সারা দেশ

বেকারদের আত্ব-কর্মসংস্থানে ভূমিক রাখছে নীলফামারীর টিটিসি

  • ''
  • প্রকাশিত ২৪ এপ্রিল, ২০২৪

তৈয়ব আলী সরকার,নীলফামারী প্রতিনিধি:

তৃর্ণমুলে বেকার যুবদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে নানামুখী পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় বেকারদের স্বাবল্বী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে নীলফামারী সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি)।

সারা দেশের মধ্যে নীলফামারী টিটিসি এবং টেকনিক্যাল কেন্দ্রগুলোর মধ্যে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে প্রথম স্থান অর্জন করায় অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক টিটিসি নীলফামারীকে “আলোক বর্তিকা মডেল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র” হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। যা বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো। এখানে বিভিন্ন মেয়াদে প্রশিক্ষণ নিয়ে কর্মরত আছেন বিদেশে, তেমনি স্থানীয়ভাবে চাকরি করে অথবা উদ্যোক্তা হয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন অনেকেই।

টিটিসি কর্তৃপক্ষ জানায়, ‘২ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হয় প্রতিষ্ঠানটি। এর ভিতরে রয়েছে অ্যাকাডেমিক ভবন, ছাত্রাবাস (আবাসিক হোটেল) ও অধ্যক্ষের বাসভবন। শুরুতে এখানে চারটি ট্রেডে প্রশিক্ষণ শুরু হলেও এখন ২০টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ চলছে। অপরদিকে, জায়গার অভাবে কিছু কিছু ট্রেডের প্রশিক্ষণ প্রদানে ব্যাঘাত ঘটছে। রয়েছে শিক্ষক স্বল্পতাও। স্থায়ী, অস্থায়ী ও পার্টটাইম মিলে শিক্ষক রয়েছে ২০ জনের মতো। এই বিশাল কর্মযক্ষের মধ্যে শিক্ষক স্বল্পতা, শিক্ষার্থীদের হাতেনাতে প্রশিক্ষণের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে ৪টি কারিগরি ট্রেড এবং নবম ও দশম শ্রেণি অধ্যয়নের দুটি ভোকেশনাল ট্রেড খোলা হলেও এখন ট্রেড রয়েছে ২০টি। এরমধ্যে ভকেশনাল ট্রেড ১২টি, ভাষা ট্রেড তিনটি ( চায়না, জাপান ও কোরিয়া) স্পেশাল কোর্স পাঁচটি ট্রেডে (রোড রোলার,ফর্কলিপ্ট, ড্রাউভিং, হাউস কিপিং) প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এখানে। প্রতি ট্রেডে ৪০জন করে মোট প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা ৮০০জন। ট্রেড ভেদে একমাস থেকে শুরু করে ছয় মাস পর্যন্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ যাবত প্রায় পাঁচ হাজার ছেলে মেয়ের আত্ব-কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে টিটিসি।

চলতি বছরের ভাষা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন ৫০ জন। এরমধ্যে ১৮জন চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় প্রবাসে প্রতিজন বাংলাদেশি টাকায় দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা বেতনে দক্ষিণ কোরিয়ায় যাবেন বলে বিষয়টি নিশ্চিত করেন টিটিসির অধ্যক্ষ মো. জিয়াউর রহমান। তিনি জানান, আগামী মাসে আরো ১০ জন বিদেশ গমনের তালিকায় রয়েছে। এছাড়াও গত বছরে কোরিয়ান ভাষা প্রশিক্ষণ নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে ২০জন। ইতোমধ্যে নীলফামারী টিটিসিতে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ নিয়ে ১৭ জন জাপানে কর্মরত আছেন। এরমধ্যে নারী রয়েছে একজন।

ভাষা শিখে দক্ষিণ কোরিয়ায় যাওয়ার তালিকায় থাকা নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার শ্রীরামগাড়ী গ্রামের নওশাদুজ্জামান বলেন, বিএসসি পাশ করে বেকার আছি। আমার পক্ষে দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়ার কথা মুখে আনাই ছিল স্বপ্নের মতো। কিন্তু নীলফামারী সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (টিটিসিতে) ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে সেই স্বপ্ন আজ বাস্তবায়নের পথে। বর্তমানে সকল প্রক্রিয়া শেষ। আশা করি, আগামী মাসে বিদেশে যেতে পারবো ইনশাল্লাহ।

নীলফামারী সদরের কুন্দুপুকুর ইউনিয়নের পাটকামরী গ্রামের হাজিপাড়ার শাহ্জাহান আলী জানান, অভাব অনাটনের মধ্যে লেখা পড়া করে আজকে মাস্টারস্ ফাইনাল পরীক্ষার্থী। অভাবী সংসারে বাবার কাঁধে বোঝা হয়ে না থেকে বিদেশ যাওয়ার সিন্ধ্যান্ত নেই। এরপর ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসের শেষ দিকে ছয় মাসের কোরিয়ান ভাষা প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন কোরিয়ার যাওয়ার চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছি। সরকার যেহেতু স্বপ্ল খরচে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। তাই সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পরিবারের সচ্ছলতা আনতে চাই।

দক্ষিণ কোরিয়ায় যাওয়ার জন্য চূড়ান্ত তালিকায় থাকা আরেকজন পঞ্চগড় জেলার দেবিগঞ্জ উপজেলার মালচন্ডি ডেকের ডাঙ্গা গ্রামের আল মামুন বলেন, আমি নীলফামারী সরকারি কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। পরিবারের সচ্ছলতা আনতে অনেক চেষ্টা করেও কোন কাজ বা চাকরি যোগাড় করতে পারিনি। বন্ধুদের মাধ্যমে খবর পেয়ে, টিটিসিতে ছয় মাসের ভাষা প্রশিক্ষণ নিয়ে কর্মসংস্থানে দক্ষিণ কোরিয়া যাওয়ার চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছি।

টিটিসির কোরিয়ান ভাষা প্রশিক্ষক মো. সুজাউদ্দিন খাঁন রনি জানান, ‘কোরিয়ায় বাংলাদেশিদের চাকুরির সুযোগ অনেক,অনেক গুন বেশী। তাদের ভাষা না জানায় আমরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারছি না। টিটিসিতে কোরিয়ান ভাষা প্রশিক্ষণ কোর্স চালু হওয়ায় বেকারদের জন্য আত্ব-কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এতে সরকারও বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছেন। উন্নত হচ্ছে দেশ, ঘুচছে বেকারত্ব।’

তিনি জানান, ‘সম্প্রতি কোরিয়া আন্তর্জাতিক সেচ্ছাসেবী সংস্থার ভলান্টিয়ার কোরিয়ান ভাষা প্রশিক্ষক জং ইলুউ ও সংস্থার প্রোগ্রাম ম্যানেজার অবসর প্রাপ্ত কর্নেল জ-কিংকিম নীলফামারী টিটিসিতে প্রশিক্ষণার্থীদের কোরিয়ান ভাষা শেখার আগ্রহ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের বেকার ছেলে মেয়েদের আত্ব-কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে কোরিয়ানদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’

টিটিসির অধ্যক্ষ বলেন, ‘দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে কারিগরি প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। এখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে, বিদেশে কর্মসংস্থানের বিরাট সুযোগ রয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত উত্তর অঞ্চলের নীলফামারীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার বেকার ছেলে, মেয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। তারা রেমিটেন্স যোদ্ধা হিসেবে পরিবারসহ দেশের কল্যাণে কাজ করছে। এই কেন্দ্র থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বেকার যুবক যুবতী প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের পায়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।’

তিনি আরও জানান, ‘জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই, মালোয়শিয়া, গায়ানা, সৌদি আরব, কম্বোডিয়া সহ বিভিন্ন দেশ থেকে পাঠানো রেমিটেন্স দিয়ে স্বয়ং সম্পূর্ণ হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। এতে করে যেমন দেশের বেকারত্বের হার কমছে তেমনি নিম্ন আয়ের মানুষের ফিরছে আর্থিক সচ্ছলতা। যার ফলে উন্নত হচ্ছে দেশের মানুষের জীবনমান। চাঙ্গা হচ্ছে দেশের অর্থনীতির চাকা। এতে করে কমছে বেকারত্ব ও দালালদের দৌরাত্ম্যও। স্বস্তিতে বিদেশে গমন করতে পারছেন দক্ষ জনসম্পদ।’

নীলফামারী চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইনডাষ্ট্রির সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, ‘কিছু অসাধু দালাল চক্রের ক্ষপ্পরে পড়ে লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে গিয়ে হয়রানির শিকার হয় বেকার যুবারা। টিটিসি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। এখান থেকে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বল্প খরচে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। উত্তরের জেলা নীলফামারীর টিটিসি আমাদের গর্ব। তিনি বলেন, কেন্দ্রটির গতি বাড়াতে জনবল নিয়োগসহ (প্রশিক্ষক) জমি অধিগ্রহণের দাবি জানান তিনি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads