কয়েক মাস ধরেই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, নিত্যপণ্যের এই মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় আছে আটা, ময়দা, ভোজ্যতেল, ডাল, ডিম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, শুকনা মরিচ, চিনি ও লবণ। তবে বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, টিসিবির মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় থাকা পণ্যের বাইরে চাল, গম, ডিটারজেন্ট, টুথপেস্ট, গুঁড়া দুধ, তরল দুধ, বেকারি পণ্য, নুডলসসহ সবকিছুর দামই নাগালের বাইরে।
শুধু চাল, গম, তেল, ময়দা, লবণসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যই নয়, খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দামও বেড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পোশাক, খাতা-কলম, বাসাভাড়া, যাতায়াত ভাড়া। বিশেষ করে গত বছরের নভেম্বরে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির পরপরই জীবনযাত্রার খরচ বাড়তে শুরু করে। আর গত বছরের মাঝামাঝি থেকে আন্তর্জাতিক বাজারেও ভোগ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়তে থাকে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া ইউক্রেন যুদ্ধ আন্তর্জাতিক পণ্যের বাজারকে আরেক দফা উসকে দেয়।
পণ্যের দাম বাড়লে সরকারি হিসাবে তা মূল্যস্ফীতি দিয়ে প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মূল্যস্ফীতির হিসাব করে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, গত জুনে ৯ বছরের মধ্য সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি রেকর্ড করা হয়। তবে অর্থনীতিবিদের মতে এই হার আরও বেশি। এরআগে তিন মাস ধরে টানা মূল্যস্ফীতি হয়েছে, যা ৬ শতাংশের ওপরে। গত এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। এই এপ্রিল মাসেই নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভুগেছে মানুষ। কিন্তু সরকারি হিসাব বলছে, এপ্রিল মাসে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি কমেছে।
অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি যেন বর্ণহীন কার্বন মনোক্সাইডের মতোই। বিবর্ণ করছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবন। এই অভিঘাতেই ভুগছেন রিকশাচালক বাবুল। পেটের দায়ে ব্যস্ত ঢাকায় যেসব মজুর আর ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীরা রয়েছেন, তাদের জীবনের গল্পটাও অনেকটা এমনই।
মো. আফজাল মিয়া। বয়স ৫০-এর কাছাকাছি। পেশায় রাজধানীর শাজাহানপুর সুপার লন্ড্রির কর্মচারী। মাসিক বেতন ৮ হাজার টাকা। সকাল ৯টায় কাজে যোগদান করে এবং রাত ১০টায় বের হন। রাজধানীর শান্তিনগর ঝিলপাড়ে এক মেসে থাকেন। বাসা ভাড়া ও খাওয়া বাবদ ব্যয় হয় সাড়ে ৭ হাজার টাকা। হাতে জমা থাকে মাত্র ৫শ টাকা। কিন্তু তার রয়েছেন স্ত্রী, ৭ বছরের একটি ছেলে। তিন সদস্যের পরিবার নিয়ে তার সংসার। মাত্র ৫শ টাকা দিয়ে এ সংসার চালাতে তার কষ্ট হচ্ছে। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। তার সন্দেহ আছে মূল্যস্ফীতির হিসাব নিয়ে। ময়মনসিংহ রেলস্টেশন (বস্তি) সংলগ্ন পূর্বদিকে তার গ্রামের বাড়ি। হাতে গচ্ছিত ৫শ টাকা দিয়ে সংসার পরিচালনা করা তার পক্ষে কষ্টদায়ক।
তিনি বলেন, চাল, ডাল, আটা, ময়দা, তেল, লবণসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের কারণে গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষের কষ্ট বেড়েছে। তাঁদের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। রোজগার বৃদ্ধি না পাওয়ায় বাজারের তালিকা থেকে সদাই কাটছাঁট করতে হচ্ছে। মাসের বাজার খরচ আঁটসাঁট করছেন অনেকে। ফলে গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষ এখন সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। সবমিলিয়ে সৎভাবে সংসার পরিচালনা করা গরিবদের পক্ষে কষ্টদায়ক হয়ে উঠেছে।
আফজালের মতো হোটেলে সবজি কাটার কাজ করেন বেদানা বেগম। দৈনিক মজুরি পান ১০০ টাকা। কম দামে সবজি কেনা যায়, এমন খবর শুনে কারওয়ান বাজারে আসেন তিনি। কিন্তু ফুটপাতের বাজারেও সবজির দাম বাড়তি হওয়ায় কিছু কিনতে না পেরে হতাশ এই প্রবীণ নারী।
তিনি বলেন, চাল, ডাল, আটা, ময়দা, তেল, লবণসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের কারণে গরিব ও আমাদের মতো সীমিত আয়ের মানুষের কষ্ট বেড়েছে। আমাদের মতো নিম্নআয়ের মানুষের পক্ষে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। রোজগার বৃদ্ধি না পাওয়ায় বাজারের তালিকা থেকে সদাই কাটছাঁট করতে হচ্ছে। মাসের বাজার খরচ কাটছাঁট করছেন অনেকে। ফলে গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষ এখন সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন।
রাজধানীর বেগুনবাড়ি এলাকার বিলকিছ বেগমের চারজনের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি নিজেই। ফেরি করে পান বিক্রি করে চলে তাঁর সংসার। তিনি বলেন, ডাল-ভাত খেয়েই দিন পার করতাম। এখন তাও জোগাড় করা কঠিন হয়ে গেছে। আগে বাজারে গিয়ে কী কিনতে পারব আর কী পারব না, তার ধারণা থাকত। এখন বাজারে গিয়ে দেখি, আজ এটার দাম বেড়েছে, তো কাল অন্যটার।
দ্রব্যমূল্যের চাপে ধুঁকছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবন। সরকারি পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট মানুষ ভালো নেই। গত নয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি ঘটেছে দেশে। তবে এই হার আরও বেশি বলে দাবি অর্থনীতিবিদদের।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক এম কে মুজেরীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বাস্তবে বাজারে যে মূল্যের বৃদ্ধি দেখছি এটা হয়তো পরিসংখ্যানে সঠিকভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে না। মূল্যস্ফীতির চাপে সমাজে ভাঙন তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন এই তিনি।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের যে নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং মধ্যস্থতাকারীদের দৌরাত্ম্য এ পরিস্থিতেতে রাষ্ট্রের যে ভূমিকা রাখার কথা, তার অভাবে আমরা সমাজে একটা বড় ধরনের ভাঙনে পড়ছি। শুধু বাংলাদেশই নয়, আমেরিকা ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশও ধুঁকছে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে।
এছাড়া করোনাপরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়েই ছোট-বড় সব দেশেই মূল্যস্ফীতি হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাই এখন নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি পার্শ্ববর্তী ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় কম। অথচ এসব দেশকেও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য কিনতে হয়। তাই বাংলাদেশের ৭ শতাংশের মতো মূল্যস্ফীতির তথ্য নিয়ে ইতিমধ্যে অর্থনীতিবিদরা প্রশ্ন তুলেছেন।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন জানান, সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মূল্যস্ফীতির হিসাব জাতীয় পর্যায়ের গড় হিসাব। মূল্যস্ফীতির প্রভাব সবার জন্য সাড়ে সাত শতাংশ নয়। গরিব মানুষের ওপর এর প্রভাব অনেক বেশি। সাধারণ মানুষের কষ্ট আছে। তিনি একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, শহরের মূল্যস্ফীতি হিসাব করতে ৪২২টি পণ্য বিবেচনা করে বিবিএস। গত জুনে এসব পণ্যের মধ্যে ২২৪টি পণ্যের দাম ৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
বিবিএস সূত্রে জানা গেছে, শিল্পকারখানা ও নির্মাণ খাতে ব্যবহূত লোহা বা এমএস রডের কাঁচামাল হিসেবে পুরোনো লোহার টুকরা ও পুরোনো জাহাজের আমদানি মূল্য বেড়েছে। ২০২১ সালের মে মাসে প্রতি টন পুরোনো লোহার টুকরার দাম ছিল ৪৮০ ডলার। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮০ ডলারে। অন্যদিকে পুরোনো জাহাজ আমদানি করতে এক বছর আগের চেয়ে দাম টনপ্রতি দ্বিগুণ হয়ে ৬০০ ডলার হয়েছে। সিমেন্টশিল্পের প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকারের দাম এক বছর আগে ছিল প্রতি টন ৫২ ডলার, এখন তা ৮০ ডলারের কমে মিলছে না। বস্ত্র খাতে ব্যবহূত তুলার প্রায় শতভাগই আমদানি করতে হয়। এক বছরের ব্যবধানে প্রতি কেজিতে তুলার দাম পৌনে ১ ডলার বেড়ে ২ দশমিক ৬৫ ডলার হয়েছে।





