অধিকাংশ হাসপাতালের বেড পূর্ণ, নতুন মৃত্যু ১৮, আক্রান্ত ৩৫৫৪

সংগৃহীত ছবি

জাতীয়

অধিকাংশ হাসপাতালের বেড পূর্ণ, নতুন মৃত্যু ১৮, আক্রান্ত ৩৫৫৪

ভয়ংকর রূপ নিতে পারে করোনা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৪ মার্চ, ২০২১

দেশে করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের হার প্রতিদিনই বাড়ছে। গত ১ মার্চ থেকে শনাক্তের হার চার শতাংশের ওপরে উঠতে শুরু করে। গত একদিনে শনাক্তের এই হার গিয়ে দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৬৯ শতাংশেযা গত ৯ মাসের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ সংক্রমণ। এ ধারা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরো ভয়ংকর রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা

গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত একদিনে সারা দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ৫৫৪টি। এ নিয়ে মোট ৫ লাখ ৭৭ হাজার ২৪১ জনের মধ্যে করোনার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। নতুন করে যে ১৮ জন করোনা সংক্রমণ নিয়ে মারা গেছেন, তা নিয়ে দেশে মোট ৮ হাজার ৭৩৮ জন মারা গেলেন।

স্বাস্থ্য ও রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত তিন সপ্তাহ ধরে যে হারে করোনা রোগী বাড়ছে এই ধারা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। সংক্রমণ বাড়তে থাকলে করোনা রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা দিতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যে অবকাঠামো রয়েছে তা ভেঙে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে আইসিইউতে বেড একেবারেই ফাঁকা পাওয়া যাচ্ছে না। করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে গত বছরের মতো রোগী নিয়ে হাসপাতাল হাসপাতাল ঘুরতে হতে পারে।

এ বিষয়ে বিএসএমএমইউর ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, করোনা পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। কয়েকদিন যাবৎ ক্রমাগতভাবে শনাক্ত রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। ফলে গত বছরের মার্চের চেয়ে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি এবার আরো ভয়াবহতার দিকে চলে যাচ্ছে। করোনার এ গতিকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো যেটা আছে সেটা ভেঙে পড়বে।

তিনি বলেন, সব দেশেরই করোনা রোগীদের চিকিৎসাদানের নির্ধারিত সামর্থ্য রয়েছে। তার বাইরে চলে গেলেই শনাক্তকৃত রোগী ও মৃত্যু বাড়ে। ফলে সামাজিকভাবেও তখন নৈরাজ্য, অস্থিরতা ও অসহায়ত্ব চলে আসে।

তিনি আরো বলেন, ভ্যাকসিন কোনো সমাধান নয়, এটি সহায়ক মাত্র। মুখে মাস্ক পরিধান করা, ঘর থেকে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হওয়া এবং জনসমাগম এড়িয়ে চলাটাই এখন করোনা সংক্রমণ রোধের উপায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে করোনা রোগীদের জন্য সাধারণ শয্যা রয়েছে ১০ হাজার ৪৩৭টি। এ মুহূর্তে অর্ধেকের বেশি শয্যা পূর্ণ। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র রয়েছে ৫৫৮টি। এর মধ্যে হাতে-গোনা কয়েকটি খালি আছে। তবে রাজধানী ঢাকার করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত ১০টি সরকারি হাসপাতালের দুই হাজার ৩৮১টি শয্যার মধ্যে ফাঁকা রয়েছে মাত্র কয়েকশ। এই হাসপাতালগুলোর ১১৭টি আইসিইউর মধ্যে রোগী আছেন শতাধিক।

অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত নয়টি বেসরকারি হাসপাতালে সাধারণ শয্যা রয়েছে ৮৬৩টি, যার মধ্যে রোগী ৩৬৮ জন। আইসিইউ শয্যা রয়েছে ১৬৪টি আর রোগী আছেন ১২০ জন। করোনা ডেডিকেটেড একাধিক হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, কয়েকদিনে রোগী বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। এবারকার রোগীদের জটিলতা বেশি এবং দ্রুত তাদের অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

কোভিড সংক্রমণ পরিস্থিতির সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় গত সোমবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের উপসচিব ড. বিলকিস বেগম রাজধানীর পাঁচটি সরকারি হাসপাতালকে সার্বিকভাবে নতুন করে প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে চিঠি দেন।

হাসপাতাল পাঁচটি হলো-মিরপুরের লালকুঠি হাসপাতাল, বাবুবাজারের ঢাকা মহানগর হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মহাখালীর ডিএনসিসি করোনা আইসোলেশন সেন্টার এবং ফুলবাড়িয়ার সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর পান্থপথের একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক বলেন, জানুয়ারির শেষের দিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভেবেছিল করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডটি আর রাখা হবে না। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে রোগী বাড়তে শুরু করে। সংক্রমণ কমে আসতে থাকায় সরকার ডেডিকেটেড হাসপাতালের সংখ্যাও কমিয়ে আনে। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল বলে কিছু রাখা ঠিক নয়, তাতে নন-করোনা আক্রান্ত রোগীদের ভোগান্তি হয়।

রোগী খুবই আগ্রাসীভাবে বাড়ছে, বললেন সিলেটের একমাত্র করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল শহীদ শামসুদ্দীন আহমেদ হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক। তার মতে, এভাবে রোগী বাড়তে থাকলে তাদের হাসপাতালে ভীষণ চাপ পড়বে। গত ২৪ ঘণ্টায় ১০ জন ভর্তি হয়েছেন। ১২ শয্যার আইসিইউতে ১২ জন রোগী। ওয়েটিং লিস্ট বাড়ছে। হাসপাতালের জনবল যা ছিল, সেটা কিছুদিন আগেও বেশি মনে হচ্ছিল। রোগী কমে যাবে, এ ধারণা থেকে চিকিৎসকদের অনেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলিও হয়েছেন। সেখান থেকে তাদের আবার আনা কঠিন, কিন্তু রোগী তো বাড়ছেই। হাসপাতালে চিকিৎসকদের রোস্টার নিয়েও রীতিমতো অসন্তোষ দেখা দিয়েছে, বলেন তিনি।

ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে বলেন, ঢাকার ভেতর কেবল পরিপূর্ণভাবে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল করোনা ডেডিকেটেড। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোভিড ও নন-কোভিড দুই রোগীরই চিকিৎসা হয়। কিন্তু এখনই দেখা উচিত, সামনে যে ঢেউ আসছে তা সামলানোর মতো যথেষ্ট প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে কি না। কুর্মিটোলাতে যে পরিমাণ নার্সিং স্টাফ নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তাদের অনেককে এখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া টিকাদান কার্যক্রমের জন্য এই দুই হাসপাতালেই একটা বড় সংখ্যক জনবল নিয়োজিত। এসবের কারণেও রোগী ম্যানেজমেন্ট কঠিন হয়ে পড়েছে।

হাসপাতাল ব্যবস্থার প্রস্তুতি নিয়ে জানতে চাইলে কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, রোগী বাড়ছে এবং আরো বাড়বে। এখনই হাসপাতালের সাধারণ শয্যা ও আইসিইউ বাড়াতে হবে। প্রতিটি হাসপাতালে হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা, অক্সিজেনসহ অন্যান্য সুবিধা বাড়াতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গঠিত পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য আবু জামিল ফয়সাল বলেন, হাসপাতালের প্রস্তুতি আগের তুলনায় ভালো থাকার কথা। তবে গত বছরে যেসব কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোকে আবার একই পর্যায়ে নিয়ে আসা উচিত।

রোগী বাড়ছে, তাই হাসপাতালের প্রস্তুতি কেমন জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. ফরিদ উদ্দিন মিঞা বলেন, তাদের শয্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কী পরিকল্পনা রয়েছে জানতে চাইলে বলেন, শুধু কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালেই রোগী ভর্তি রয়েছে। অন্যান্য হাসপাতালে বেড ফাঁকা। রোগী বাড়লে ঢামেক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ, মিটফোর্ড হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালে ব্যবস্থা করা হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads