বাংলাদেশ

বন্ধ ২৫ পাটকলের দুটি চালু

  • প্রকাশিত ৪ মার্চ, ২০২২

রতন বালো :

 

 

সরকারি নিয়ন্ত্রণে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে বন্ধ ২৫টি পাটকলগুলো মধ্যে চালু হয়েছে মাত্র দুটি। এগুলো হচ্ছে, নরসিংদীর বাংলাদেশ জুটমিল এবং চট্টগ্রামের কেএফডি জুট মিলস্। বর্তমানে আরো ২টি পাটকল চালু করা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আর ১৩ টি মিল ইজারা দেওয়ার জন্য দ্বিতীয়বারের মতো এক্সপ্রেসন-অব-ইন্টারেস্ট (ইওআই) আহ্বান করা হয়েছে।

বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বলেছেন,  দ্রুততম সময়ের মধ্যে আরো কিছু মিল চালু করা সম্ভব হবে। পুনরায় চালুকৃত মিলে অবসায়নকৃত শ্রমিকরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। অবসায়নের পর মিলগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে রেখে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় লীজ প্রদানের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে মন্ত্রী জানান। এদিকে বন্ধ পাটকল চালু করতে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করছে সৌদি আরব। সেজন্য সৌদি আরব বাংলাদেশের বস্ত্র ও পাটখাতে ব্যবসা-বাণিজ্যের সমপ্রসারণ ও উন্নয়ন ঘটাতে আগ্রহী বলে বস্ত্রমন্ত্রী জানান।

সোনালি আঁশ পাটের সাথে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য গভীরভাবে জড়িয়ে আছে বলে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আরো বলেন, শুধু তাই নয়, বাঙালির অর্থনৈতিক মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে পাটের ভূমিকা একটি স্বীকৃত ইতিহাস। পরিবেশবান্ধব তন্তু হিসেবে পাটের গুরুত্ব বিবেচনায় পাটচাষে কৃষকদের আগ্রহ সৃষ্টি, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পাট ও পাটপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক তন্তু হিসেবে সোনালি আঁশের উজ্জ্বল সম্ভাবনা তুলে ধরার লক্ষ্যে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় অন্যান্য বছরের ন্যায় এবারও আগামী ৬ মার্চ ‘জাতীয় পাট দিবস-২০২২’ উদ্যাপন করা হবে বলে মন্ত্রী জানান।

জাতীয় পাট দিবসে উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলননে মন্ত্রী এসব তথ্য তুলে ধরেন। এ বারের জাতীয় পাট দিবসে ১১ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান পুরস্কার পাচ্ছে। পাট খাত উন্নয়নে গবেষণা কার্যক্রম, পাটবীজ আমদানিতে নির্ভরশীলতা হ্রাস, পাটবীজ উৎপাদনে সয়ম্ভরতা অর্জন, প্রচলিত ও বহুমুখী পাটজাত পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধি ইত্যাদি কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে সরকারের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে পুরস্কার দেওয়া হবে।

পাটবীজ, পাট ও পাটজাত পণ্যের গবেষণায় সেরা গবেষক/বিজ্ঞানী/উদ্ভাবক, সেরা পাটবীজ উৎপাদনকারী চাষি, সেরা পাট উৎপাদনকারী চাষি, পাটজাত পণ্য উৎপাদনকারী সেরা পাটকল, পাটজাত পণ্য উৎপাদনকারী সেরা প্রতিষ্ঠান, পাটের সুতা উৎপাদনকারী সেরা পাটকল, পাটের সুতা উৎপাদনকারী সেরা প্রতিষ্ঠান, বহুমুখী পাটজাত পণ্য রপ্তানিকারক সেরা পাটকল, বহুমুখী পাটপণ্য রপ্তানিকারক সেরা উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান, বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনকারী সেরা উদ্যোক্তা (মহিলা), বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনকারী সেরা উদ্যোক্তা (পুরুষ) ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও পাট সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের ৭টি শুভেচ্ছা স্মারক দেওয়া হবে।

এদিকে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম নয়মাসে (জুলাই-মার্চ) পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ ৯৫৩.৫৭ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২২.৯৪ শতাংশ বেশি। আর তা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১০.৬৪ শতাংশ বেশি।

এদিকে এ বিষয়ে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর জানান, বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি)’র বন্ধ মিলসমূহ পুনঃচালু করে পাটপণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ  দেখিয়েছে সৌদি আরব। এ বিষয়ে সম্প্রতি বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর সঙ্গে তার সচিবালয়স্থ কার্যালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ইসসা ইউসেফ ইসসা আল দুহাআলান সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ইসসা ইউসেফ ইসসা আল দুহাআলান জানান, সৌদি আরব আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে বাংলাদেশ তাদের বন্ধুপ্রতীম দেশ। সেজন্য সৌদি আরব  বাংলাদেশের বস্ত্র ও পাট খাতে ব্যবসা-বাণিজ্যের সমপ্রসারণ ও উন্নয়ন ঘটাতে আগ্রহী।

মন্ত্রী, সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, বাংলাদেশে বিশ্বের সেরামানের পাট উৎপাদিত  হয় এবং এ পাট থেকে এখন উচ্চমানের ও আকর্ষণীয় বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। পাটপণ্য সম্পূর্ণরূপে পরিবেশবান্ধব। সৌদি আরবে সমপ্রতি পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়াতে সে দেশে বহুমুখী পাটপণ্যের চাহিদা বহুগুণে বেড়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বহুমুখী পাটপণ্যের রপ্তানি হয়। এ রপ্তানি দেশের তালিকায় অন্যতম অবস্থানে রয়েছে সৌদি আরব। বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আরো অধিক পরিমাণে বহুমুখী পাটজাত পণ্য সৌদি আরবে রপ্তানি করতে চায়।

সাক্ষাৎকালে বন্ধুপ্রতীম দু-দেশের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছাড়াও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাসহ দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

বস্ত্র ও পাটমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে,  বন্ধ পাটকল চালু করা গেলে শ্রমিকদের মধ্যে অভিজ্ঞ ও দক্ষ শ্রমিকরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজের সুযোগ পাবেন। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল খুলনা শিল্পনগরীর ক্রিসেন্ট ও প্লাটিনাম জুটমিল লিজ নেওয়ার জন্য প্রাথমিকভাবে আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। ইতোমধ্যে সে দেশের প্রতিনিধি দল জুটমিল দুটি পরিদর্শন করেছেন। শ্রমিকদের বেকারত্ব নিরসনে সরকারের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে।

জানা গেছে, বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর তারা বন্ধ দুই পাটকল চালু করে। বেসরকারিকরণ করা তিন পাটকল ফিরিয়ে এনে আবার চালু করে। এ জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দও দেওয়া হয়। তবে  প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ২০১০-১১ অর্থবছরেই ১৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা মুনাফার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে লোকসান গুনছে  চালু হওয়া পাটকলগুলো। গত ১১ বছরেই ৪ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল। সর্বশেষ পাঁচ বছরে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা।

লোকসানের বোঝা বইতে না পেরে ২৫ পাটকলের ২৪ হাজার ৮৮৬ জন স্থায়ী শ্রমিককে স্বেচ্ছা অবসরে (গোল্ডেন হ্যান্ডশেক) পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয় গত বছর ১ জুলাই থেকে। ক্রমাগত লোকসানের কবলে পড়ে পাটকলগুলো বন্ধ করে দেয় সরকার। এসময় পাটকলগুলোয় বদলি শ্রমিক ছিলেন ২৩ হাজার ৮৪২ জন। দৈনিকভিত্তিক শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ৪৬৩ জন।

জানা গেছে, বন্ধকৃত ২৫টি মিলের মধ্যে রাষ্ট্রায়াত্ত ৪টি মিলের (খালিশপুর, দৌলতপুর ও কেএফডি) শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি আগস্ট ২০২০ মাসে পরিশোধ করা হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত ও অবসানকৃত ৩৪ হাজার ৭৫৭ জন স্থায়ী শ্রমিকদের পাওনাদি ২ লাখ টাকার ঊর্ধ্বে পাওনার ক্ষেত্রে অর্ধেক নগদে ও অর্ধেক তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ইস্যুর মাধ্যমে পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২১টি মিলের সবগুলোতে নগদ অংশ পরিশোধের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ হতে এ পর্যন্ত ১,৭৬৯.৪১ কোটি টাকা পাওয়া গিয়েছে। অদ্যাবধি ৩১ হাজার ৭৫৭ জন শ্রমিকের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের মাধ্যমে ১৬৬২.১৭ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে, যা বরাদ্দের প্রায় ৯৩.৯৪ শতাংশ ।

উল্লেখ্য, সোনালি আঁশে সমৃদ্ধ অর্থনীতির স্বপ্ন নিয়ে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জাতির পিতা  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রতিষ্ঠাকালে বিজেএমসির আওতায় ৭০টিরও বেশি পাটকল ছিল। কিন্তু ধারাবাহিক লোকসানের কারণে মিলসংখ্যা কমতে কমতে ২৫-এ গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছরের মধ্যে ৪৪ বছরই লোকসান  গুনেছে  বিজেএমসি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads