বহুমুখী সঙ্কটে বিএনপি। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নানামুখী সঙ্কট ও চাপ স্থায়ী রূপ নিচ্ছে দলটির ওপর। নেতায় নেতায় সন্দেহ-অবিশ্বাসের মাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। দুর্বল সখ্যের কারণে একে একে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে বিদেশি মিত্ররাও। প্রতিপক্ষের কৌশলের কাছে বারবার মার খাচ্ছে দলটি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দলটির শিকড়ে টান পড়েছে। তাই প্রতিরোধ তো দূরের কথা সঙ্কট কাটিয়ে অস্তিত্ব রক্ষাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৃণমূলের তাগিদ এসেছে দীর্ঘ ১১ মাস ধরে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য এখনই আন্দোলনের। শীর্ষ নেতৃত্বের পরিবর্তনসহ ‘হ-য-ব-র-ল’ সংগঠনকে আবার গোছানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ ভোটের মাঠে পরাজিত প্রার্থীদের।
বিএনপির একাধিক নেতা আলাপকালে বাংলাদেশের খবরকে জানিয়েছেন, নির্বাচনের অনিয়মের বিষয়টি দেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করা, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোট টিকিয়ে রাখা, খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্ত করা এবং ভাঙন ঠেকিয়ে নেতাকর্মীদের ধরে রাখার বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। কিন্তু বহুমুখী চাপে এক রকম দিশাহারা দলটির নেতৃত্ব। এখনই আন্দোলনে যেতে চায় দলের একটি অংশ। দল ও জোট নির্বাচিতদের শপথ না নেওয়ার পক্ষে অবস্থান থাকলেও একটি অংশ শপথ নেওয়ার জন্যও চাপ দিচ্ছে। পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে গত বৃহস্পতিবার ধানের শীষের প্রার্থীদের সঙ্গে শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে প্রার্থীদের তোপের মুখে ছিলেন উপস্থিত শীর্ষ নেতারা।
মাদারীপুর থেকে মনোনয়ন পাওয়া আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত ছিল এই নির্বাচন নেত্রীকে মুক্তির নির্বাচন। কিন্তু সরকার কৌশলে জোর করে বিজয়ী হয়েছে, এটা সবাই জানে। এরপরও বসে থাকার আর কোনো কারণ নেই। নেত্রীকে মুক্ত করতে হবে। সবাই আন্দোলন চায়। ক্ষমতাসীনদের সময় দিলে এরা পেয়ে বসবে। আর এক সেকেন্ডও বসে থাকলে চলবে না। খোকন ছাড়াও আরো কয়েজন প্রার্থী নির্বাচনে সিনিয়র নেতাদের ভূমিকা কী ছিল জানতে চান এবং দ্রুত আন্দালনে যেতে চাপ দেন।
বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, আন্দোলনে যাওয়ার এই চাপের পাশাপাশি দল ও ঐক্যফ্রন্টের গুটি কয়েক নেতা চাচ্ছেন, নির্বাচিত সাত প্রার্থী যেন শপথ নিয়ে সংসদে যায়। তবে বেশিরভাগ প্রার্থী ও সিনিয়র নেতারা এই বিষয়টি সমর্থন করছেন না। এজন্য ফ্রন্টের মধ্যে অনিশ্চয়তার দিকে যেতে পারে এমনও মনে করছেন কয়েকজন নেতা। এর বাইরে এখনই জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা ও বিএনপি ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা পরামর্শ দিচ্ছেন।
জানা গেছে, নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধানে দলের সিনিয়র অনেক নেতার বিতর্কিত কর্মকাণ্ড সামনে আসছে। এ জন্য দলের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস দেখা দিয়েছে। সঙ্গত কারণে যেসব নেতার কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ এবং যারা পদ ধরে রাখা ছাড়া সাংগঠনিক কোনো কাজে আসেনি তাদের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে নতুনদের প্রতিষ্ঠারও চাপ দিচ্ছে নেতাকর্মীরা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বাড়াতে ব্যর্থদের সরিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক টিম ঢেলে সাজানোর পরামর্শও আছে নেতাকর্মীদের।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিএনপির নেতাকর্মীরা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি উত্তরণে হাইকমান্ডকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দল পুনর্গঠন করে নেতাকর্মীদের মধ্যে আস্থা ও মনোবল ফিরিয়ে আনতে সঠিক ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। সুবিধাবাদীদের বাদ দিয়ে যোগ্য ও ত্যাগীদের সামনে এনে দ্রুত দল পুনর্গঠনে হাত দেওয়ার পরামর্শ বিএনপি ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের খবরকে বলেন, বিএনপি এদেশের পুরনো একটি রাজনৈতিক দল। গৌরবোজ্জ্বল অতীত আছে এ দলের। নানা সময়ে দলটি বিপর্যয়ে পড়ে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। একাদশ নির্বাচনের পর বিএনপি আবারো নতুন করে সঙ্কটে পড়ছে এতে সন্দেহ নেই। এ সঙ্কট থেকে উত্তরণে বিএনপিকে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিয়ে এগোতে হবে। সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে দ্রুত পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। যোগ্য এবং ত্যাগীদের শীর্ষ নেতৃত্বে আনতে হবে। নতুন নেতৃত্বকে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে হবে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বিএনপিকে পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবেই মোকাবেলা করতে হবে। ভোটের অনিয়ম, সরকারের দুর্নীতি, দুঃশাসনের চিত্র তুলে ধরে রাস্তায় নামতে হবে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন, ধানের শীষের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংসদে যাওয়া উচিত। সেখানেও তারা অনিয়মের প্রতিবাদ করতে পারবে।
এদিকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বিএনপির আইনজীবী নেতাদের পরামর্শ হচ্ছে, মামলায় জর্জরিত থাকা নেতাকর্মীদের জামিন নেওয়াই এখন সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া উচিত। সংসদীয় ৩০০ আসনে যারা মামলায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এবং গ্রেফতার হয়ে কারাগারে গেছেন, তাদের মুক্তিও জরুরি।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, বিএনপির এখন প্রথম কাজ খালেদা জিয়াসহ নেতাকর্মীদের জামিন ও কারামুক্তি। এরপর দল গোছানো এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার বিষয়ে নজর দিতে হবে। তবে সবকিছুই হবে বাস্তবতার নিরিখে।
চলমান সঙ্কটে বিএনপির করণীয় বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের খবরকে বলেন, দেশের জনপ্রিয় একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি। এই দলটিকে নিশ্চিহ্ন করতে সরকার নানা কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। হামলা-মামলা ও গ্রেফতারের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের চরমভাবে নির্যাতন ও হয়রানি করা হচ্ছে। সর্বশেষ তামাশা ও প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আবার স্বমহিমায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে বিএনপি। তাই সরকার যতই কৌশল করুক এ দলটি নিশ্চিহ্ন করা যাবে না।