ভোলায় ক্রমেই বাড়ছে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। প্রচণ্ড গরমে ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩২৫ জন রোগী। শুধু গত ১০ দিনে ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে জেলার সাত উপজেলার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৫২ জন রোগী। একসাথে এত রোগীর চিকিৎসাসেবা দিতে একদিকে যেমন হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা, অন্যদিকে শয্যা সংকটে ভর্তি হওয়ায় বেশিরভাগ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন হাসপাতালের বারান্দার ও মেঝেতে। একসাথে এত রোগীর চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
ভোলার সিভিল সার্জন দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, গত ১০ দিনে ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে জেলার সাত উপজেলার হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছে ২ হাজার ৫২ জন রোগী। এর মধ্যে ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৩২ জন, দৌলতখানে ১৬২ জন, বোরহানউদ্দিনে ৪৩০ জন, তজুমদ্দিন ১১৬ জন, লালমোহনে ১৭১ জন, চরফ্যাশনে ২৪৫ জন ও মনপুরায় ৯৬ জন ভর্তি হয়েছেন। আর ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ৩২৫ জন।
সরেজমিন গতকাল মঙ্গলবার ভোলা সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ১০০ শয্যার পুরোনো ভবনের পুরোটাজুড়ে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী। বারান্দার দুই পাশে মেঝেতে আছে শতাধিক ডায়রিয়া আক্রান্ত নারী-পুরুষ ও শিশু। ১০ শয্যার ডায়রিয়া ওয়ার্ডের সামনে থেকে শুরু করে পুরুষ সার্জারি ওয়ার্ড ও পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডের বারান্দার মেঝের দুই সারিতে শুয়ে আছে ডায়রিয়া রোগী। কেউ কেউ জায়গা না পেয়ে রোগী আনা নেওয়ার ট্রলিতে থেকেই নিচ্ছেন চিকিৎসা। রোগী ও স্বজনদের ভিড়ে হাসপাতালের বারন্দায় সাধারণ মানুষের চলাচলের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আর এতসব রোগীর সেবা দিচ্ছেন মাত্র দুজন নার্স। এসব রোগীকে সেবা দিচ্ছেন। একসাথে এত রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েন তারা। তারপরও থেমে নেই। রোগীদের ওষুধ, স্যালাইন ও ইনজেকশন পুশ করতে ছোটাছুটি করছেন তারা। থেমে নেই ওয়ার্ড বয় ও ঝাড়ুদারও। ডাক্তার ও নার্সদের পাশাপাশি তারাও তাদের সাধ্যমতো রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের পরিসংখ্যান দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, চলতি মাসে ২০ দিনে ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে ৩ হাজার ৬৩৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। গত সাত দিনে ভর্তি হয়েছে ৭০৪ জন। আর গত ২৪ ঘণ্টায় ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে ১৫২ জন রোগী। হাসপাতালের ভর্তি হওয়া রোগীর স্বজন সদর উপজেলার ভেলুমিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মোতালেব মিয়া জানান, তার দুই মেয়ে শরীফা বেগম (১৫) ও জুলেখা (১০) দুদিন ধরে বমি ও পাতলা পায়খানায় ভুগছে। বাড়িতে অবস্থার অবনতি হলে তাদেরকে হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি করানো হয়। তবে শয্যা সংকটের কারণে ডায়রিয়া ওয়ার্ডের সামনের মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। একই কথা জানান ধনিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা জাকির হোসেন। তিনি বলেন, তার মা সেতারা বেগম ও স্ত্রী জুলেখা গত ৫ দিন ধরে ডায়রিয়া আক্রান্ত। প্রথমে বাড়িতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে ভোলা সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কিন্তু এখানে সিট না পেয়ে হাসপাতালের বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন তারা।
ভোলা সদর হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে দায়িত্বরত সিনিয়র স্টাফ নার্স জাকিনুর জানান, হাসপাতালে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এত রোগীকে চিকিৎসা দিতে প্রতি শিফটে মাত্র দুজন নার্স দেওয়া হয়। দুজন নার্স নতুন রোগী ভর্তি, ভর্তি রোগীদের ওষুধ, স্যালাইন ও ইনজেকশন পুশ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ ছাড়া ডায়রিয়া ওয়ার্ডে বেড কম থাকায় রোগীদের বারান্দার মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সিরাজুল ইসলাম জানান, ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৫০ জন রোগী সদর হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দিতে ডায়রিয়া ও করোনা ওয়ার্ডের জন্য আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নতুন আরো ১০ জন নার্স সদর হাসপাতালে পদায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি ডায়রিয়া পরিস্থিতি সামাল দিতে ১০ হাজার ব্যাগ সেলাইন আনা হয়েছে। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের কাছে আরো ৪ হাজার ব্যাগ সেলাইনের চাহিদা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
ভোলার সিভিল সার্জন ডা. সৈয়দ রেজাউল ইসলাম ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ডায়রিয়া রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পর্যাপ্ত ওষুধ-স্যালাইন সরবরাহ রয়েছে।
তবে রোগী বেড়ে যাওয়ায় আইভি স্যালাইন স্বপ্লতা দেখা দিতে পারে। গরমের কারণে ডায়রিয়া বেড়েছে। প্রতিটি হাসপাতালে ডাক্তার ও নার্স পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন বলেও জানান তিনি।





