মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে দশ বছর ফেরারি

সংগৃহীত ছবি

অপরাধ

মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে দশ বছর ফেরারি

  • ইমরান আলী
  • প্রকাশিত ২২ ডিসেম্বর, ২০২১

উগ্রবাদী নানা হামলার তদন্তে বারবার বেরিয়ে আসছে তার নাম। কিন্তু তিনি কোথায় অবস্থান করছেন, সে বিষয়ে কোনো ধারণাই করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তিনি হচ্ছেন সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক।

মেজর জিয়া নামে তিনি পরিচিত। তার গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজারের মোস্তফাপুরে। সর্বশেষ তিনি মিরপুর সেনানিবাসে থাকতেন।

২০১১ সালে সেনাবাহিনীতে একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টার পরই আলোচনায় আসেন মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক। অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই জিয়ার আর কোনো সন্ধান মেলেনি। জিয়াকে ধরতে বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করা হলেও আজও তিনি রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

দেশে ব্লগার, প্রকাশক, মুক্তমনা লেখকদের কমপক্ষে ৯ জনকে টার্গেট কিলিংয়ের নেপথ্যে ছিলেন এই মেজর জিয়া। আরো কয়েকজনকে হত্যাচেষ্টা পরিকল্পনার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। গোয়েন্দাদের ধারণা, আশপাশের দেশের কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গেও তার যোগাযোগ রয়েছে। দেশকে অস্থিতিশীল করার পাশাপাশি সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে গুপ্তহত্যাসহ নানা পরিকল্পনার নেপথ্যে রয়েছেন তিনি।

তার তত্ত্বাবধানে এবিটির অন্তত আটটি স্লিপার সেল রয়েছে। প্রতিটি সেলের সদস্য সংখ্যা চার থেকে পাঁচজন। সেই হিসাবে অন্তত ৩০ জন দুর্ধর্ষ ‘স্লিপার কিলার’ জঙ্গি তৈরি করেছেন মেজর জিয়া। তারাই ব্লগার, প্রকাশক, মুক্তমনা ও ভিন্নমতাবলম্বীদের হত্যা করেছে।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, দেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বিস্তারে অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে কাজ করছেন। রাজধানী ও এর আশপাশে টার্গেট কিলিংয়ে জড়িত কয়েকজন জঙ্গিকে গ্রেপ্তারের পর মেজর জিয়ার নাম জানা যায়। তা ছাড়া এসব জঙ্গির মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড পর্যালোচনা, ই-মেইল অ্যাকাউন্ট, ফেসবুক ও টুইটার অ্যাকাউন্ট ঘেঁটেও অনেক তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) একাংশের সঙ্গেও মেজর জিয়ার যোগাযোগ রয়েছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সূত্র জানায়, এবিটির কার্যক্রম ঢাকা ও চট্টগ্রামেই বেশি। স্লিপার সেল তৈরির ধারণাটি মেজর জিয়ার মস্তিষ্কপ্রসূত। তিনি নিজেই এই অভিযানগুলো সমন্বয় করেন। স্লিপার সেলের সদস্যরা তাকে ইশতিয়াক নামে চেনে। স্লিপার সেলের সদস্যদের ঢাকা ও এর আশপাশের নির্জন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে প্রশিক্ষণ দিতেন জিয়া।

কমপক্ষে ৯টি হত্যার ‘মাস্টারমাইন্ড’ জিয়া : ২০১৩-২০১৫ সালের মধ্যে পাঁচজন ব্লগার, একজন প্রকাশক ও সমকামীদের অধিকার নিয়ে কাজ করতেন এমন দুজনকে হত্যা করেছে এবিটি। এই সময়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হত্যার পেছনেও এবিটি জড়িত। এসব ঘটনার তদন্ত করে মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে জিয়ার নাম উঠে এসেছে। ২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল কলাবাগানের একটি বাসায় জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব তনয় নামে দুজনকে হত্যা করে এবিটির স্লিপার সেলের সদস্যরা। তারা দুজনই সমকামীদের অধিকার নিয়ে কাজ করতেন। এর আগে একই বছরের ৫ এপ্রিল রাজধানীর সূত্রাপুরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাজিমুদ্দিন সামাদকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ২০১৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির অদূরে বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও ব্লগার ড. অভিজিৎ রায়, তেজগাঁওয়ে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু, সিলেটের সুবিদবাজার এলাকায় ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ, রাজধানীর গোড়ানে ব্লগার নীলাদ্র্রি চ্যাটার্জি ওরফে নিলয়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওই বছরের শেষ দিকে আজিজ সুপার মার্কেটে নিজ কার্যালয়ে হত্যা করা হয় জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সল আরেফিন দীপনকে। এর আগে ২০১৩ সালে রাজধানীর পল্লবীতে খুন হন ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার।

ঘুরছেন দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত

পুলিশের কয়েকটি সূত্র জানায়, জিয়ার নাম শুনেছিলেন তাঁরা, তবে সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যাচ্ছিল না। ২০১৩ সালে আনসার আল ইসলামের তাত্ত্বিক গুরু জসীম উদ্দীন রাহমানী গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে বলেন, রাজধানীর বছিলায় যে মসজিদের তিনি খতিব ছিলেন, সে মসজিদে যাতায়াত ছিল জিয়াউল হকের। যোগাযোগ ছিল ই-মেইলেও। এরও প্রায় তিন বছর পর ২০১৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাড্ডার সাঁতারকুলে একটি অভিযানের পর পুলিশ সংগঠনটির কাঠামো সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। তারা জানতে পারে, এই সংগঠনের সামরিক প্রধান জিয়াউল হক।

বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক অভিজিৎ রায়সহ ছয়জন মুক্তমনা লেখক, প্রকাশক ও ব্লগার খুনের বিচার শেষে আবারও আলোচনায় আসেন সৈয়দ জিয়াউল হক। ছয়টি খুনের ঘটনাতেই তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। সবশেষ মার্কিন দপ্তর থেকে তাকেসহ আকরাম কে ধরিয়ে দিতে পারলে ৫০ লাখ ডলারের পুরস্কার ঘোষণা আসায় মিডিয়ায় আবারো আলোচনা এসেছেন তিনি। এখন প্রশ্ন উঠছে, তিনি কোথায়? কেন ধরা পড়ছেন না!

কাউন্টার টেরোরিজম (সিটিটিসির) কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত সৈয়দ জিয়াউল হক কোথা থেকে কোথায় গেছেন, তার একটা চিত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পেয়েছে। কমপক্ষে চারবার তাঁর খুব কাছ পর্যন্ত পৌঁছেছিল পুলিশ। জিয়া ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ময়মনসিংহে ছিলেন। এমনকি ২০১৯ সালের ঈদুল ফিতরের আগে চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে ঢাকায় আসার টিকিট কাটতে গিয়েছিলেন তিনি। টিকিট না পেয়ে স্টেশনেই হট্টগোল করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘অসৎ লোকজন কালোবাজারি করছে, টিকিট থাকার পরও বিক্রি করছে না।’ তাঁকে ঘিরে সে সময় ভিড় জমে যায়। ওই ব্যক্তিই যে সৈয়দ জিয়াউল হক, সে সম্পর্কে পুলিশ নিশ্চিত হয় পরে। তা ছাড়া বাড্ডার সাঁতারকুলে তিনি দীর্ঘ সময় ছিলেন।

এ ছাড়া অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সায়মনের ময়মনসিংহের বাসায় কয়েক মাস থেকেছেন জিয়া। টঙ্গীতে গিয়েছিলেন বিয়ের অনুষ্ঠানে। তল্লাশি অভিযান শুরুর আগেই সটকে পড়েন। এমনকি ঢাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর খুব কাছাকাছি এসেও কৌশলে পালিয়ে যান তিনি।

পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, তাঁরা নতুন করে জিয়াকে গ্রেপ্তারে জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। সিটিটিসি প্রধান আসাদুজ্জামান বলেন, চাকরিচ্যুত মেজর জিয়াকে ধরতে পুলিশের সর্বাত্মক অভিযান চলছে।

এদিকে গত সোমবার প্রকাশিত আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের একটি পোস্টারে উল্লেখ করা হয়, অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে ছয়জনকে অভিযুক্ত ও দণ্ড দিয়েছে বাংলাদেশি আদালত। তবে তাদের মধ্যে অন্যতম সৈয়দ জিয়াউল হক ওরফে মেজর জিয়া এবং আকরাম হোসেন নামে দুই ব্যক্তি এখনও পলাতক রয়েছেন। আর এদের ব্যাপারে তথ্য দেয়ার জন্য নম্বরও দিয়ে দেয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের এ ঘোষণাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ। গতকাল মঙ্গলবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলেন, ‘আমরা জানি অভিজিতের দুই খুনি পলাতক আছে। আমরা তাদের খুঁজছি। এদের বিচার হয়ে গেছে। এরা পালিয়ে আছে। এই ঘোষণায় তাদের পেতে আমাদের সুবিধা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণায় যদি তাদের পাওয়া যায়, আমরা তাদের স্বাগত জানাই।’

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads