রাজনীতি

খালেদা জিয়ার মুক্তি ও চিকিৎসা ইস্যু

বিএনপি অনড়, কঠোর আ.লীগ

  • এম এ বাবর
  • প্রকাশিত ২৮ নভেম্বর, ২০২১

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ইস্যুতে বিএনপি বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি। দলের চেয়ারপারসনকে মুক্তি দিয়ে বিদেশে চিকিৎসার দাবিতে এরই মধ্যে অনশন কর্মসূচি ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে বিএনপি নেতা-কর্মীরা। সারা দেশে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপিও প্রদান করা হয়েছে। দলীয় প্রধানকে মুক্তির দাবিতে অনড় বিএনপি নেতাকর্মীরা প্রয়োজনে আরো কঠোর কর্মসূচির হুমকি দেন। এর আগে দলটির সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগেরও হুমকি দেন।

কিন্তু বিএনপিরর এ দাবি আমলে নিচ্ছে না আওয়ামী লীগ। খালেদা জিয়াকে মুক্তি ও চিকিৎসার জন্য বিদেশে না যাওয়ার পক্ষে দলীয় প্রধান থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও মন্ত্রীরা। অসুস্থ খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার ব্যাপারে তার পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষাপটে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আইনে সেই সুযোগ নেই। তাই কোনো ইস্যু সৃষ্টি করে শান্তি শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে নৈরাজ্য সৃষ্টির পাঁয়তারা করলে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে আওয়ামী লীগ তা প্রতিহত করবে। 

অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে রাজনীতিকদের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরির পাশাপাশি, তার অসুস্থতাকে বিএনপির সিনিয়র নেতারা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন বলেন মন্তব্য করেন অনেকে। এছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থা নিয়ে তার চিকিৎসকদের নীরবতার সমালোচনাও করেন বিশ্লেষকরা।

শারীরিক নানা জটিলতায় আক্রান্ত খালেদা জিয়া গত ১৩ নভেম্বর থেকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সিসিইউতে চিকিৎসাধীন তার অবস্থার কোনো পর্যায়ে, তাকে কী কী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে সে বিষয়ে আশ্চর্যজনকভাবে নিশ্চুপ তার ১৫ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড। অথচ গণমাধ্যমে খালেদা জিয়াকে নিয়ে একের পর এক বক্তব্য রাখছেন দল ও জোটের শরিক নেতারা। যাদের একটির সঙ্গে আরেকটির কোনো মিল নেই। এমনকি চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়ারকে বিদেশ নেওয়ার দাবিতে নানা কমসূচি পালন করলেও, ঠিক কোনো দেশে কিংবা কোনো হাসপাতালে তার চিকিৎসা হবে সে বিষয়ে কোনো জবাব নেই বিএনপির। সরকারের কাছে দফায় দফায় অনুমতি চেয়ে যেসব আবেদন করেছে বিএনপি সেখানে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেয়নি দলটি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ অবস্থায় খালেদা জিয়ার চিকিৎসার চেয়ে তাকে ইস্যু করে রাজনীতি করতেই ব্যস্ত দলের নেতাকর্মীরা।

বিএনপি কঠোর কর্মসূচি ও এমপিদের পদত্যাগের হুমকি এবং দলীয় হাইকমান্ডের আন্দোলনে নামার হুমকি আমলে নিচ্ছে না সরকার ও প্রশাসন। খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিয়ে যাওয়ার দাবি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ডক্টর হাছান মাহমুদ। আর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, বিএনপি যে দাবি করছে, তা আইনের বইয়ে নেই। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপির আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ভয় পায় না। প্রয়োজনে বিএনপিকে রাজপথে মোকাবিলা করা হবে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।

বিএনপির আন্দোলনের হুমকির পর আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীও সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এরই মধ্যে গত ২৪ নেভেম্বর থেকে পুলিশের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। সব মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ফের অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

গতকাল শনিবার রাজধানীতে ড. মিলন দিবসের আলোচনায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, খালেদা জিয়ার পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেও একটা জায়গায় এসে প্রযুক্তির অভাবে আর এগোতে পারছেন না। এমনটা জানিয়েছেন। পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেও একটা জায়গায় এসে আর এগোতে পারছেন না টেকনোলজির অভাবে। পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণ বন্ধ করা জরুরি। তাই গণতন্ত্র এবং দেশ রক্ষায় খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়ে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার আন্দোলন জোরালো করার আহ্বান জানান তিনি।

এর আগে গত ২৫ নভেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কে জাতীয়তাবাদী যুবদল আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে মির্জা ফখরুল প্রশ্ন তোলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পুরোনো ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখার সময় স্লো পয়জনিং করা হয়েছিল কিনা।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দরকার। একথা চিকিৎসকেরা বার বার বলছেন। তারা বলছেন আমাদের এখানে আর চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষমতা নেই। কিন্তু হাসিনা শুনতে চায় না। তার মন্ত্রীরাও বলে দেওয়া উচিত, আওয়ামী লীগের এমপিরাও বলে এটা মানবিক কারণে দেওয়া উচিত। সারা দেশের সব মানুষ, ডাক্তার, উকিল, বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপকেরা বলছেন, কিন্তু তিনি এটা শুনতে চান না। কেন চান না, তার প্রতিহিংসা। খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে শুধু নয়, এখন জীবন থেকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য এই চক্রান্ত।

তিনি বলেন, আজকে দেশনেত্রী হাসপাতালে তার জীবন নিয়ে লড়াই করছেন। আমরা কি ঘরে বসে থাকবো। আমরা ঘরে বসে থাকবো না। আমরা প্রাণপণ আমাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাকে মুক্ত করার জন্য সর্বো শক্তি দিয়ে  আন্দোলনে নামবো।   

অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে সরকার স্লো পয়জনিং করে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন- সরকার নয়, খালেদা জিয়ার কিছু হলে বরং বিএনপিকেই তার দায় নিতে হবে।  কাদের বলেন, বেগম জিয়ার পাশে থাকেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগ বা সরকারের কেউ বেগম জিয়ার পাশে থাকেন না। ব্যক্তিগত পছন্দের চিকিৎসকরাই তাকে চিকিৎসা করাচ্ছেন। তার চিকিৎসার দায়িত্বে রয়েছেন। খালেদা জিয়ার আশপাশের লোকেরা হচ্ছেন বিএনপির লোকেরা, তার পরিবারের লোকেরা, স্লো পয়জনিং যদি করে থাকে আপনারা পাশের লোকেরাই করতে পারেন। হুকুমের আসামি শেখ হাসিনা হবে না, সেটি হলে ফখরুল সাহেব আপনি হবেন।

ওবায়দুল কাদের বলেন, কোনো ইস্যু সৃষ্টি করে শান্তি শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে নৈরাজ্য সৃষ্টির পাঁয়তারা করলে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগ প্রতিহত করবে। খালেদার চিকিৎসা ইস্যুতে যে কোনো বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে সারা দেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সতর্ক রয়েছেন।

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, বেগম জিয়া খুব হাইরিস্কে আছেন। খালেদা জিয়া যেখানে ভর্তি হয়েছেন সিসিইউতে, এটা মূলত করোনারি কেয়ার ইউনিট না। দিস ইজ ক্রিটিকাল কেয়ার ইউনিট। বিনা চিকিৎসায় তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর জন্য দেশের সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠনকে চাপ তৈরি করতে হবে। তা না হলে যে কোনো পরিস্থিতির দায় সরকারকেই নিতে হবে।

তিনি আরো বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত ডাক্তার এ জেড এম জাহিদ হোসেন তার স্বাস্থ্যের কোনো সুখবর দিতে পারেননি। যে চিকিৎসা এখানে হচ্ছে, এটি কোনো চিকিৎসাই না। বাইরে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা না দিয়ে এই রোগীকে এভাবে ফেলে রাখতে পারে না। দেশে যথাযথ চিকিৎসা হলে সরকারি দলের নেতারা কেন বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি ও দলটির নেতাদের একের পর এক বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্যের সমালোচনা করে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন- বিএনপির দায়িত্ব ছিল, হাসপাতালের দায়িত্ব ছিল এ ধরনের ব্যক্তির প্রতিদিনের স্বাস্থ্য নিয়ে বুলেটিন প্রকাশ করা। কিন্তু তা তারা করতে পরেনি।

তিনি বলেন, আমরা কয়েকদিন আগে খালেদা জিয়াকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। যা দেখেছি সামপ্রতিককালে এমন মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের নজরে আসেনি। খালেদা জিয়া কতক্ষণ, কয় মিনিট, কয় দিন বাঁচবেন সেটা আমি বলতে পারবো না। তবে এটা বলতে পারি খালেদা জিয়া চরম ক্রান্তিকালে আছেন। তাই সরকারকে আমি অনুরোধ করব, মানবিক দিক বিবেচনায় হলেও ওনাকে দ্রুত বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া উচিত। আর না হলে যে কোনো কিছু ঘটে যেতে পারে।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, আইনের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। মানবিক কারণে দণ্ডপ্রাপ্ত খালেদা জিয়াকে সাজা স্থগিত রেখে ছয় মাস পরে বাড়ানো হয়েছে। চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে অনুমতি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, আমি তা দেখিয়েছি যে বাংলাদেশের আইনের বইয়ে এটা নাই। উনারা যদি এটা দেখাতে পারেন, তাহলে তো আমরা এটা বিবেচনা করতে পারি। কিন্তু এটা আইনের বইয়ে নাই। উনারাও দেখাতে পারবেন না, বিবেচনার প্রশ্ন আসে না। খালেদা জিয়াকে সঠিকভাবে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে মন্তব্য করে আনিসুল হক বলেন, একজন সাজাপ্রাপ্ত ৪০১ ধারায় কোনো সুযোগ নেই নিষ্পত্তিকৃত আবেদন আবার বিবেচনা করার।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads