মুক্তমত

বিশ্বরাজনীতি ও ভাষা প্রসঙ্গ

  • প্রকাশিত ২১ জানুয়ারি, ২০২১

তাসনিম হাসান আবির

 

 

যে কোনো একটি সমাজ, রাষ্ট্র, সভ্যতার জন্য ভাষা অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ভৌগোলিক কারণে একেক দেশে জনগণের আঞ্চলিক ভাষা একেক রকম হয়ে থাকে। প্রতিটি ভাষার পেছনে থাকে অজস্র অজানা গল্প, ইতিহাস। প্রতিটি ভাষাই তার নিজস্ব জনগণের ইতিহাস, ঐতিহ্য, গৌরব বহন করে। বর্তমানে পৃথিবীতে সাড়ে তিন হাজার ভাষা প্রচলিত আছে। ভাষাভাষীর দিক থেকে বাংলা বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে আছে। বাংলাদেশ ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, বিহার, ত্রিপুরা, উড়িষ্যায় বাংলা ভাষার প্রচলন আছে। ইংরেজি ভাষা হচ্ছে আন্তর্জাতিক ভাষা। পশ্চিমারা খুব সুকৌশলে তাদের মাতৃভাষা ইংরেজিকে বিশ্বদরবারে হাজির করে একে আন্তর্জাতিক ভাষায় পরিণত করেছে। তারা মোড়ল দেশের সুবিধা নিয়ে এই কাজটি করেছে। এবং এই ভাষা নিয়ে তারা প্রতিনিয়ত রাজনীতি করছে। বিশ্বে আগে সাত হাজারেরও বেশি ভাষার প্রচলন ছিল। কিন্তু বর্তমানে তা কমে এসে সাড়ে তিন হাজারে নেমেছে। বাকিসব ভাষা বিলুপ্ত বা হারিয়ে গেছে। অথচ প্রতিটি ভাষা কতশত গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতা, ইতিহাস বহন করত। কিন্তু পশ্চিমাদের এই ইংরেজি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার কৌশলে বাকি সবকিছু হারিয়ে যাচ্ছে সময়ের অতল গহ্বরে। পরাশক্তির দিক দিয়ে আমেরিকা বর্তমানে শীর্ষে অবস্থান করছে। তারা বিশ্বের অর্থনীতি থেকে শুরু করে বেশিরভাগ খাত নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের জীবনযাত্রার মান আকর্ষণীয় বিধায় বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশের জনগণ সেখানে পড়াশোনা বা জীবনযাত্রার জন্য গমন করে। আর সেখানে যাওয়ার অন্যতম শর্ত থাকে ইংরেজি ভালোভাবে জানা ও শেখা এবং নির্দিষ্ট মানদণ্ড অতিক্রম করা। ফলে এভাবে তারা সবকিছুর ভেতরে ইংরেজিকে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। তারা ইংরেজি ভাষাকে ঘিরে রাজনীতি করছে। যদিও ভাষার রাজনীতি এ বিশ্বে নতুন কিছু নয়। তবু বর্তমানে এই রাজনীতি প্রকট হয়ে আসছে। যুগে যুগে কালে কালে যে দেশ বিশ্বমোড়লে ছিল, তারা তাদের নিজস্ব ভাষা পুরো বিশ্বের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এখন পশ্চিমা বিশ্বও সেটাই করছে। তারা নিজেদের দেশে আকর্ষণীয় চাকরি, বাসস্থান, ভালো জীবনযাত্রার মান, পড়ালেখার আকর্ষণীয়তা সব মিলিয়ে ইংরেজির গুরুত্বকে বাড়িয়ে তুলেছে।

তারা শুধু এটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা তাদের নিজস্ব ভাষার সংস্কৃতি, সভ্যতা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের দিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। আর তথাকথিত আধুনিকতার মাপকাঠি হিসেবে ইংরেজি ভাষাকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। তাই পুঁজিবাদী এ বিশ্বে টিকে থাকার জন্য সব দেশ ইংরেজি শেখায় গুরুত্বারোপ করছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো এদিকে এগিয়ে। যদি বাংলাদেশের দিকেই আমরা তাকাই তাহলে দেখতে পাব, এদেশে এখন ইংরেজির গুরুত্ব অনেক ক্ষেত্রে বাংলার থেকেও বেশি। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষাকে গুরুত্বসহকারে পড়ানো হয়। ইংরেজি গ্রামার বাচ্চাদের একধরনের গিলেই খাওয়ানো হয়। এদেশের বিচার বিভাগে এখনো ইংরেজিতে রায় লেখা হয়। আইনের বেশিরভাগ বই ইংরেজিতে। এখনকার সিনেমা, নাটকেও ইংরেজির প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। বাচ্চারা এখন ছোটবেলা থেকেই ইংরেজি শেখা শুরু করে, তাই তারা এখন বাংলার থেকে ইংরেজি ভাষা বেশি বোঝে এবং বলতে পারে। বাংলা ভাষা পারাকে তারা আনস্মার্ট বলে মনে করে। অর্থাৎ উন্নত বিশ্ব এমনভাবে পরিকল্পনা করেছে যে, উন্নয়নশীল দেশের মানুষজন এখন নিজেদের মাতৃভাষা ছেড়ে ইংরেজি ভাষার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এই ভাষা শেখাকে তারা আধুনিক বা উচ্চমানের বলে মনে করছে।

যুগ যুগ ধরে আমাদের এই পৃথিবী বিভিন্ন সময় হাজার হাজার ভাষার মানুষজনকে ধারণ করে এসেছে। অনেকে তাদের মাতৃভাষা সহজে পায়নি। যেমন আমাদের মাতৃভাষা বাংলা পেতে আমাদের আন্দোলন করতে হয়েছে। আমাদের পূর্বপুরুষদের শহীদ হতে হয়েছে। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আমরা এই বাংলা ভাষা পেয়েছি। বাংলা আমাদের রক্তের ভাষা। রক্তের বিনিময়ে আমরা এই বাংলা ভাষা পেয়েছি। অথচ আজ বাংলা ভাষা শেখাকে মানুষ গুরুত্বহীন মনে করছে। পুঁজিবাদী এই বিশ্ব নিজেদের স্বার্থে হাজার হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতাকে ধ্বংস করছে। দিনকে দিন মানুষ আরো বেশি বেশি ইংরেজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছে। চাকরি পেতে হলে প্রথমেই আপনাকে ভালো ইংরেজি জানতে হবে। ইংরেজিতে দক্ষ হওয়া ছাড়া আপনি ভালো চাকরি পাবেন না বা চাকরি পেলেও সেখানে আপনি অপদস্থ হবেন। বিদেশে পড়ালেখা করতে চাইলে আগে ইংরেজিতে দক্ষ হতে হবে। অর্থাৎ আধুনিক সমাজে শিক্ষিত, উচ্চমানের নির্ণায়ক মাপকাঠি হচ্ছে ইংরেজিতে দক্ষ হওয়া। কিন্তু এটা হওয়া উচিত ছিল না।

এদিকে চীনও তাদের মান্দারিন ভাষা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপক চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা অর্থের বিনিময়ে সব কিনে নিতে চায়। অনুন্নত, স্বল্প উন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তারা প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করছে। ঋণের বোঝা চাপিয়ে তারা তাদের স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত। এসব দেশ থেকে প্রচুর মানুষ চীনা ভাষা শিখতে চীনে যাচ্ছে এবং নিজ দেশেও শিখছে। কারণ এসব দেশে চীন তাদের নিজেদের ভাষা শিক্ষার জন্য অনেক ইনস্টিটিউট করেছে।

তাছাড়া ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ, জার্মান ভাষাও বিশ্বের অনেক দেশে জনপ্রিয়। কারণ উন্নত জীবনযাপনের আশায় মানুষ এসব ভাষা শিখছে এবং এসব দেশে গিয়ে স্থায়ী হচ্ছে। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে পশ্চিমারা ভাষার রাজনীতিতে সব থেকে এগিয়ে। তারা প্রতিনিয়ত সর্বক্ষেত্রে এই রাজনীতি করছে। আর তাদের এই খেলায় হারিয়ে যাচ্ছে শতসহস্র বছরের ভাষার ঐতিহ্য। সামনে হয়তো আরো অনেক ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। অথচ এসব ভাষার পেছনে ছিল অসংখ্য না-জানা গল্প। সেসব ভাষায় ছিল আবেগ, অনুভূতিতে ভরা কাব্য, সাহিত্য। সেসব ভাষা ছিল গরিব, মেহনতি মানুষের মুখের ভাষা। অথচ আজ শুধু নিজেদের স্বার্থে পশ্চিমারা ইংরেজিকে আন্তর্জাতিক ভাষায় প্রতিস্থাপন করেছে। আজ জাতিসংঘসহ বিশ্বের সব আন্তর্জাতিক সংগঠনে ইংরেজি ভাষার খ্যাতি, প্রচলন। ইংরেজি ভাষা ছাড়া আপনি এসব জায়গায় ঢুকতেই পারবেন না। তাছাড়া পশ্চিমারা ইংরেজি ভাষা শিক্ষার নামে IELTS, GRE,  TOEFL-এর ব্যবসায় শুরু করেছে। তারা দেশে দেশে এটা মানদণ্ড দিয়ে রেখেছে। আর এসব শিখতে গেলে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে মানুষকে।

বাচ্চাদের ছোটবেলা থেকে বাংলার ওপর গুরুত্ব না দিয়ে ইংরেজির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলার ব্যাকরণ তারা জানে না, অথচ ইংরেজির কবিতা, ব্যাকরণ সব তাদের মুখস্থ। এসব একটি দেশের সভ্যতাকে নষ্ট করে দেয়। অন্য একটি ভাষা শেখা কখনো খারাপ কিছু না। আপনি চাইলে অবশ্যই অন্য একটি ভাষা শিখতে পারেন। তবে সেটিকে ধারণ করা যাবে না বা সেই ভাষার সংস্কৃতিকে নিজের বলে মনে করা যাবে না। আজ আমরা বাংলা নববর্ষের থেকে ইংরেজি নববর্ষ অনেক ধুমধাম করে পালন করি। ইংরেজি নববর্ষে আতজবাজি ফুটাই, ফানুশ উড়াই, পার্টি করি। অথচ বাংলা নববর্ষে এমন উৎসব আমরা পালন করি না। মোটকথা হচ্ছে, আমরা এখন নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতির থেকে ইংরেজি ভাষা, সংস্কৃতিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আমরা পড়ালেখা শেষে বিদেশে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব থাকি। নিজের দেশের চলচ্চিত্রের থেকে হলিউডের চলচ্চিত্র বেশি দেখি। পশ্চিমা সংস্কৃতি অনুযায়ী চলাকে আমরা আধুনিক মনে করি। পশ্চিমারা তাদের কৌশলে সফল। তারা সব জায়গায় ইংরেজি ভাষাকে গুরুত্বের সঙ্গে প্রতিস্থাপন করে দিয়েছে। ইংরেজরা যখন যে দেশে নিজেদের শাসন চালিয়েছে, তখন সে জায়গা থেকে যাওয়ার সময় এমন ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়ে গেছে যে, সেখানকার মানুষ স্বাধীন হয়েও পরোক্ষভাবে পরাধীন। তারা ইংরেজদের ওপর নির্ভরশীল।

ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা, সংস্কৃতি এসব যদি আমরা বাঁচাতে চাই তবে অবশ্যই ভাষা নিয়ে রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। আন্তর্জাতিক একটি ভাষা থাকবে, তবে সেটার জন্য অন্যসব ভাষাকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেওয়া যাবে না। হাজার হাজার বছরের এ পৃথিবীর যে ইতিহাস সেটা আমাদের গর্বের। নানান ভাষার, নানান জন নিয়েই আমাদের এই দুনিয়া। তাই কোনো কুৎসিত উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য আমরা এই চিরাচরিত ঐতিহ্য নষ্ট করব না। বিশ্বমঞ্চের কাছে এটাই আহ্বান যে, যেসব ভাষা ইতোমধ্যে বিলুপ্তি হয়ে গেছে, সেগুলোকে উদ্ধার করতে আর যেসব ভাষা বিলুপ্তির পথে সেগুলোকে সংরক্ষণ করতে। ভাষা নিয়ে রাজনীতি না করে ভাষার সুষ্ঠু সংরক্ষণই হোক আমাদের মূলনীতি।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads