বর্তমানে দেশে সরকার অনুমোদিত ১০৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১১টিতে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগকৃত উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ রয়েছে। বাকি ৯৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তৃপক্ষ নিজেরাই এসব পদ ভারপ্রাপ্ত হিসেবে নিয়োগ দিয়ে রেখেছেন দীর্ঘদিন। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব পদ রয়েছে শূন্য।
তবে এবার ভিসি-প্রোভিসি-ট্রেজারারবিহীন বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। থাকতে হবে স্থায়ী ক্যাম্পাস। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালিত না হলে বাতিল হতে পারে প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উপসচিব নাসরীন মুক্তি জানান, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শূন্যপদ পূরণে ইতোমধ্যে কর্তৃপক্ষের কাছে বেশ কয়েকবার তালিকা চাওয়া হয়েছে। শিগগির এসব তালিকা পাওয়া না গেলে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আইনানুগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০’-এর বড় ধরনের ব্যত্যয় ঘটলে সে প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল হয়েও যেতে পারে।
সূত্র জানায়, গত আগস্টে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসি ও কোষাধ্যক্ষের শূন্যপদ পূরণের ব্যবস্থা নেওয়া সংক্রান্ত এক ভার্চুয়াল মিটিং অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। সভায় শিক্ষামন্ত্রী বলেন, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারের শূন্যপদ রয়েছে। শিগগির এসব শূন্যপদ পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি, প্রো-ভিসি ও কোষাধ্যক্ষের পদ শূন্য রয়েছে তাতে নিয়োগের জন্য তিনজনের নাম প্রস্তাব করে মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের জন্য চিঠি পাঠায়। এরপরও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তা পাঠায়নি। এদিকে গত বৃহস্পতিবার (৭ জানুয়ারি) তৃতীয়বারের মতো চিঠি পাঠানোর উদ্যোগ নেয় মন্ত্রণালয়।
গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রেরিত চিঠিতে স্বাক্ষর করেন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা-১ এর উপসচিব নাসরীন মুক্তি। ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘উপযুক্ত বিষয় ও সূত্রের পরিপ্রেক্ষিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ অনুযায়ী, আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য/উপ উপাচার্য/ ট্রেজারারের শূন্য পদ পূরণের লক্ষ্যে উক্ত পদসমূহের বিপরীতে ৩ জনের প্যানেল প্রস্তুতপূর্বক প্রস্তাব ১০/০৯/২০২০ তারিখের মধ্যে প্রেরণের জন্য সূত্রোক্ত ১নং স্মারকে অনুররোধ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সূত্রোক্ত ২নং স্মারকে ৮.১০.২০২০ তারিখের মধ্যে প্রস্তাব প্রেরণের জন্য পুনরায় অনুরোধ করা হয়। কিন্তু অদ্যাবধি প্রস্তাব প্রস্তাব পাওয়া যায়নি।’
‘এমতাবস্থায়, উপাচার্য/উপ-উপাচার্য/ট্রেজারারের শূন্য পদ পূরণের লক্ষ্যে উক্ত পদের বিপরীতে ৩ জনের প্যানেল প্রস্তুতপূর্বক আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে আবশ্যিকভাবে প্রস্তাব এ বিভাগে প্রেরণের জন্য নির্দেশক্রমে পুনরায় অনুরোধ করা হলো। উল্লেখ্য, উক্ত তারিখের মধ্যে প্রস্তাব পাওয়া না গেলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিষয়টি অতীব জরুরি।’
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনানুযায়ী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ এই তিন পদে নিয়োগ দিতে একেকটি পদের বিপরীতে তিনজন অধ্যাপকের নাম প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। সেগুলোর ইউজিসির মাধ্যমে যাচাই করে সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেখান থেকে আচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি একজনকে নিয়োগ দেন।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ তথ্যমতে, শীর্ষ তিনটি পদই পূরণ আছে, এমন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংখ্যা মাত্র ১১। অভিযোগ আছে, আইন অমান্য করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজেদের মতো করে কাউকে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়, যা আইনের পরিপন্থী। কারণ, রাষ্ট্রপতি ছাড়া এই তিন পদে আর কেউ নিয়োগ দিতে পারেন না।
রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগকৃত উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ রয়েছেন যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে : ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি (আইইউবিএটি), আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম (আইআইইউসি), ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, সিটি ইউনিভার্সিটি, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ, বরেন্দ্র ইউনিভার্সিটি, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি এবং নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।
অন্যদিকে সকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী ক্যাম্পাস বাস্তবায়নের জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। কমিশন সূত্র জানায়, দেশে অনুমোদনপ্রাপ্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে এখনো গড়িমসি করছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ অনুযায়ী অনুমোদনের ১২ বছরের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রথমে সাত বছরের জন্য সাময়িক সনদ পায়। এরপর তা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত নবায়নের সুযোগ আছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণে ন্যূনতম এক একর এবং অন্যান্য এলাকায় কমপক্ষে দুই একর অখণ্ড জমি থাকতে হবে।
ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, নির্ধারিত সময় পার করেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি। কিছু প্রতিষ্ঠান দূরে স্থায়ী ক্যাম্পাস করার পরও ভাড়া বাড়িতেই কার্যক্রম চালাচ্ছে। অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবেও যাচ্ছে না। করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে আমরা এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে পারিনি। আশা করছি, আর দু-তিন মাস পর করোনার সমস্যা কেটে যাবে। এরপর আমরা অ্যাকশনে যাব। ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান অবস্থা জানতে আমরা কাজ শুরু করেছি।





