দেশব্যাপী উত্তাল ক্ষোভ আর মামলায় নিজের দেওয়া বক্তব্যকে অস্বীকার করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতা মামুনুল হক। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙচুর থেকে নিজের দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন। ফেসবুক লাইভে এসে তিনি এ ব্যাপারে বক্তব্য প্রদান করেন। এতে করে তিনিসহ হেফাজতে ইসলামের নেতারা ইউটার্ন নিচ্ছেন বলে অনেকে মনে করছেন।
এদিকে কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃতদের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। রিমান্ডে তাদের জিজ্ঞাসাবাদও শুরু হয়েছে। ভাস্কর্য ইস্যু নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার কথা জানিয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা। আলোচনার বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে।
সূত্রমতে, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতা ও হেফাজতের যুগ্ম -মহাসচিব মামুনুল হক বেশ কয়েকবার উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন। এমনকী ধোলাইপাড়ে ‘বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য হলে নিজেদের সামর্থ্য থাকলে তা ভেঙে ফেলব’ বলেও ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে হেফাজতের আমির বাবুনগরীও টেনে-হিঁচড়ে ভেঙে ফেলার বক্তব্য দেন। তার এই বক্তব্যের পর দেশব্যাপী তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এরই মধ্যে কুষ্টিয়ায় জাতির পিতার মূর্তি ভেঙে ফেলা হয়। এমন অবস্থায় পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায়। দেশব্যাপী আন্দোলনের ডাক দেয় আওয়ামী লীগসহ অঙ্গসহযোগী সংগঠন। দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় কর্মসূচি এখনো চলমান।
আওয়ামী লীগ ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যান্য সংগঠন, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ ন্যক্কারজনক এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ ও দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি তোলে। বিশেষ করে ভাঙচুরের ঘটনায় উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে মামুনুল হককে গ্রেপ্তারের দাবি ওঠেছে। এরই মধ্যে ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অপরাধী শনাক্ত করে মোট ৪ জনকে গ্রেপ্তার করে পুর্িলশ। গ্রেপ্তারকৃতরা তাদের স্বীকারোক্তিতে জানিয়েছে মামুনুল হকের বক্তব্যে প্ররোচিত হয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে জানায় পুলিশ।
গত রোববার মামুনুল হক, জুনায়েদ বাবুনগরী ও সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়লুল করীমের বিরুদ্ধে দুইটি রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা হয়। আগামি ৭ জানুয়ারি পিবিআইকে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার আদেশ দেন আদালত।
এমন পরিস্থিতিতে গত সোমবার সন্ধ্যায় ফেসবুকে লাইভে আসেন মামুনুল হক। তিনি ফেসবুক লাইভে এসে নিজের দায়কে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, আমি কখনোই আইন হাতে তুলে নেওয়ার কথা বলিনি। পুরো বিষয়টিই তিনি অস্বীকার করে যান।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভাস্কর্য ইস্যু নিয়ে যখন বিতর্ক হচ্ছিল এমন সময় তার কিছু বক্তব্যের প্রেক্ষিতে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। তার বক্তব্যের প্রক্ষিতে মাদরাসার ছাত্ররা উৎসাহিত হয়ে ভাঙচুরে অংশ নিয়েছে। এর প্রতিবাদে এবং তাকে গ্রেপ্তারের দাবিতে যখন সারা দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছে তখন তিনি ইউটার্ন নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এমনকী তার নিজের বক্তব্যকে এখন অস্বীকার করছেন।
বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের পর সারা দেশে মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখার পর তারা মূলত পিছু হটেছেন বলেও অনেকে মনে করছেন।
সাধারণ মানুষ বলছে, হঠাৎ করেই তাদের আন্দোলন এখানে অন্যকিছু ইঙ্গিত বহন করে। যুগে যুগে ভাস্কর্য ছিল তখন কোথাও আন্দোলন হয়নি। তাই হঠাৎ করেই এই আন্দোলন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এদিকে কুষ্টিয়ার ঘটনায় আটক ৪ জনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে। কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের মুখ্য বিষয় হবে কার প্ররোচণায় তারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। মূলত নেপথ্যের হুকুমদাতা কারা ছিল সেই বিষয়টি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এক্ষেত্রে যাদের নাম পাওয়া যাবে তারাই আইনের আওতায় আসবে।
আলোচনায় বসবে না আওয়ামী লীগ : বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতাকারীদের সঙ্গে কোনো আলোচনায় যেতে চায় না ক্ষমতাসীনরা। এ বিষয়ে তারা কঠোর অবস্থানে অনড়।
প্রথম দিকে আওয়ামী লীগ ও সরকার বিষয়টি পর্যবেক্ষণের অবস্থান নিলেও ওই সংগঠনগুলোর লাগাতার বক্তব্য, বিবৃতি ও সর্বশেষ কুষ্টিয়ার ঘটনার পর সরকার কঠোর অবস্থান নেয়। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য তৈরির বিরোধিতা ও ভাঙচুর করা বাংলাদেশের অস্তিত্ব, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধানের ওপর আঘাত বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতারা।
গত রোববার আওয়ামী লীগের এক কর্মসূচিতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অংশ নিয়ে ভাস্কর্যের বিরোধিতা প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দেবেন না। আওয়ামী লীগ গায়ে পড়ে আক্রমণ করে না, তবে আক্রমণের শিকার হলে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে একবিন্দুও পিছপা হয় না। জাতির পিতার প্রতিকৃতি প্রদর্শন ও সংরক্ষণ সাংবিধানিকভাবেই বিধিবদ্ধ বিষয়, তাই বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের অবমাননা প্রকারান্তরে সংবিধানের অবমাননা। বঙ্গবন্ধু মানে এদেশের অস্তিত্ব, স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু মানে বাংলাদেশ এবং সংবিধান, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের অবমাননা মানে দেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আক্রান্ত করা। পবিত্র সংবিধান ও দেশের আইন পরিপন্থি ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য, মন্তব্য ও আচরণ বরদাস্ত করা হবে না। ’
এবিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম -সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, ‘কিসের আলোচনা, কিসের জন্য আলোচনায় যাবে আওয়ামী লীগ সরকার। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, উগ্র মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো আলোচনা হতে পারে না। এরা ইসলাম থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। ইসলাম শান্তির ধর্ম, সত্যের ধর্ম। হজরত মোহাম্মদ (সা.) যে আরবে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তন করেছিলেন সেই পবিত্র ভূমি সৌদি আরবেও ভাস্কর্য রয়েছে। সেখানে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হচ্ছে এখানে যারা পাকিস্তানি ভাবধারার ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাদের। বঙ্গবন্ধু এদেশের মানুষের ম্যানডেট নিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার ভিত্তিতেই তিনি রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র সংবিধানে যুক্ত করেছিলেন। সেই সংবিধানের আলোকেই এ দেশ চলবে। কোনো মোল্লাতন্ত্র, মৌলবাদী ধারায় দেশ চলবে না। আর এটাকে কেউ বাধা দিলে প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নেবে।’
আওয়ামী লীগের আরেক যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘সংবিধানে বঙ্গবন্ধুকে সম্মান ও তার প্রতিকৃতি সংক্ষণের কথা বলা আছে। সেখানে বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করা হয়েছে। এটা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। আওয়ামী লীগ তো বটেই, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিশ্বাসী কেউই এই ঔদ্ধত্যকে মেনে নিতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে, জাতির পিতা বা বঙ্গবন্ধু প্রশ্নে কোনো আপস তো হতে পারে না। রাজনৈতিক-প্রশাসনিকভাবে সব ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়া হবে।’





