শিক্ষাজীবনের শুরু থেকে অর্থাৎ প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত অসাধারণ অনেক শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষা পেয়েছি। তবে তাদের মধ্যে থেকে আলাদা করে ড. প্রফেসর অসীম সরকার স্যারের কথা বলতেই হয়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ ও সংস্কৃত বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান। তাই ছাত্র হিসেবে আমি তার একান্ত সান্নিধ্য পেয়েছি। তাকে কাছ থেকে দেখার ও শেখার সুযোগ পেয়েছি। যারা তার ক্লাস করেছেন, তারা তাকে চেনেন কিছু অংশ। যারা কাছ থেকে দেখেননি, তারা কখনো বুঝতে পারবেন না। শিক্ষা শুধু ক্লাসে দেওয়ার বিষয় নয়, বরং ক্লাসের বাইরের শিক্ষাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ- কথাটি স্যারের আচার-ব্যবহার ও চলাফেরায় স্পষ্ট। তাকে দেখে আমার এই ক্ষুদ্র জীবনের চলার পথে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ ও প্রেরণা পেয়েছি।
আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে দেশের সেরা বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া এবং স্যারের একজন ছাত্র হতে পারা। পরিশ্রম ও সততা থাকলে জীবনে একটা সময় সফলতা আসবে, স্যার প্রায়ই শিক্ষার্থীদের বলতেন। কথাটিতে আমি অনুপ্রেরণা পেয়েছিলাম। সবাইকে সময় অপচয় না করে শিক্ষার প্রতি মনোযোগ দেওয়ার কথা বলতেন। স্যারের কথা ও দিকনির্দেশনা আমার জীবনের গতিপথটাই পাল্টে দেয়।
স্যারের যে দিকটি আমার সবচেয়ে ভালো লাগত তা হলো তিনি শুধু লেকচারের মধ্যেই জ্ঞান বিতরণ সীমাবদ্ধ রাখতেন না। সংস্কৃত ও ব্যাকরণ চর্চার প্রতি প্রগাঢ় অনুরাগ ছিল স্যারের সবসময়। সেই সুবাদে তিনি সংস্কৃত ও ব্যাকরণের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করতেন। ক্লাসের পুরোটা সময় তিনি জ্ঞানের আলোয় মাতিয়ে রাখতেন শিক্ষার্থীদের। স্যারের পাঠদান এবং সুচিন্তিত আলোচনা থেকে সংস্কৃত ও ব্যাকরণের প্রতি আমার প্রচণ্ড আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। তখন থেকেই আমি প্রচুর বই পড়া শুরু করি। যা আমার ব্যক্তিগত চিন্তাধারা ও চিন্তাভাবনায় অনেক পরিবর্তন আনতে সাহায্য করেছে।
ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কেবল একজন শিক্ষকই তার ছাত্রদের প্রতিভাগুলো বুঝতে পারেন। বিভাগের বাইরেও তাকে পেয়েছি হলের প্রাধ্যক্ষ হিসেবে। ক্লাস রুমের বাইরে বিভাগের বিভিন্ন কাজে এবং আমার হলের প্রাধ্যক্ষ হিসেবে পাওয়ায় খুব কাছ থেকে তাকে জানার সুযোগ হয়েছিল। হলের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় তার ভূমিকা অসামান্য। আধুনিক জগন্নাথ হলের রূপকার বলা হয় তাকে। আমার প্রিয় শিক্ষকের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বলে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি।
স্যার শুধু শিক্ষক হিসেবেই সেরা ছিলেন না, ছিলেন সেরা মানুষও। তিনি অনেক বড় মনের মানুষ। কারো পরীক্ষা সংক্রান্ত কোনো সমস্যা হয়েছে, স্যারের কাছে গেলে তিনি সর্বদাই সমাধানের চেষ্টা করতেন। তিনি বলতেন, এটা আমার শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। কোনো শিক্ষার্থী কোনো বিষয় বা লেকচার বুঝতে না পারলে তিনি বারবার বোঝাতে চেষ্টা করতেন। বুঝতে না পারলে ফোন দিতে বলতেন শিক্ষার্থীদের। বলতেন, ‘তোমাদের জন্য আমার দরজা সবসময়ই খোলা।’ কঠিন বিষয়টিকে শিক্ষার্থীদের সহজ করে বুঝিয়ে দেওয়াই স্যারের অন্যতম গুণ। তিনি হতাশা ভুলিয়ে দিয়ে আশার বাণী শুনিয়েছেন, আশাবাদী করে তুলেছেন অনেক শিক্ষার্থীকে। শিক্ষার্থীদের হলে সিট নিয়ে কোনো সমস্যা হলে শিক্ষার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করে দেন। শিক্ষার্থীদের নিয়ে এত বেশি কাজ করেছেন বলেই সবাই স্যারকে ছাত্রছাত্রীবান্ধব শিক্ষক উপাধি দিয়েছেন।
বাবা-মায়ের পরই শিক্ষকের স্থান- একটা প্রচলিত প্রবাদ। কিন্তু আমার কাছে এই কথাটি কোনো অংশেই মিথ্যা নয়। আমার আত্মবিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিয়েছেন স্যার। অসীম স্যার শুধু আমার প্রিয় শিক্ষকই নন, আদর্শ ব্যক্তিও। তিনি সত্য ও সুন্দরের উপাসকও। স্যারকে হয়তো কখনো সামনাসামনি বলিনি, হয়তো এ লেখাটি স্যারের চোখে পড়তে পারে তাই বলতে পারি, ‘স্যার, একদিন আমিও ক্লাসভর্তি শিক্ষার্থীদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলব- ড. অসীম সরকার নামে একজন মহান ব্যক্তিত্বকে আমি শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম, আমি সৌভাগ্যবান।’
অনুপম কুমার দাস
লেখক : শিক্ষার্থী, মাস্টার্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়