমার কবর। অন্ধকার করে আজ আমি শুধু একা। কেউ নেই। আমার সকল নিকট আত্মীয় সবাই আমাকে একা ফেলে চলে যাবে। আমার সাথে আজ কেউ থাকবে না।
কবরে রেখে আসার পর আমার কি হবে তা কল্পনা করার যোগ্যতা আমার নাই। আমি কি মুনকার নাকিরের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব? আমার কবরটা কি জান্নাতের একটা বাগান হবে নাকি জাহান্নামের টুকরা হবে তা আমার জানা নেই। আমি যদি মুনকার নাকিরের প্রশ্নের উত্তর দিতে এবং কবরটাকে জান্নাতের টুকরা বানাতে চাই তাহলে এই মৃহূর্তে থেকে আমার উচিত আল্লাহর হুকুম আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরিকা অনুযায়ী জীবনযাপন করা নতুবা আমার কবরটা হয়ে যাবে জাহান্নামের একটি অংশ। যার কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা আমার নাই।
লেখক : শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়





