মুফতি জাকারিয়া মাসউদ
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজের ভাষণে মুমিনদের জন্য সর্বশেষ নসিহাত হিসেবে ঘোষণা করেন, ‘আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যতক্ষণ তোমরা এই দুটিকে আঁকড়ে ধরে রাখবে ততক্ষণ তোমরা কেউ পথভ্রষ্ট হবে না। আর তা হলো আল্লাহতায়ালার কিতাব ও আমার সুন্নাহ।’ (মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হাদিস নং-৩৩৩৮) সুন্নাহ শব্দটি আরবী, এর শাব্দিক অর্থ হলো : পথ, পদ্ধতি, নিয়ম-কানুন, রীতিনীতি । (মিসবাহুল মুনীর) তবে আল মুফরাদাত গ্রন্থকার বলেন, সুন্নাতের অর্থ ব্যবহারভেদে ভিন্ন হতে পারে। যেমন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত বলতে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শকে বুঝায়। অর্থাৎ তাঁর সুমহান জীবনব্যবস্থাকে বুঝানো হয়।
সুন্নাহ শব্দের পারিভাষিক অর্থ, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা, কাজ ও সম্মতিসূচক সব কাজ। সুন্নাহ বিশ্লেষক উলামাদের মতে, যেসব বিধান বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসের মাধ্যমে প্রমাণ পাওয়া যায় অর্থাৎ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে আমল করেছেন বা করতে বলেছেন অথবা কেউ কোনো কাজ করলে সমর্থন করেছেন এমন কাজকেই সুন্নাহ বলা হয়। সার্বিকভাবে এটা বলা যায় যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বিধান পূর্ণাঙ্গরূপে মুমিনের জীবনে বাস্তবায়নের সঠিক এবং একমাত্র নীতিমালার নামই হলো সুন্নাহ।
মহান আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা সঠিকভাবে জীবন পরিচালনার জন্য গাইড লাইন হিসেবে দান করেছেন পবিত্র কোরআন। আর এই গাইড বুঝানোর জন্য পাঠিয়েছেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে। বুঝানোর পরেও আল্লাহর কোনো আদেশ নিষেধ অমান্য করলে সংশোধনের জন্য রেখেছেন তওবার ব্যবস্থা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে পদ্ধতিতে কোরআন এর ব্যাখ্যা করে বুঝিয়েছেন সে পদ্ধতিকেই বলা হয় সুন্নাহ। এতক্ষণ যে আলোচনা করা হলো তার দ্বারা নিশ্চয়ই বুঝা যায় যে, একজন ঈমানদারের জীবন পরিচালনার পদ্ধতিই হলো সুন্নাহ। অর্থাৎ সুন্নাহ ছাড়া জীবন মানে হলো স্রষ্টার নীতিমালাহীন জীবন। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, জীবন পরিচালনার পদ্ধতি হাদিস নয় বরং সুন্নাহ।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন যে, ‘(হে নবী) আপনি বলুন! যদি তোমরা আল্লাহর ভালোবাসা পেতে চাও, তবে তোমরা আমার অনুসরণ কর! তাহলে আল্লাহতায়ালা তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অতীতের গুনাহসমূহ মাফ করে দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত-৩১) অন্য আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা বলেন, ‘যে ব্যক্তি রাসুলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল।’ (সুরা নিসা, আয়াত -৮০) মহান আল্লাহ আরো ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই রাসুলের মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহযাব-২১) এছাড়াও বিভিন্ন আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা সুন্নাহ পালনের প্রতি বিশেষ নির্দেশ প্রদান করেছেন। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, ‘মুমিন তাঁর জীবনকে পূর্ণাঙ্গভাবে আল্লাহর হুকুম দ্বারা সাজাতে চাইলে সুন্নাহর কোনো বিকল্প নাই।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার সুন্নাহকে জীবিত করবে/ভালোবাসবে (নিজের জীবনে ও সামাজিক জীবনে প্রতিষ্ঠিত করবে) সে আমার সাথে জান্নাতে থাকবে। (কানযুল উম্মাল : হাদিস নং-৯৩৩ আল মুজামুল আউসাত : হাদিস নং-৯৪৩৯) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুকরণের একমাত্র মাধ্যম হলো তাঁর রেখে যাওয়া সুন্নাহর অনুকরণ। সুন্নাহ ধরনভেদে গুরত্ব কম বেশি হতে পারে। ব্যক্তি জীবনে সুন্নাহ এবং পারিবারিক জীবনে ও সামাজিক জীবনে সুন্নাহ পালনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব সমান নয়। কিছু সুন্নাহ এমন আছে যার মাধ্যমে ইসলাম প্রসার হয় এবং ইসলামের সৌন্দর্য্য প্রকাশ পায়। এমন সুন্নাহর গুরত্ব নিশ্চয়ই ব্যক্তি জীবনের সুন্নাত ইবাদতের চেয়ে বহুগুণ বেশি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি ফেৎনার সময়ে আমার একটি সুন্নাহকে প্রতিষ্ঠিত করবে সে ১শত শহিদের সওয়াব পাবে। অন্য হাদিসে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের ওপর জরুরি হলো, তোমরা আমার সুন্নাত এবং খোলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাহকে অনুসরণ করবে।’ (ফাতহুল বারী)
ইবাদত কবুলে সুন্নাহর গুরত্ব : মহান রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাত কামনা করে সে যেন সৎকর্ম করে ও তার ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।’ (সুরা কাহাফ, আয়াত-১১০) আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা উক্ত আয়াতে রবের সাক্ষাত পেতে অর্থাৎ ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য দুটি অন্যতম শর্তের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, সৎকর্ম হওয়া। দ্বিতীয়ত, শিরক মুক্ত হওয়া। সৎকর্ম বলতে ওই ইবাদতকে বুঝানো হয় যার মধ্যে থাকে আল্লাহতায়ালার হুকুম এবং বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ। আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ করো এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো। আর আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালাকে ভয় করো নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর।’ (সুরা হাশর, আয়াত-০৭) এ আয়াতে স্পষ্ট বুঝা যায় সুন্নাহ ছাড়া আমল পরিত্যায্য। ইবাদতে সুন্নাহর গুরুত্ব আলোচনা করতে গিয়ে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করল যাতে আমাদের নির্দেশ (সুন্নাহ) নেই তা প্রত্যাখ্যাত। (মুসলিম হাদিস নং-১৭১৮) সুতরাং কোরআন এবং হাদিস দ্বারা স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় যে, ইবাদতের অন্যতম এবং প্রধান র্শত হলো সুন্নাহ। সুন্নাহ বহির্ভূত ইবাদত পানিশূন্য ডাবের মতো, দেখতে যদিও সুন্দর কিন্তু সওয়াবের দিক থেকে শূন্য। অতএব মুমিনের জন্য জরুরি বিষয় হলো যে কোনো কাজ করার আগে হিসেব করতে হবে এ ব্যাপারে প্রিয়নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুন্নাত তরিকা কি? বা কাজটি সুন্নাহসম্মত কি না? সুন্নাহ পাওয়া গেলে করা, না পাওয়া গেলে ছেড়ে দেওয়া।
সুন্নাহবিমুখতা ঈমানের অপূর্ণতা : বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে থেকে যে কেউ যতক্ষণ পর্যন্ত তার পিতা-মাতা সন্তানাদি এবং সমস্ত মানুষের চেয়ে আমাকে বেশি ভালো না বাসবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে পূর্ণাঙ্গ ঈমানদার হতে পারবে না।’ (বুখারি হাদিস নং-১৫) আর পূর্বের হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসার মাপকাঠি হলো সুন্নাহর অনুসরণ। সুতরাং যার মধ্যে সুন্নাহর অনুকরণ যত বেশি তার মধ্যে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভালোবাসাও ততবেশি। আর যার মধ্যে সুন্নাহ নাই তার মধ্যে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসাও নাই। আর যার মধ্যে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালোবাসা নাই তার মধ্যে ঈমানও নাই।
কোনো কাজ করা হলো, তাতে সুন্নাতের বিরোধী হলো; অথচ কিছুই মনে করলাম না, মানে সুন্নাহর গুরুত্ব নাই। এর পরিণাম কি ভয়াবহ। মহান আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘মুমিনের উক্তি তো এই যে, যখন তাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেওয়ার জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের দিকে আহ্বান করা হয় তখন তারা বলে, আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম। আর তারাই সফলকাম। যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর অবাধ্যতা হতে সাবধান থাকে তারাই সফলকাম।’ (সুরা নূর আয়াত-৫১,৫২) একজন মুমিনের জীবনে প্রতিটি পদক্ষেপে একটি মাত্র চিন্তা যদি তার মনের মধ্যে দানা বাঁধতে পারে যে, আমি যে কাজটি করতে যাচ্ছি, তা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ সম্মত কি না? বা আমার কাজটি প্রিয়নবীর সুন্নাহর খেলাপ হয়ে যাচ্ছে কি না? শুধু এতটুকু প্রশ্ন কারও বিবেক করতে শিখলে, তাহলে আশা করা যায় সে ব্যক্তির জীবনে সুন্নাহর খেলাপ কোনো কাজ হবেনা। আর যদি কেউ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুন্নাহকে প্রাধান্য দিতে পারে, সে হবে খাঁটি আল্লাহওয়ালা। আর কেউ আল্লাহওয়ালা হলে, তাঁর জীবনে থাকবে না কোনো ভয় ও পেরেশানি। হে মহান আল্লাহ! আমিসহ প্রতিটি মুমিনকে সুন্নাহর গুরত্ব বুঝে নিজের জীবনকে সুন্নাহ দ্বারা সজ্জিত করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : প্রধান মুফতি, কাশফুল উলুম নেছারিয়া মাদরাসা কমপ্লেক্স, নেছারাবাদ, সিংড়া, নাটোর