বিশ্বকে শাস্তি দেওয়া ঠিক নয়: প্রধানমন্ত্রী

সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশ

বিশ্বকে শাস্তি দেওয়া ঠিক নয়: প্রধানমন্ত্রী

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ৮ জুলাই, ২০২২

একটি দেশকে শাস্তি দিতে গিয়ে সারা বিশ্বের মানুষকে শাস্তি দেওয়া কোনোভাবেই উচিত নয় বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অবরোধ আরোপ করে কোনো দেশ বা জাতিকে যে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, সেটাও প্রমাণিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

সারা বিশ্বের মানুষের দুর্ভোগের কথা ভেবে, অর্থনীতির কথা ভেবে রাশিয়ার ওপর আরোপ করা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন সরকারপ্রধান।

ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে আটতলা অফিস ভবন উদ্বোধন এবং বঙ্গবন্ধু কূটনৈতিক উৎকর্ষ পদক প্রদান অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, আমরা আশা করি যে একটি দেশকে শাস্তি দিতে যেয়ে বিশ্বের মানুষকে শাস্তি দেওয়া, এখান থেকে সরে আসাটা বোধ হয় বাঞ্ছনীয় এবং সেটা সবাই চাইবে। আমি এটা মনে করি।

করোনা মহামারির অভিঘাত থেকে অর্থনীতি যখন পুনরুদ্ধার হতে শুরু করেছে, তখনই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আবারো বিশ্ব অর্থনীতিকে ও বিশ্বের মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মন্তব্য করেন সরকারপ্রধান।

সরকারপ্রধান বলেন, তার ওপর আমেরিকা যে স্যাংশন (অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা) দিয়েছে, এই স্যাংশন দেওয়ার ফলে আমাদের পণ্যপ্রাপ্তিতে বা যেগুলো আমরা আমদানি করি, সেখানে বিরাট বাধা আসছে। শুধু তা-ই নয়, পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে এবং আমরা কোথায় আমাদের প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী পাব, সেই প্রাপ্তির ক্ষেত্রটাও সংকুচিত হয়ে গেছে।

আর এই প্রভাবটা শুধু বাংলাদেশ নয়, আমি মনে করি এটি আমেরিকা, ইউরোপ, ইংল্যান্ড থেকে শুরু করে সারা বিশ্বব্যাপী এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, মানুষ কিন্তু কষ্ট ভোগ করছে। পৃথিবীর মানুষ যে কষ্ট পাচ্ছে এই বিবেচনা বোধ উন্নত দেশগুলোর থাকা উচিত বলেও জানান শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, এটি আসলে উন্নত দেশগুলোর বিশেষভাবে বিবেচনা করা উচিত বা আমেরিকার এটি বিবেচনা করা উচিত। তারা যে স্যাংশন দিচ্ছে, তাতে যে তাদের দেশের লোকও কষ্ট পাচ্ছে, সেদিকেও কিন্তু তাদের দৃষ্টি দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

এই স্যাংশন যাদের বিরুদ্ধে দিচ্ছেন, তাদের আপনারা ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাচ্ছেন, কিন্তু তারা আসলে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? তার থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ হচ্ছে সব দেশে। সেই উন্নত দেশ, উন্নয়নশীল দেশ, সব দেশের মানুষ বা যারা নিম্ন আয়ের দেশ, সব দেশই কিন্তু কষ্ট পাচ্ছে।

কারণ করোনা মহামারি থেকে কেবল আমরা একটু উদ্ধার পাচ্ছিলাম, তখনই এই যুদ্ধ আর স্যাংশন। সত্যিই আমাদের জন্য বিরাট একটা চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমি মনে করি, স্যাংশন দিয়ে কোনো দেশ বা জাতিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। সেটা নিশ্চয়ই এখন দেখতে পাচ্ছেন। তার প্রভাবটা নিজেদের ওপর এসেও পড়ে। কাজেই এই স্যাংশন তুলে দেওয়া এবং পণ্য পরিবহন আর যুদ্ধ যারা করতে থাকেন, কিন্তু পণ্য পরিবহন বা আমদানি-রপ্তানিটা যেন সহজভাবে হয় আর সাধারণ মানুষ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। খাদ্য সারা বিশ্বের মানুষের সবচেয়ে ‘বড় চাহিদা’ বলেও মনে করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা।

তিনি বলেন, সেখানে সমস্যায় পড়ে গেছে অনেক উন্নত দেশও। আজকে আমরা যেটা খবর পাই বিভিন্ন দেশ থেকে, আমাদের অনেক লোক সেখানে বসবাস করে, প্রত্যেকের জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে যাচ্ছে। আর আমার দেশে, আমি সব সময় চেষ্টা করছি, আমাদের যে মাটি, মানুষ আছে, আমরা উৎপাদন বাড়াব। আমাদের খাদ্যটা যেন আমরা নিজেরাই উৎপাদন করে চলতে পারি, সে ব্যবস্থাটাও করব, সঙ্গে যদি কাউকে সাহায্য করতে পারি, সেটাও করব। উৎপাদন বাড়ানোর উপকরণের ঘাটতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন,উৎপাদন বাড়াতে গেলে আমাদের সার প্রয়োজন, আমাদের ডিজেল প্রয়োজন, আমাদের বিভিন্ন উপকরণ প্রয়োজন। সেটা আমরা পাচ্ছি না। কাজেই এভাবে মানুষকে কষ্ট দেওয়ার কী অর্থ থাকতে পারে, আমি ঠিক জানি না। অবরোধ আরোপ করে মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলাকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গেও তুলনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এক দিক থেকে বলতে গেলে, এটাও তো মানবাধিকার লঙ্ঘন করার শামিল। কারণ মানুষের যে অধিকার আছে সেই অধিকার থেকে মানুষকে বঞ্চিত করা ঠিক নয়।

বাংলাদেশ কখনও যুদ্ধ চাই না, বরং শান্তি বজায় রেখে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এখন শুধু রাজনৈতিক না, আমাদের অর্থনৈতিক কূটনীতিতেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ পৃথিবীটা এখন একটা গ্লোবাল ভিলেজ। আমরা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।

আমাদের সেভাবেই কাজ করতে হবে যে, সকলের সঙ্গেই মিলে আমরা কাজ করব, যেন মানুষের উন্নতি হয়। আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই।

বাংলাদেশের অবস্থানটা সবসময় শান্তির পক্ষে জানিয়ে তিনি বলেন,সবসময় আমরা শান্তি চাই। জাতির পিতা আমাদের শিখিয়েছেন, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। সেই নীতিটা যথাযথভাবে আমি মেনে চলি, আমাদের রাষ্ট্র মেনে চলে।

কারণ আমি সবসময় বিশ্বাস করি, আমার দেশের মানুষ, তাদের দারিদ্র্যমুক্ত করতে হবে। তাদের জীবনে মৌলিক চাহিদা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের উন্নত জীবন দিতে হবে।

ব-দ্বীপ বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে চলতে হয় জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সবসময় এই দেশ ঝুঁকিতে থাকে। কাজেই এ দেশের মানুষগুলোকে একটু সুন্দরভাবে বাঁচার ব্যবস্থা করে দেওয়া, তার জীবনটাকে অর্থবহ করে দেওয়া, এটাই আমাদের লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

সমুদ্রসীমায় অধিকার প্রতিষ্ঠা ও আলোচনার মাধ্যমে ছিটমহল বিনিময়ের প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের যে সমস্ত সমস্যাগুলো ছিল আমরা কিন্তু সকলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এটা সমাধান করে আমাদের দেশের মানুষের অধিকারটা আমরা নিশ্চিত করেছি। নিজ নিজ দেশের প্রান্তিক মানুষের প্রতি আরো নজর দিতে উন্নত রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আহ্বান জানান শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, কারণ আমার কাছে সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমার দেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নতি। তার জন্য সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রেখেই আমরা আমাদের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে চাই, তবে এটাও ঠিক আমাদের নিজস্ব সামর্থ্য যতটুকু আছে, আমরা সেভাবেই চলতে চাই।
আমরা কারো কাছ থেকে অতিরিক্ত পয়সা নিই না। আমরা যতগুলো প্রজেক্ট হাতে নিই, প্রত্যেকটা প্রজেক্ট আমরা আগেই হিসাব করি, প্রজেক্ট থেকে রিটার্ন কী আসবে। শুধু একটা কিছু তৈরি করার জন্য আমরা করি না। একটা কাজ করলে মানুষ কতটা লাভবান হবে।

তিনি বলেন, আমরা যেন কোথাও কারো ওপর পরনির্ভরশীল হয়ে না পড়ি, আমরা যেন আত্মনির্ভরশীল থাকতে পারি এবং আমরা যেন বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে চলতে পারি, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে এটাকে গুরুত্ব দিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।

দুর্নীতিচেষ্টার মিথ্যা অভিযোগ এনে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন থেকে বিশ্বব্যাংকের সরে যাওয়া, রাজনৈতিক বাদানুবাদের নানা দিক ওঠে আসে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ পারে, আমরা পারি, এটাই আমরা প্রমাণ করেছি। কাজেই আমি মনে করি এটা আমাদের দেশের মানুষের জন্য বিরাট অবদান হবে।

রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় ও উন্নত দেশগুলোর সক্রিয় ভূমিকা চান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা মানবিক কারণে এই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি, কিন্তু তিনটা বছর পূর্ণ হয়ে গেছে। আমাদের জন্য এটা আসলে একটা বিরাট বোঝা। একে তো করোনাভাইরাস, তার ওপর যুদ্ধ। এমন পরিস্থিতিতে উন্নত দেশগুলো যখন অর্থনৈতিকভাবে হিমশিম খাচ্ছে, এখানে আমাদের এই সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের ওপর আরেকটা বোঝা টানা যে কত কষ্টকর, সেটা সকলের উপলব্ধি করা উচিত।

তিনি বলেন, এই রোহিঙ্গারা যেন নিজের দেশে ফিরে যেতে পারে, তাদের ছেলেমেয়েরা যেন তাদের দেশে মানুষ হতে পারে, তারা একটা ভালো পরিবেশে চলে যেতে পারে, এভাবে ক্যাম্পের জীবনযাপন যেন না করতে হয়, তাদেরও তো একটা মানবাধিকার আছে, কাজেই সে ব্যাপারে সকলেই একটু সক্রিয় হবেন, সেটা আমি আশা করি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তর, উইং ও শাখার জন্য স্থান সংকুলানের চাহিদা এই ভবনের মাধ্যমে অনেকাংশে পূরণ হবে এবং আধুনিক সুবিধাবিশিষ্ট কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

সরকারের গণপূর্ত অধিদপ্তর ও স্থাপত্য অধিদপ্তর আটতলা ভবনটির নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। চার বছরে এ জন্য ব্যয় হয় ৭৭ কোটি টাকা।
কূটনীতিতে বিশেষ অবদান রাখার জন্য এ বছর ‘বঙ্গবন্ধু কূটনৈতিক উৎকর্ষ পদক’ পেলেন পোল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সুলতানা লায়লা হোসেন ও ঢাকায় জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads