জাতীয়

বর্ষা আসছে ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে

  • ''
  • প্রকাশিত ২০ মার্চ, ২০২৪

তরিকুল ইসলাম সুমন:

বর্ষা শুরু হতে আর কিছু দিন বাকি। এরই মধ্যে বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গু রোগী। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এবারো ডেঙ্গু ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করতে পারে। এ অবস্থায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশের সব হাসপাতাল প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার নতুন করে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২০ রোগী। এবছর (জানুয়ারি থেকে মার্চ) ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫৮৫ জনে।ঢাকায় আক্রান্ত হয়েছেন ৫২৭ জন এবং ঢাকার বাহিরে ১ হাজার ৩৯ জন। মারা গেছেন ২০ জন। এর মধ্যে ঢাকায় ৭ জন এবং ঢাকার বাহিরে আক্রান্তের সংখ্যা ১৩ জন। বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ঢাকা বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৭৪৫ জন। এর মধ্যে ঢাকা শহরে ৫৪৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ৪৫৫ জন, বরিশাল বিভাগে ১৯০ জন, খুলনা বিভাগে ৯৩ জন, রাজশাহী বিভাগে ৩৬ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ২৮, রংপুর বিভাগে ১৩ জন এবং সিলেট বিভাগে ৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন।

গতকাল সচিবালয়ে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বিশেষ বৈঠক করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সারা দেশে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হবে। এডিস মশা নির্মূলে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি রোজার ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে সমন্বিত কার্যক্রম শুরু হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে হলে আমাদেরকে এক দিকে যেমন মশা মারতে হবে, আবার অন্যদিকে প্রাদুর্ভাব কমাতে আমাদেরকে আগে থেকেই সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। সবার আগে আমাদের নিজ নিজ এলাকার কমিউনিটি সম্পৃক্ততা ও সচেতনতা বাড়াতে হবে। মশা মারার জন্য ওষুধ যেমন মানসম্পন্ন কিনতে হবে তেমনি আমাদেরকে ভালো ট্রিটমেন্ট ব্যাবস্থাও রাখতে হবে। তবে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে আজ থেকে যেভাবে উদ্যোগ নেওয়া শুরু হলো, এটিকে চলমান রেখে সব সেক্টরকে এক হয়ে কাজ করতে হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন আরো বলেন, বাংলাদেশে গত ২৩ বছরে মোট ডেঙ্গু রোগী ছিল প্রায় আড়াই লক্ষ। কিন্তু ২০২৩ সালে মাত্র এক বছরেই রোগী আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে প্রায় ৩ লাখ। এর বাইরে তো আরও রোগী ছিলই। এতেই বোঝা যায়, ডেঙ্গু রোগী নিয়ে আমাদের এবার আগে থেকেই সতর্ক না হয়ে কোন উপায় নেই।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. রোকেয়া সুলতানা ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে লক্ষ্য করে বলেন, সিটি করপোরেশন থেকে প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে লার্ভার তথ্য জানতে হবে। নিয়ম না মানলে জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় যারা বাধা হবে তাদেরকে জরিমানা করাসহ আরো কঠোর নিয়ম হাতে নিতে হবে।

সভায় উপস্থিত স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, এখনই কার্যকর এবং দ্রুত ব্যবস্থা নিতে না পারলে এবারও ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে মায়েদের সচেতন করতে হবে। কারণ তারাই সন্তানের অবস্থা বুঝতে পারে। অনেক সময় হাসপাতালে আনতে দেরি হওয়ার কারণে শিশু মৃত্যুর হার বেশি হয়। সমস্যা দেখা দিলেই দ্রুত হাপাতালে নিয়ে আসতে হবে। অনেক সময় দেখা যায় হাসপাতালে সিট বা কেবিন পাওয়া যায় না এ ক্ষেত্রেও সচেতনতা দরকার। অর্থ ও ক্ষমতার ব্যবহার করে দীর্ঘদিন সিট দখল করে থাকার কারণে অতিপ্রয়োজনেও চিকিৎসা নিতে পারেন না অনেকে।

সভায় ঢাকা সিটি করপোরেশন দক্ষিণের মেয়র ফজলে নূর তাপস বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত সব রোগীর সময় মতো চিকিৎসা সেবা দিতে হবে। কোনো রোগীকে চিকিৎসা না দিয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে পাঠানো যাবে না। ২০২৩ সালের ডেঙ্গুতে নারী ও শিশু বেশি কেন মারা গেল সেটি নিয়ে গবেষণা করে ব্যবস্থা নিতে হবে। আর, মানুষকে সঠিক তথ্য জানাতে হবে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধ করতে আমাদেরকে এক হয়ে মাঠে নেমে কাজ করতে হবে। কোনো ভেদাভেদ যেন আমাদের মধ্যে না হয়। করোনা যেভাবে আমরা সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করেছি, ডেঙ্গুও আমরা এক হয়ে সমন্বিতভাবে প্রতিরোধ করবো। একই সাথে এ বছর ওষুধ কিনতে আরো বেশি সতর্কতা অবলম্বন করে পরীক্ষা ও যাচাই-বাছাই করে আমাদেরকে ওষুধ কেনার উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা এ বছর নিজেই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জৈব কীটনাশক ব্যাসিলাস থুরিনজেনসিস ইসরায়েলেনসিস বা বিটিআই আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যেই উত্তর সিটির সকল জলাধার গুলো পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, করোনার মতো ডেঙ্গু প্রতিরোধে এবছর আমরা আগেভাগেই এই সমন্বয় সভার আয়োজন করেছি। আশা করছি, এ বছর সকলের সাথে সমন্বয় করে আমরা ডেঙ্গু প্রতিরোধে এক যোগে কাজ করে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুহার অনেক কমিয়ে আনতে সক্ষম হবো।

সভায় অন্যদের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবিএম খুরশীদ আলম, বিএমএ সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক প্রফেসর আবদুল্লাহ, স্বাচিপ সভাপতি অধ্যাপক জামাল উদ্দিন চৌধুরী, বিএসএমএমইউএর ভিসি শারফুদ্দিন আহমেদসহ মন্ত্রণালয়ের ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের সাথে সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্যবৃন্দ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা) অধ্যাপক মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিকও তুলে ধরেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়,

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ডেঙ্গুর সংক্রমণ হয় ১৯৬০ সালের দিকে। এরপর কেটে গেছে চার দশক। তারপর ২০০০ সালের জুন মাসে ডেঙ্গু সর্বপ্রথম মহামারি আকারে দেখা দেয় বাংলাদেশে। সে বছর মোট ৫ হাজার ৫৫১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়, যার মধ্যে মারা যান ৯৩ জন। এরপর কম-বেশি প্রতি বছরই মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে, মৃত্যু হয়েছে। ২০২৩ সালের আগে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যায় কোভিডের আগের বছর ২০১৯ সালে। ওই বছর সারাদেশে মোট ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং মারা যান ১৬৪ জন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads