মুফতি আনাস হুসাইন
যে কোনো কাজেরই সফলতা নির্ভর করে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির ওপর।
প্রিয়নবী হজরত মোহাম্মদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রজব থেকেই মাহে রমজানের প্রস্তুতি নিতেন। আমাদেরও পূর্বপ্রস্তুতি জরুরি। প্রস্তুতি সুন্দর হলে কাজ সহজ হয়। প্রস্তুতি এমনভাবে নিতে হবে যেন চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গেই রমজানের বরকত লাভ শুরু করতে পারি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের প্রস্তুতিস্বরূপ এই দোয়া বেশি বেশি পড়তেন। ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রাজাবা ওয়া শাবান, ওয়া বাল্লিগনা রমাজান।’ অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসকে বরকতময় করে দিন। আর আমাদের রমজান মাস পর্যন্ত পৌঁছে দিন। (তাবারানি, হাদিস ৩৯৩৯; বাইহাকি, হাদিস ৩৫৩৪)
আমাদের রমজানের প্রস্তুতিতে অবশ্যই কোরআনকে প্রাধান্য দিতে হবে। রমজান মাসের এত ফজিলতের কারণ এ মাসে কোরআন নাজিল হয়েছে। এ কোরআন হচ্ছে মানুষের সংবিধান।
কোরআন নাজিলের কারণে এ মাসের মর্যাদা এত বেড়েছে। সুতরাং যারা সহিহ শুদ্ধ করে কোরআন তেলাওয়াত করতে পারি না তারা এখন থেকেই কোরআন শিক্ষা শুরু করবো। আর যারা পড়তে পারি তারা সময় পেলেই কোরআন তেলাওয়াত করবো। অর্থ পড়ব। তাফসির পড়ব। কোরআন নিয়ে ভাবব। এক কথায় রমজানের বড় একটা অংশ যেন কোরআনের সঙ্গে কাটে। আর নামাজের প্রতিও গুরুত্ব দিতে আরো অনেক বেশি। এটা ফরজ। বড় ফরজ। বিশেষভাবে যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন না, তারা রমজানের অপেক্ষায় বসে না থেকে এখন থেকেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে শুরু করুন। মনকে প্রস্তুত করুন রমজানের জন্য। নিজের খারাপ ও বাজে অভ্যাসগুলো চিহ্নিত করে আচরণ-উচ্চারণে পরিবর্তনের চেষ্টা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
পবিত্র রমজানে জ্ঞান অন্বেষণ ও পড়াশোনা বাড়াতে হবে। সাধারণ নিয়ম হলো, যে ব্যক্তি যেই কাজের প্রতিদানের কথা বেশি জানে, সেই কাজের প্রতি তার আগ্রহ ও উদ্দীপনা বাড়ে। তাই রমজানের ইবাদতগুলো সঠিক ও পূর্ণভাবে পালনের স্বার্থে পড়াশোনা ও রমজানবিষয়ক জ্ঞান অন্বেষণ জরুরি। এতে অনুপ্রেরণা ও উদ্দীপনা বাড়বে। রমজান সম্পর্কে যত বেশি জানা যাবে, তত বেশি ইবাদত-বন্দেগিতে স্বাদ পাওয়া যাবে। আর দ্বীনি এলেম শিক্ষার সওয়াব তো রয়েছেই। হাদিস শরিফে এসেছে- হজরত আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি ইলম (জ্ঞান) অর্জনের পথে চলে, আল্লাহ এর দ্বারা তাকে জান্নাতে পৌঁছে দেবেন। ফেরেশতারা ইলম অর্জনকারীর সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের ডানা পেতে দেন। অনন্তর আলেমদের জন্য আসমান-জমিনের সব প্রাণী ক্ষমাপ্রার্থনা করে এমনকি পানির জগতের মাছসমূহও।’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও ইরশাদ করেন- ‘আল্লাহপাক যার কল্যাণ চান তাকে দ্বীনের সহীহ সমঝ দান করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৭১; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০৩৭) অন্য হাদিসে ইরশাদ করেছেন, ‘যেই ব্যক্তি ইলম তলবের জন্য কোনো পথ অবলম্বন করবে আল্লাহপাক এর বদৌলতে তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৯৯) এজন্য আমাদের সবার উচিত রমজান মাসে এলেম অর্জনের প্রতি ও গুরুত্ব দেওয়া।
রমজানের প্রস্তুতিকল্পে পারিবারিক ও সামাজিক প্রস্তুতিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবারের প্রতি অবহেলা করার কোনোই সুযোগ নেই। এর জন্য জবাবদিহিতা করতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। আর (কেয়ামত দিবসে) তোমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। সুতরাং জনগণের শাসকও একজন দায়িত্বশীল, তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আর পুরুষ তার পরিবারের একজন দায়িত্বশীল, তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। স্ত্রী তার স্বামীর ঘরসংসার ও সন্তানের দায়িত্বশীল, তাকে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। গোলাম তার মনিবের মালসম্পদের ওপর একজন দায়িত্বশীল, তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই একেকজন দায়িত্বশীল। আর তোমাদের প্রত্যেককেই (কেয়ামত দিবসে) তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। (বুখারি, হাদিস নং : ২৫৫৪; মুসলিম, হাদিস নং : ৪৮২৮) পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কেউ বে-রোজাদার থাকলে তাকে রমজানের আগেই সতর্ক করুন। আপনার টাকায় আপনার ঘরে দিনের বেলায় শিশু ও অক্ষম বৃদ্ধ ছাড়া অন্যের অন্নসংস্থানের সব পথ বন্ধ করা আপনার দায়িত্ব।
সামাজিক প্রস্তুতি : পবিত্র রমজান মাসে সমাজের অবহেলিত বঞ্চিত মানুষের জন্য দান-খয়রাত, ফিতরা-জাকাত ইত্যাদি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মাহে রমজানে সকল ইবাদতের সওয়াব ৭০ গুণ বেড়ে যায়। এজন্যই রমজানকে বলা হয় ইবাদতের বসন্তকাল। জাকাত একটি ফরজ ইবাদত। জাকাত গরিবের ওপর করুণা নয়, দয়া-দাক্ষিণ্যও নয়। এটি গরিবের পাওনা অধিকার। আল্লাহ তাআলা কোরআন করিমে বলেছেন, ‘তাদের সম্পদে বঞ্চিতদের নির্দিষ্ট অধিকার রয়েছে।’ (সুরা-৫১ যারিয়াত, আয়াত: ১৯) আর এই জাকাত যদি আমরা রমজান মাসে দিই, তাহলে ৭০ গুণ বেশি সওয়াব পাব।
রমজান হলো মানুষের মানবিক গুণাবলি বিকাশ ও অনুভূতি জাগ্রত করার শ্রেষ্ঠ সময়। রোজা পালনের মাধ্যমে আমাদেরকে অনুভব করতে হবে গরিব দুঃখীদের ক্ষুৎপিপাসার জ্বালা। বুঝতে হবে অসহায় নিরন্ন মানুষের ও খাদ্যের সম্মান। মর্যাদা দিতে শিখবে ক্ষুধার্ত মানুষকে। উপলব্ধি করবে হবে, কেন অন্নহীন গরিব মানুষ একমুঠো খাবারের জন্য অন্যের দ্বারে হাত পাতে? কেন গরিব মাকে খেতে দিলে নিজে না খেয়ে আঁচলে বেঁধে নেয় তাঁর অভুক্ত সন্তানের জন্য? কেন ক্ষুধায় কাতর মানুষগুলো আত্মসম্মান বিসর্জন দেয়, মর্যাদা ভুলে যায়, মান-ইজ্জত বিকিয়ে দেয় খাবারের জন্য? এই অনুভূতি জাগ্রত হওয়াই রোজা ও রমজানের অন্যতম একটি শিক্ষা। এখন থেকেই সকল মুমিনের অন্তরে এই অনুভূতি জাগ্রত করা উচিত।
রমজানের প্রস্তুতিতে আমাদেরকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে এবাদত কবুল না হওয়ার প্রতিবন্ধকতাগুলোকে। এত কষ্ট করে রোজা রাখবো। ২০ রাকাত তারাবির নামাজ পড়বো। যদি কবুলই না হয় তাহলে লাভ কী হবে? এজন্য আমাদেরকে অবশ্যই গিবত, পরনিন্দা, হারাম উপার্জন, সুদ, ঘুষ, হিংসা থেকে দূরে থাকতে হবে। সমাজে দেখা যায় কিছু মানুষ পবিত্র রমজান মাসেও ঘুষ খায়, মজুতদারি করে, অপরের হক জেনে-শুনে নষ্ট করে, আবার রোজাও রাখে। কিন্তু তার রোজা আদো কবুল হচ্ছে কি-না তার খবর নাই। অথচ রোজা কবুলের সবচেয়ে বড় অন্তরায় হলো গিবত ও পরনিন্দা। গিবত হলো ক্যানসারের মতো। ক্যানসার যেমন শরীরের কোষগুলোকে খেয়ে ফেলে, গিবত তেমনি কুরে কুরে মানুষের সব নেকি খেয়ে ফেলে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা একে অপরের গিবত করো না। তোমরা কি কেউ আপন মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করতে পছন্দ কর? (সুরা হুজরাত) নামাজ কবুল হওয়ারও প্রতিবন্ধক হলো গিবত। তাহলে পবিত্র রমজানে এত কষ্ট করে ২০ রাকাত তারাবির নামাজ পড়ে লাভ কী হবে?
গুরুত্বপূর্ণ আরেকটা বিষয় হলো, হালাল উপার্জন। এ ব্যাপারে বহু হাদিস রয়েছে। হাদিসে আছে, ‘হালাল রুজি ইবাদতের পূর্বশর্ত।’ (মুসলিম : ২২১৮)। হজরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘হারাম উপার্জনের সদকা কবুল হয় না।’ (মুসলিম : ৫৫৭)। আরো আছে, ‘হারাম খেয়ে যে শরীর হূষ্টপুষ্ট হয় তা জান্নাতে যাবে না।’ (তারগিব : ৯৬৭)।
এবাদত কবুল হওয়ার আরেকটি প্রতিবন্ধকতা হলো হিংসা। হিংসা করলেও কোনো ইবাদত কবুল হবে না। হিংসুকের হিংসা থেকে আশ্রয় প্রার্থনার কথা স্বয়ং আল্লাহ বলেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘হিংসুকের হিংসা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা কর, যখন সে হিংসা করে।’ (সুরা ফালাক, আয়াত : ৫)।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহর নিয়ামতের কিছু শত্রু আছে। সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহর নিয়ামতের শত্রু কারা? রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হিংসুকরা। হিংসুক তো এজন্যই হিংসা করে আল্লাহ কেন তার বান্দাকে অনুগ্রহ করেছেন। (দাওয়াউল হাসাদ)। হিংসার পরিণাম সম্পর্কে ইমাম জাফর সাদিক (রহ.) বলেন, ‘হিংসা হলো কুফরের ভিত্তিস্বরূপ।’ (আল কাফি)। সুতরাং আসুন আমরা মানসিক ও আত্মিকভাবে রমজানকে স্বাগত জানাই। মহান আল্লাহ আমাদের রমজান পর্যন্ত হায়াত বাড়িয়ে দিন। আমিন।
লেখক : পরিচালক, তালিমুল কোরআন মাদরাসা সদর, ময়মনসিংহ





