মোশারেফ হোসেন ফাহাদ
সাধারণ অর্থে মানুষের মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যমকে বলা হয় ভাষা। ভাষাভাষীর দিক থেকে বাংলা ভাষার অবস্থান পঞ্চম। পৃথিবীতে বাঙালি ছাড়া আর এমন জাতি নেই যারা ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে। বাংলা ভাষা আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের গৌরবের অংশ। সকল জীবিত ভাষাই সদা পরিবর্তনশীল। কিন্তু আধুনিকতার দোহাই দিয়ে আমরা হরহামেশাই বাংলা ভাষাকে বিকৃত করছি এখন। দুঃখজনকভাবে এই বিকৃতকরণে তরুণ প্রজন্মই সর্বাধিক এগিয়ে আছে। পরিবেশ দূষণের মতো ভাষা দূষণ ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে যেন। বাংলা ভাষা দূষণের পেছনে অনেক কারণ কাজ করছে।
হিন্দি সিরিয়াল : বাংলা ভাষা দূষণের জন্য সর্বাধিক দায়ী হিন্দি সিরিয়াল। বর্তমানের শিশুরা বাংলা ভাষা শেখার আগেই হিন্দি সিরিয়ালের ডোরিমন দেখে হিন্দি ভাষা রপ্ত করছে। আর তরুণদের অন্যতম বিনোদনের মাধ্যম হলো বলিউডের সিনেমা। এসবের প্রভাবেই তরুণরা কথা বলার সময় বাংলার সাথে হিন্দি মিশিয়ে বাংলা ভাষাকে যথাচ্ছে বিকৃত করছে প্রতিনিয়ত। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলিশ ব্যবহারও তরুণদের ভাষা বিকৃতির পেছনে কাজ করছে। ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বাংলা ব্যাবহারের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বাংলিশ ব্যবহারের আসক্তি বাংলা ভাষাকে জঘন্যভাবে বিকৃত করছে। বাংলা নাটকেও ভাষার অপব্যবহার বাড়ছে দিনদিন। আজকাল বাংলা নাটকগুলোতে হরহামেশাই বাংলা ভাষাকে বিকৃত করা হচ্ছে আধুনিকতার দোহাই দিয়ে। আগেকার নাটকগুলোতে হাস্যরসের জন্য দু-একটা চরিত্র আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করত। কিন্তু বর্তমানে পরিচালকরা ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে বাংলিশ অধিকাংশ চরিত্রের মুখে বসিয়ে দিচ্ছে। আঞ্চলিক আর প্রমিত বাংলাকে নানান ঢঙে মিশিয়ে বাংলাকে জঘন্যভাবে বিকৃত করছেন নাট্যকাররা। এমনকি নাটকের নামগুলোও হয় বিকৃত বাংলার কিংবা বাংলিশ। যেমন, ক্যান্ডি ক্রাশ, ফালতু রিলোডেড, ড্যাশিং গ্যালফ্রেন্ড ইত্যাদি। আর বিকৃত বাংলার এই নাটকগুলো সম্প্রচার করছে বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন। তারা বাংলা নামের পরিবর্তে টক শো, ৩৬০ ডিগ্রি ইনভেস্টিগেশন, গিফট বক্স, টপ নিউজ, কফি শো, নাইট শো এসব বিকৃত আর বাংলিশ ভাষায় বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের ইংরেজি প্রেমিকতা : বিকৃত বাংলা ভাষা রোধে সরকার বিভিন্ন কার্যক্রম চালালেও দেখা যায় সরকারি বিভিন্ন সংস্থার নামই ইএই, NCTV, Teletalk ইত্যাদি ইংরেজি শব্দে নামকরণ করা হয়েছ। অনেক প্রতিষ্ঠানের বাংলা নাম থাকলেও ইংরেজিতে সংক্ষিপ্ত রূপ দেওয়া হচ্ছে। যেমন-ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি), বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের নামকরণও আজকাল ইংরেজিতেই করা হচ্ছে। সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠদান পদ্ধতি সম্পূর্ণ ইংরেজিতে চালু আছে, একইভাবে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলার ব্যবহার দিনদিন কমে যাচ্ছে। আবার যেখানে বাংলায় পাঠদান পদ্ধতি চালু আছে সেখানে দেখা যায় অনেক শিক্ষক পাঠদানের সময় প্রমিত বাংলা ব্যবহার করেন না।
বাংলা একাডেমি : প্রায় প্রতি বছর বাংলা একাডেমি নতুন নতুন বানানরীতি বাংলাভাষীদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। ফলে বাংলা ভাষা ব্যবহারকারীদের মধ্যে পুরাতন ব্যবহূত বানান এবং নতুন বানান নিয়ে দ্বিধার সৃষ্টি করছে।
এফএম রেডিও : বর্তমানে এফএম রেডিওগুলোতে বাংলা ভাষাকে সবচেয়ে বেশি বিকৃতরূপে উপস্থাপন করা হচ্ছে। শুভরাত্রি না বলে তারা হেল্লো গাইজ গুইড নাইট বলে শ্রোতাদের সম্বোধন করছে।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড : আমরা হরহামেশাই দেখতে পাই বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক সহযোগিতামূলক সংগঠনলো অবলীলায় তাদের প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের সাইনবোর্ডে ইংরেজি বর্ণমালা বা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরছে।
ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা : ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুমোদনের ফলে বাংলা ভাষা শিক্ষাকে সংকুচিত করা হচ্ছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করা তরুণ প্রজন্ম ভিনদেশি ভাষায় যতটুকু পারদর্শী হয়ে উঠছে মাতৃভাষায় ঠিক ততটুকু পারদর্শী হয়ে উঠতে পারছে না। ফলে তারা ইংরেজি ঢঙে বাংলা ভাষা উচ্চারণ করে ভাষাকে যেমন বিকৃত করছে, একই সঙ্গে বাংলা ভাষাকে সংকটের মুখে ফেলে দিচ্ছে।
সবচেয়ে লজ্জার বিষয় হচ্ছে, দেশের আইন প্রণয়ন এবং সংশোধনাগার জাতীয় সংসদেও প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যবহার করা হচ্ছে না। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে সাংসদরা বিভিন্ন কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করে বাংলা ভাষার কলঙ্কিত করে ফেলছেন। সরকারি উচ্চপদস্থ লোকেরাও ভাষা মিশ্রণ থেকে মুক্ত নয়।
ভাষা দূষণরোধে বর্তমান বাংলা নাটকের সংলাপের দিকে নজর দিতে হবে। বাংলা নাটকে প্রমিত বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। নাটকে বাংলিশ ও আঞ্চলিক ভাষা মিশ্রণে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রমিত বাংলা ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি যে-কোনো প্রতিষ্ঠান অফিস আদালতে প্রমিত বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত এবং যে-কোনো প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষায় সেবা পাওয়াকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বেসরকারি টেলিভিশনের যে-কোনো অনুষ্ঠানের নাম এবং অনুষ্ঠান সম্প্রচারের ক্ষেত্রে প্রমিত বাংলা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রমিত বাংলা ভাষা ভালোভাবে রপ্ত করার পর শিশুদের অন্যান্য ভাষা শিখানো যেতে পারে। ইংরেজি মিডিয়াম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলা ভাষাকেও প্রাধান্য দিতে হবে। একইভাবে এফএম রেডিওগুলোতে বাধ্যতামূলক প্রমিত বাংলা ব্যবহারের জন্য তাগিদ দিতে হবে।
সাইনবোর্ডে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করাও আবশ্যক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানসহ সকল প্রতিষ্ঠানে ইংরেজির পরিবর্তে বাংলা ভাষার ব্যবহার করতে হবে। বাংলা একাডেমির ভাষা স্থিতিশীলতা রক্ষা সময়ের দাবি। একটা শব্দের বিকল্প অনেক বানান থাকবে, কালের বিবর্তনে একটা বানানই প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই অযথা নতুন বানান চাপিয়ে দিয়ে সংশয় সৃষ্টি করা থেকে বাংলা একাডেমির বিরত থাকতে হবে। বাংলা ভাষা সুরক্ষায় প্রয়োজনে ভাষাসেল কিংবা ভাষা পুলিশ গঠন করা যেতে পারে, যারা বাংলা ভাষার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতকরণে কাজ করে যাবে।
পৃথিবীতে একমাত্র বাঙালি জাতিই বাংলা ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে। এ ভাষা আমাদের রক্তে অর্জিত ভাষা। তাই বাংলা ভাষা দূষণ হতে প্রতিকারের জন্য আমাদের সকলের ভাষা ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলিশ ব্যবহার বন্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং প্রমিত বাংলা ব্যবহারের চর্চা করতে হবে।
ভাষা একটি জাতির পরিচয় বহন করে। বাংলা ভাষা আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংস্কৃতি আমাদের সংগ্রামের প্রতীক। তাই বাংলাভাষা সুরক্ষার দায়িত্ব এবং কর্তব্য আমাদেরই। বাংলা ভাষার সংকট মোকাবিলায় ভাষার এই মাসে আমাদের এখনই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে যেন দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা তার সঠিক মর্যদায় আসীন হতে পারে।
লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়





