মুহাম্মদ তারিক জামিল
ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের প্রিয় বাংলাদেশে আদমশুমারির তথ্যানুযায়ী প্রায় নব্বই শতাংশ মুসলিমের বসবাস। এই নব্বই শতাংশ মুসলিম, ধর্মীয় ইবাদত-বন্দেগি করার লক্ষ্যে নিজস্ব উদ্যোগে, নিজস্ব অর্থায়নে তিন লাখের অধিক মসজিদ গড়ে তুলেছেন। আধুনিক স্থাপত্যরীতি ও চোখ ধাঁধানো নান্দনিকতা খুব একটা না থাকলেও, রাজধানী ঢাকাতেই বিশাল সংখ্যক মসজিদ রয়েছে। সে হিসেবে বিশ্বের বুকে ঢাকার পরিচিতি মসজিদের শহর। সারা সপ্তাহে মুসল্লিদের খুব একটা মসজিদে দেখা না গেলেও, শুক্রবারের জুমায় কানায় কানায় ভরপুর হয়ে ওঠে। তাকবির-তাসবিহে মনকাড়া দৃশ্যের অবতারণা ঘটে।
এতো সংখ্যক মসজিদ আর মুসলিমের দেশ হলেও মসজিদের বাইরে ইসলামের অনুশীলন অনেকাংশেই অনুপস্থিত। নামাজের সময় যে অর্থে ইমামকে নেতা বানিয়ে তার ইক্তেদা করা হয়। ঠিক একই অর্থে সমাজব্যবস্থায় ইমামের নেই কোনো নেতৃত্ব। চোখে পড়ার মতো নেই কোনো কার্যক্রম। ফলে অধিকাংশ মুসলিমই মনে করেন, মসজিদ শুধু নামাজ-কালাম পড়ারই স্থান। সামাজিক কাজে মসজিদের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। ইমামের নেই কোনো সামাজিক দায়বদ্ধতা।
আপনি খোলাফায়ে রাশেদীন ও ইসলামের সোনালী যুগের দিকে লক্ষ করুন। সে সময়গুলোতে মসজিদকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজের সব কার্যক্রম সমাধা হতো। সামাজিক বিচার-আচার, বিবাহ-শাদী ইত্যাদি কার্যক্রম মসজিদকে ঘিরেই অনুষ্ঠিত হতো। রাষ্ট্রীয় ফরমান, সতর্কবার্তা, এমনকী যুদ্ধের মতো ঘোষণাও মসজিদের মিম্বার থেকে ঘোষিত হতো। কিন্তু যখন থেকে মসজিদ থেকে সামাজিক কার্যক্রম পৃথক হতে লাগলো, তখন থেকেই নেতৃত্বেও বিভাজন হতে লাগলো। ইসলাম আটকে থাকলো মসজিদে আর ব্যক্তিগত পর্যায়ে। সমাজ ও রাষ্ট্র হতে লাগলো ইসলামি অনুশাসনহীন।
বিংশ শতাব্দীর এই সময়ে এসে রাষ্ট্রকে ইসলামিকরণের আহ্বান জোরদার হচ্ছে। মাশাল্লাহ এটি খুবই ইতিবাচক। সব সময়ই একদল লোক ইসলামিকরণের পক্ষে প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে। অতীতের প্রচেষ্টাগুলো ব্যক্তিনির্ভর হলেও বর্তমানে সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় শহর থেকে নিভৃত গ্রামাঞ্চলেও ইসলামিকরণের দাবিতে কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। এটির পাশাপাশি সমাজকেও ইসলামিকরণের দিকে নিয়ে যেতে হবে। না হয় রাষ্ট্রক্ষমতায় বসেও ইসলামি সমাজ গঠন সম্ভব হবে না। তবে সমাজ যদি ইসলামিকরণের দিকে এগিয়ে যায় তবে রাষ্ট্র চাইলেও ইসলামবিরোধী আইন কার্যকর করতে পারবে না। কারণ রাষ্ট্র মূলত সমাজগুলোরই প্রতিনিধিত্ব করে। রাষ্ট্রের মজবুত উপাদান এই সমাজব্যবস্থাই। এজন্য প্রতিটি সমাজের রীতিনীতিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে আইনের আদি উৎস বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। এমনকী ইসলামি সমাজও পূর্বযুগের কিংবা আঞ্চলিক উপকারী রীতিনীতিকে বহাল রাখার অনুমোদন দিয়েছে। অতএব, আমি মনে করি ইসলামি সমাজ ব্যতীত, ইসলামি রাষ্ট্র অন্তঃসারশূন্য হবে।
মসজিদকে কেন্দ্র করে, সামাজিক কাজ ও ইমামের সামাজিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় কিছু কৌশল নিচে তুলে ধরা হলো-
এক. মসজিদকে কেন্দ্র করে সামাজিক কাজের জন্য ইমাম সাহেবের নেতৃত্বে মহল্লাভিত্তিক ইসলামি সমাজকল্যাণ সংঘ গড়ে তোলা। এলাকার সব মুসল্লি এর অঘোষিত সদস্য হবে। নিয়মিত নামাজিরাই এর কার্যক্রম পরিচালনা করবে। অপেক্ষাকৃত তরুণদেরকে কাজে যুক্ত করে মুরুব্বিরা উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করবে।
দুই. মুসল্লিদের স্বেচ্ছায় দান ও এককালীন অনুদানই এর একমাত্র আয়ের উৎস। আমানতদার ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে যথাযথ কাগজপত্রে লিখিত আকারে বার্ষিক অডিটের মাধ্যমে এর সর্বোচ্চ সংরক্ষণের প্রচেষ্টা করতে হবে।
তিন. ঈদ, দুর্যোগকালীন ও শীতকালীন সময়ে মহল্লার ধনবান মুসল্লিদের উৎসাহিত করে দরিদ্র মুসল্লিদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালাতে হবে।
চার. কুরবানীর সময় মহল্লায় যারা কুরবানি দেয় তাদের থেকে গোশত সংগ্রহ করে, যারা দিতে পারেনি, তাদের লিস্ট করে ইমাম সাহেবের নেতৃত্বে তাদের বাসায় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চালাতে হবে।
পাঁচ. কর্জে হাসানার প্রতি উৎসাহিত করে কর্জে হাসানাহ ফান্ড গঠন করতে হবে। আপতকালীন সময়ের জন্য, সাক্ষীসহ লিখিত আকারে উক্ত ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। অনিয়ম করলে শাস্তির বিধানও রাখা যেতে পারে।
ছয়. মক্তব চালুকরণ। সব শিশুর মক্তব গমন নিশ্চিত করা। বয়স্কদের কোরআন শিক্ষাসহ জরুরি মাসআলা-মাসায়েল শেখানোর ব্যবস্থা করা। পর্দাসহকারে মহিলাদের জন্য সাপ্তাহিক কিংবা মাসিক তালিম তারবিয়াতের ব্যবস্থা করা।
সাত. বিয়েশাদী মসজিদে করার জন্য উৎসাহিত করা। অবশ্য ওলিমার আয়োজন মসজিদের বাইরে হওয়া চাই। না হয় মসজিদের আদব রক্ষা করা সম্ভব হবে না। আট. সামাজিক বিচার-আচার মসজিদ প্রাঙ্গণে করার ব্যবস্থা করা। ঝগড়া ও দ্বন্দ্ব নিরসনে উদ্যোগ গ্রহণ করা।
নয়. মানুষকে মসজিদমুখী করার জন্য উৎসাহিত করা। বিশেষকরে নতুন প্রজন্মকে টার্গেট করে ইসলামের দিকে নিয়ে আসা। এক্ষেত্রে নামাজ পড়লে শিশুদের উৎসাহ দিতে পুরস্কার প্রদান করা যেতে পারে।
দশ. মসজিদভিত্তিক পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করে ইসলামি জ্ঞানচর্চার ব্যবস্থা করা। ঈমান সংক্রান্ত আলোচনাগুলো ও আরকানুল ইসলামের আলোচনা বেশি বেশি প্রদান করা। এগারো. মাসিক, পাক্ষিক কিংবা সাপ্তাহিক তাফসিরুল কোরআন মাহফিল, দারসুল হাদিস বা ইসলাহি মজলিসের আয়োজন করা।
আপাতত এই কার্যক্রমগুলোর উদ্যোগ নিতে পারলে আশা করা যায় পর্যায়ক্রমে কাজের পরিধি বিস্তৃত হতে থাকবে। তবে যে কোনো কাজের জন্য শরীয়াহর মানদণ্ড ঠিক রাখা আবশ্যক। উপরিউক্ত কাজগুলো একজন ইমাম সাহেবের পক্ষে আঞ্জাম দেওয়া খুব একটা কঠিন হবে বলে মনে হয় না। এভাবে কাজ করলে ইমাম সাহেবের সামাজিক নেতৃত্বও দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হতে থাকবে আশা করি। সমাজ ইসলামিকরণের দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে থাকবে ইনশাআল্লাহ!
লেখক : ফাজেল, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা





